চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

সিনেমার বাজার মন্দা, আমার ‘সনাতন গল্প’ কে দেখবে?

ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯

টানা নয়দিন ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব’-এর ১৭তম আসর বসেছিলো রাজধানীর ছয়টি ভেন্যুতে। ১০ জানুয়ারি থেকে প্রতিদিনই দেখানো হয়েছে দেশ বিদেশের চলচ্চিত্র। পুরস্কার প্রদানের মধ্য দিয়ে যার পর্দা নামলো শুক্রবার সন্ধ্যায়। যেখানে ফিচার ফিল্মে ‘ক্রিটিক অ্যাওয়ার্ড’ (বাংলাদেশ প্যানারোমা বিভাগে) জয় করে নেয় বাংলাদেশের একমাত্র ছবি ‘সনাতন গল্প’ এর নির্মাতা মাসুম আজিজ।

পুরস্কার প্রাপ্তির পর মঞ্চে দাঁড়িয়ে নিজের পরিচালিত এই সিনেমা নিয়ে নিজের সংগ্রামের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে দিয়েছিলেন তিনি। শনিবার সন্ধ্যায় নিজের বানানো চলচ্চিত্র ও ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয় গুলো নিয়ে কথা বলেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে:

পুরস্কার প্রাপ্তির পর আপনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন, কেন?
আমি সত্যিই তখন আনন্দিত ছিলাম, আনন্দে চোখে জল চলে আসছিলো। কারণ এই ছবি করতে গিয়ে যে স্ট্রাগলের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে, এটা বলার বাইরে। এই ছবির গল্পে যে সংগ্রামের গল্প দেখানো হয়েছে, তারচেয়েও করুণ গল্পের ভেতর দিয়ে আমাকে যেতে হয়েছে ছবিটি নির্মাণ করতে গিয়ে। কি দিন গেছে, সেটা আমি জানি!

‘সনাতন গল্প’ নির্মাণ করতে যেয়ে সংগ্রামের কথাও বলছিলেন মঞ্চে দাঁড়িয়ে। ছবিটি নির্মাণে একুশ বছর কেন লাগলো?
আমি এই ছবির জন্য ১৯৯৬-৯৭ অর্থ বছরে সরকারি অনুদান পেয়েছিলাম। তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ি আর ১০ লাখ টাকা এফডিসির সহায়তা পাওয়ার কথা। কিন্তু সেসময় আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় চলে গেলো বিষয়টি। বহু চেষ্টার পর সরকারি অনুদান হিসেবে আমাকে পেমেন্ট দেয়া হলো ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, আর এফডিসি সাপোর্ট দিলো এক লাখ ৮০ হাজার টাকা। অনুদানের জন্য তথ্যমন্ত্রণালয়, এফডিসি আর আমার মধ্যে চিঠি চালাচালি হয়েছেও বিস্তর। প্রতি দুই মাস পর পর আমি তথ্যমন্ত্রণালয় ও এফডিসিতে চিঠি দিয়েছি। সময় যেতে থাকলো। এক সরকার ক্ষমতা ছেড়ে আরেক সরকার ক্ষমতায় আসলো। কিন্তু অনুদান দেয়ার বিষয়টি কেউ কোনো সুরাহা করলো না। অথচ দিন যাচ্ছে আর আমার কন্টিনিটিতে বেঘাত ঘটছে। এক সময় নিরাশ হয়ে গিয়েছিলাম।

কিন্তু পরবর্তীতে আবার কীভাবে সিনেমাটা শুরু করলেন?
আমি এই ছবিটির অনুদানের অর্থ নিতে প্রচুর ঘুরেছি, কারণ সিনেমার জন্য এরআগে আমি ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা সরকারের কাছ থেকে নিয়েছি। আমার একটাই ভাবনা ছিলো, মৃত্যুর আগে সরকারের এই ঋণ আমাকে শোধ করতেই হবে, এবং সেটা সিনেমা বানিয়েই। কারণ আমার দ্বারাতো আর টাকা ফেরৎ দেয়া সম্ভব ছিলো না। আর এই দুর্নামটাও শরীরে লাগতে দেইনি অন্যদের মতো, যারা সরকারের টাকা নিয়ে সিনেমা বানায়নি।

