চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লেখক মুশতাকের মৃত্যু: সঠিক তদন্ত ও বিচার চেয়ে ৬৬ লেখকের বিবৃতি

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি

লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর ঘটনায় উপযুক্ত তদন্ত, দায়ীদের বিচার এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি জানিয়েছেন দেশের ৬৬ জন বিশিষ্ট লেখক।

বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে তারা বলেন, ‘‘লেখক ও উদ্যোক্তা মুশতাক আহমেদের মৃত্যু সারা দেশবাসীর মতো আমাদেরও মর্মাহত করেছে, বিক্ষুব্ধ করেছে। ইন্টারেনেটের সামাজিক মাধ্যমে কেবল একটি কার্টুন শেয়ার করার জন্য ও কিছু স্ট্যাটাস লেখার জন্য তার বিরুদ্ধে কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করা হয়। এরপর টানা নয় মাস তিনি বিনাবিচারে কারাগারে বন্দি ছিলেন। ছয়বার তার জামিন নাকচ হয়েছে। অবশেষে ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০২১ কারাগারেই তার মৃত্যু ঘটে।’’

বিজ্ঞাপন

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘‘বাংলাদেশে হত্যার আসামীর দণ্ড মওকুফ হয় অথবা দ্রুত জামিন হয়, ঋণখেলাপি ও আর্থিক খাত থেকে লুটপাটকারীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে, হাজার-কোটি টাকা বিদেশে পাচারকারী সহজেই দেশ ছাড়তে পারে, কিন্তু ফেসবুকে সরকারবিরোধী কিছু লেখা যেন তার চাইতে বড় অপরাধ! তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল সরকারের সমালোচনা ও গুজব ছড়ানোর। তিনি সরকারের অযৌক্তিক কোনো সমালোচনা করেছেন কিনা বা গুজব ছড়িয়েছেন কিনা আমাদের জানা নেই। যে কোনো সভ্যদেশেই সেটা নাগরিক অধিকার। সরকারবিরোধী তৎপরতা না করা গেলে বাংলাদেশ নামের দেশটির জন্মই হতো না।

ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগও স্বাধীনতার আগে এবং পরে সরকারবিরোধী বহু আন্দোলন করেছে। কিন্তু ২০০৮ সালে এই দফায় ক্ষমতায় আসার পরে তারা নানা রকম আইন তৈরির মাধ্যমে লেখক, সাংবাদিক ও বিরোধী রাজনৈতিক দলসমূহের চিন্তা ও মতকে দমনের চেষ্টা করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় চরম পদক্ষেপ হলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।’’

আইনটির বিষয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, ‘‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অন্যতম মানবাধিকারবিরোধী দিক হলো, এর মোট ১৩টি ধারার ক্ষেত্রে পুলিশের কাছে যে কোনোকিছুই আমলযোগ্য; অথচ অপরাধ প্রমাণের আগেই সেগুলো জামিন-অযোগ্য, এমনকি রকমভেদে শাস্তির মাত্রাও অতি উচ্চ।

এতগুলো ধারা জামিন-অযোগ্য রাখা এবং শাস্তির মাত্রা দেখে আমরা ধারণা করতে পারি, এই আইনটি প্রবর্তন করাই হয়েছে লেখক, সাংবাদিক ও বিরোধী যে কারও রাজনৈতিক মতকে নিবর্তন করার জন্য। ক্ষমতায় চিরদিন থাকার বাসনা থেকেই এই আইন প্রবর্তন করা হয়েছে। এ আইনের ভয়ঙ্কর দিকটি হলো, এর ৪৩ ধারায় পুলিশকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার, জব্দ ও তল্লাশি করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। আর এই তল্লাশি হতে পারে, কোনো ব্যক্তি ডিজিটাল মাধ্যমে অপরাধমূলক কিছু করছে বা করতে পারে বলে মনে হলেই। এই আইন বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ ধারা এবং তথ্য অধিকার আইনের সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। যার শাস্তির বিধানও দেশের আইনকাঠামোর মৌলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’’

