চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

শাইখ সিরাজ যেখানে অনন্য

আমাদের বাড়ি চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। চট্টগ্রাম শহর থেকে ৫০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যেতে হয়। ১৯৯০ সালে আমার বাবা জাপানের নিপ্পন কোম্পানির টেলিভিশন নিয়ে আসেন বাড়িতে। তখন থেকে টিভি পর্দার সাথে পরিচয়। বাল্যকালের স্মৃতি মনে করতে গেলে ম্যাকগাইভার সিরিয়ালের কথা মনে পড়ে। পরে জেনেছি ইমপ্রেস টেলিফিল্মই এ ধরনের বিদেশী সিরিয়াল ডাবিং করে বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচার করতো। শাইখ সিরাজ এই কোম্পানির সাথে জড়িত।

২০০৮ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ চুকানোর পূর্ব থেকে আয় এবং ভাব দুটোর জন্য সাংবাদিকতা শুরু করেছিলাম। বাংলাদেশে রেডিও প্রত্যাবর্তনের প্রতিকৃত রেডিও টুডের প্রথম ব্যাচ আমরা। একবছর কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে হাজির হয়েছিলাম টেলিভিশন সাংবাদিক হবো বলে এই মহীরুহ ব্যক্তিত্বের সম্মুখে। ততদিনে শাইখ সিরাজ কৃষি ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে নিজ কর্মে সমুজ্জ্বল। স্মৃতি হাতড়ে নব্বই দশকে তাকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে দেখার ‘মাটি ও মানুষের’ পর্ব খুঁজে বেড়াই।

বিজ্ঞাপন

৯০ দশকের টেলিভিশনে তখন গৌর মানুষদের জয়জয়কার। উঠতি শহুরে সংস্কৃতির প্রবল প্রভাব-প্রতিপত্তির মধ্যে একজন শ্যামলা বরণ মানুষ সবুজ শার্টে গ্রামগঞ্জের কথা বলছেন। আমার বাড়ির পাশে পুকুর, ডোবা, জলাশয়, ক্ষেত, খামারের কথা বলছেন। তার ভাষা শব্দ চয়ন যোগাযোগ অন্যদের থেকে আলাদা। কেমন যেন আপন আপন। ছাপানো প্রমিত বাংলার ভিড়ে একেবারেই ভিন্ন। কৃষি ও কৃষকের, মাটি ও ফসলের দীর্ঘ সঞ্চিত জ্ঞান তিনি তথাকথিত শহুরে শিক্ষিতদের স্ট্যাটাস সিম্বল টিভিতে বলছেন দেখাচ্ছেন। নতুন নতুন ধারণায় কৃষকদেরও দৃষ্টি খুলে দিচ্ছেন।

হ্রস্ব দৃষ্টির মানুষেরা দীর্ঘ জীবনের পাঠ বুঝতে পারে না। কৃষির মতো অনাকর্ষনীয় একটি বিষয়কে টেলিভিশনের মতো রঙ্গিন পর্দায় সর্বসাধারণের ভাষায় উপস্থাপন করার অনন্য কৃতিত্ব অর্জনে তার পাড়ি দিতে হয়েছে তিন যুগের পথ। তিনি তার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষি ও কৃষকের জ্ঞানকে নির্মম পরিশ্রমে তুলে না আনলে আমাদের জানাই হতো সম্ভাবনার বাংলাদেশের অসাধারণ রূপ।

বিজ্ঞাপন

একবার শহুরে মধ্যবিত্ত হতে পারলে গ্রাম ভুলে যেতে চাওয়া আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে তিনি দেখিয়ে দেন বাচতে হলে জানতে হবে শিকড়কে। ফিরতে হবে শিকড়ের কাছে।শিকড়ের জ্ঞান তোমাকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়। আমার চাকরির সাক্ষাতকারেও তিনি জানতে চেয়েছিলেন আমার গ্রামের কথা।

চট্টগ্রামের বাঁশখালীর বড়ঘোনা গ্রামে তখনও বর্তমানের মতো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের নামে লবণের মাঠ ভরাট হয়নি। আমার এলাকায় লবণ উৎপাদন হয় শুনে তিনি জানতে চেয়েছিলেন কিভাবে লবণ উৎপাদন হয়। গ্রামে কিভাবে যাওয়া আসা করি। তিনি আসলে বুঝতে চেয়েছিলেন আমার সাথে গ্রামের সম্পর্ক আছে কিনা।

দিনের পর দিন তিনি টিভিতে সাধারণ মানুষের ভাষায় কৃষি ও কৃষকের আজন্ম লালিত জ্ঞানকে পরম মমতায় ক্যামেরায় ধারণ করে প্রচারের মাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছেন বিশ্ব দরবারে। তৈরি করেছেন উন্নয়ন সাংবাদিকতার অনন্য মডেল। দীর্ঘ তিনযুগের তার পরিশ্রমলব্ধ টেলিভিশন জীবন তাই বৈশ্বিক উন্নয়ন সাংবাদিকতায় ভিন্নতর সংযোজন হিসেবে পাঠযোগ্য। Shykh Seraj: The School of indigenous knowledge and thought.

জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)