অনুদানের টাকার সুরাহা কীভাবে হলো?
২০১৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার পুনরায় ক্ষমতায় আসসে তখন এফডিসির এমডি হিসেবে দায়িত্ব পান হারুন। তিনিই আমাকে পরামর্শ দিলেন, মাসুম ভাই, আপনি একটা বিপদে পড়ে যাবেন। আমাদের প্রসেস হচ্ছে যারা সিনেমার অর্থ নিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেনি তাদের একটা নোটিশ দিবো, এরপর তাদের নামে অর্থ আত্মসাতের মামলা করে দিবো। বরং এটা করার আগে আপনি মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি লেখেন সমস্ত কিছু জানিয়ে। তিনি আবার আমাকে এই প্রশ্নও করলেন যে, আপনি কি সিনেমাটা তৈরী করতে পারেবন? হারুনের এই প্রশ্নে সেদিন আমি বলেছিলাম, আমার যদি বাপের জমিও বিক্রি করা লাগে তবুও আমি ছবিটা শেষ করবো।

Advertisement

শেষ পর্যন্ত কি সরকারি অর্থ পেয়েছিলেন?
হ্যাঁ, কিন্তু সেটা ৯৬-৯৭ সালের নিয়মে। সে সময় যে টাকা বরাদ্দ ছিলো সেই টাকা আমাকে দেয়া হবে, এমন প্রস্তাব দেয়া হলো। অর্থ্যাৎ অনুদানের ১৫ লাখ টাকা থেকে শুরুতে ৩ লাখ ৭৫ হাজার আমাকে দেয়া হয়েছিলো, এখন দেয়া হবে ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। এদিকে সেই সময় এফডিসি থেকে যে সাপোর্ট দেয়া হতো, সেটাও দেয়া হবে না বলে জানানো হয়।

কিন্তু আপনিতো সেই সময় শুটিং শুরু করে দিয়েছিলেন?
হ্যাঁ, প্রথম ৩ লাখ ৭৫ হাজার পাওয়ার পর ছবিটির শুটিং শুরু করে ছিলাম। বাংলাদেশের প্রমিনেন্ট সব আর্টিস্ট ছিলো আমার কাস্টিংয়ে। সেই কাজ আবার নতুন করে শুরু করতে হলো।

মানে আগে যেটুকু শুটিং ছিলো তা বাদ দিয়ে পুরোপুরি নতুন করে শুরু করলেন ২০১৮ সালে?
হ্যাঁ। এছাড়াতো উপায় নেই। আর এরফলে প্রথম কিস্তিতে অনুদানের যে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা আমাকে দেয়া হয়, সেটাও জলে গেল। আমার এই ছবির বাজেট ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকা। ওই সময় আমার সিনেমায় যে শিশু চরিত্রে অভিনয় করেছিলো, সেতো এখন জোয়ান ছেলে। শেষ পর্যন্ত আমার ছবির শিশু অভিনেতাকেই ২০১৮ সালে শুরু হওয়া ‘সনাতন গল্প’র নায়ক করি।

আর বাকিরা যারা ছিলেন?
তৌকীর, শমী কায়সার, নাজমা, ফজলুর রহমান বাবু, শহীদুল আলম সাচ্চু এবং আমিসহ আরো অনেকে। নতুন করে শুরু যখন করলাম সবাইকে বাদ দিতে হলো।

আপনার সিনেমাতো সম্ভবত একটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছিলো গত বছর?
হ্যাঁ, ২১ বছর পর করলাম সিনেমা। তাও ঢাকায় কোথাও মুক্তি দেয়া গেল না। হল পেলাম না। মুক্তি পেল পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলার একটা হলে। যেখানে ঈদের সময় শুধু সিনেমা হলটা ঠিকঠাক চলে, সারা বছর বন্ধ থাকে।

এখনতো ঢাকায় নতুন কোনো ছবি নেই, ‘সনাতন গল্প’ নতুন করে মুক্তির পরিকল্পনা করছেন কি?
আরে না। শাকিবের নামে যেসব হল চলে এখনতো সেসব হলও ফাঁকা। ঢাকায় তার ছবিই চলছে না, আমার ‘সনাতন গল্প’ কেন দেখবে মানুষ? আমাকে কয়েকজন বলছে ছবিটি ঢাকায় রিলিজ দিতে, কিন্তু আমি দেখলাম ছবিটি যদি রিলিজ দেই তাহলে খরচ আছে! অন্তত কুড়ি হাজার টাকার মতো তো লাগবেই একটা হলে রিলিজ করতে। প্রজেক্টর ভাড়া থেকে শুরু করে আরো আনুসাঙ্গিক খরচ আছে। রিলিজ দেয়ার পর ছবি যদি না চলে, তাহলেতো আমি আরো মারা যাবো! সিনেমার বাজার খুবই মন্দা এখন।