এমন প্রেক্ষিতে কয়েকটি দাবিও ‍তুলে ধরা হয় লেখকদের পক্ষ থেকে। সেগুলো হলো:

১। সরকারকে মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর দায় স্বীকার করতে হবে, সঠিক তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে শাস্তি প্রদান করতে হবে।

২। মুশতাক আহমেদের সঙ্গে একই অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরকে অবিলম্বে শুধু জামিনে নয়, তার মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। একইসঙ্গে এই আইনে এ-যাবত গ্রেপ্তারকৃত সকল বন্দিকে শুধু জামিনে নয়, স্থায়ীভাবে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে এবং তাদের প্রত্যেকের মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

৩। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন একটা চরম গণবিরোধী ও নিপীড়নমূলক আইন। তাই এর কোনো সংস্কার নয়, আমরা এই আইনের দ্রুত বিলোপ দাবি করছি। বিভিন্ন সংগঠন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশকিছু ধারা সংশোধনের দাবি জানিয়েছেন কিন্তু সরকার কারো কথায় কান দেয়নি।এমতাবস্থায় আইনটির ব্যাপক অপব্যবহারের পরিপ্রেক্ষিতে এই আইনের আমরা দ্রুত বিলোপ দাবি করছি।

৪। মুশতাক আহমেদের মৃত্যুর প্রতিবাদকারী কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাদের অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দিতে হবে।

ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেছেন
১। আহমদ রফিক ২। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ৩। আবুল কাসেম ফজলুল হক ৪। আনোয়ারা সৈয়দ হক ৫। দাউদ হায়দার ৬। যতীন সরকার ৭। মোরশেদ শফিউল হাসান ৮। মামুনুর রশিদ ৯। সলিমুল্লাহ খান ১০। আনু মুহাম্মদ ১১। মোহন রায়হান ১২। শেখ বাতেন ১৩। সেলিম জাহান ১৪। আজফার হোসেন ১৫। শামীম আজাদ ১৬। মঈনুল আহসান সাবের ১৭। আকিমুন রহমান ১৮। ইমতিয়ার শামীম ১৯। জি এইচ হাবীব ২০। জাকির তালুকদার ২১। রাজু আলাউদ্দীন ২২। সৈয়দ তারিক ২৩। কামরুল হাসান ২৪। সেলিম রেজা নিউটন ২৫। মুজিব মেহদী ২৬। চঞ্চল আশরাফ ২৭। আহমাদ মোস্তফা কামাল ২৮। তুষার গায়েন ২৯। রাখাল রাহা ৩০। ফাহমিদুল হক ৩১। কাবেরী গায়েন ৩২। আরশাদ সিদ্দিকী ৩৩। সিরাজ সালেকিন ৩৪। মজনু শাহ ৩৫। শাহেদ কায়েস ৩৬। জফির সেতু ৩৭। হামীম কামরুল হক ৩৮। আসিফ ৩৯। আলমগীর খান ৪০। কাজী রাফি ৪১। রিফাত মুনিম ৪২। ভুঁইয়া শফিকুল ইসলাম ৪৩। মাহবুব আজীজ ৪৪। অস্ট্রিক আরজু ৪৫। রাদ আহমেদ ৪৬। খোন্দকার নিয়াজ রহমান ৪৭। পাপড়ি রহমান ৪৮। দীপু মাহমুদ ৪৯। শামীম শাহান ৫০। জোবায়েন সন্ধি ৫১। সাধনা আহমেদ ৫২। তুহিন ওয়াদুদ ৫৩। রেজা ঘটক ৫৪। আহমেদ মুনীর ৫৫। আফসানা বেগম ৫৬। সুমন সুপান্থ ৫৭। শফিক সেলিম ৫৮। সারওয়ার চৌধুরী ৫৯। রহমান মুফিজ ৬০। লুলু আম্মানসুরা ৬১। সৈকত হাবীব ৬২। সৈকত আমিন ৬৩। আমীরুল বাশার ৬৪। মোবাশ্বার হাসান ৬৫। আফরোজা সোমা ৬৬। শওকত হোসেন।

বিজ্ঞাপন