চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লেখক-প্রকাশকের রসায়ন সবচেয়ে দামী

বাঙালির সপ্তম ঋতু (পর্ব-২২)

লেখক ধরে প্রকাশক বড় হয়ে ওঠেন। প্রকাশক ধরে বড় হন লেখক। অদ্ভুত এক ব্যাপার। লেখক স্বপ্ন দেখেন ছাপার অক্ষরের। প্রকাশক কামনা করেন, লেখকের কলম হয়ে উঠুক সোনাফলা। প্রকাশকের বাণিজ্যে টিকে থাকার ব্যাপার থাকে। থাকে বিনিয়োগ। বিনিয়োগ থাকে লেখকেরও। তারা বিনিয়োগ করেন স্বপ্ন ও চিন্তা।

লেখক প্রকাশকের রসায়নটা প্রকাশনা শিল্পের জন্য সবচেয়ে দামী। লেখক বড় হতে চান। প্রকাশকও বড় হতে চান। দু’জনের বড় হওয়ার প্রক্রিয়াটির বাস্তবতা যদি একটি জায়গাতে এক না হয়, তাতেই ঝামেলা।

Reneta June

লেখকরা যুক্তও থাকতে চান, মুক্তও হতে চান। লেখক শুরুতে চান একটি জায়গা ধরে রাখতে। সেই জায়গা থেকে যখন তার ভিত তৈরি হয়ে যায়, তখন অনেক প্রকাশক তার কাছে ছুটতে থাকেন। লেখক তখন মুক্ত হতে চান। বাণিজ্য ও লেখনীর যশে স্বাধীন বিস্তৃতির কথা ভাবতে থাকেন। লেখক তার পাণ্ডুলিপিও গ্রেডিং করতে শুরু করেন। সবচেয়ে ভালোটা ভালো জায়গায় দেন। তারপর পর্যায়ক্রমে ভাগ করে ফেলেন। এসব অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে প্রকাশনা জগতে লেখক থিতু হন কিংবা হন না।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে অনেক লেখক প্রকাশনা জগত নিয়ে বেশ ত্যক্ত বিরক্ত। সেদিন এক লেখক বলছিলেন, প্রকাশকরা যা বলেন, তার বড় একটি অংশ বাদ দিয়ে ধরতে হয়। তার হিসেবে বই মেলায় যে সংখ্যক বই বিক্রি হয়, তাতে প্রকাশকরা কাড়ি কাড়ি টাকা মুনাফা করেন। তার বিবেচনাটি তার জায়গায় সঠিক। অনেক লেখক বলবেন, প্রকাশকরা তাদের শিল্পকে এগিয়ে নিচ্ছেন অনেক কষ্ট করে। স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানোর মতো।

এই জগতে কাঁচামালের দাম খুবই কম। কাঁচামাল হচ্ছে লেখা। একজন নতুন লেখক বই বের করছেন প্রকাশককে টাকা দিয়ে। কারণ, এতে নতুন লেখককে কোনো মাপকাঠিতে পড়তে হচ্ছে না। আমাদের প্রকাশনা শিল্পে মাণসম্মত লেখার সুনির্দিষ্ট কোনো মাপকাঠি নেইও। প্রকাশকরা লেখা নিচ্ছেন, সঙ্গে টাকা নিচ্ছেন, বই ছাপছেন। তারপর বইটি তার নিজস্ব পণ্য হিসেবে বাজারে তুলছেন। বইটি লেখকের হাতে পৌঁছে গেলে তিনি তৃপ্তি পাচ্ছেন। এর বাইরে সঠিক নীতি কাঠামোটি অনেক আগেই তৈরি হয়ে আছে। সেটির ব্যবহার নেই। বই প্রকাশের সাত দিনের মধ্যে নতুন লেখকের উন্মাদনায় ভাটা পড়ে। সে বুঝে যায়, বই প্রকাশ হলে বইয়ের সংখ্যা যোগ হয় মাত্র। আরও ভালো কিছু লিখতে হবে। অনেকে অন্যরকম চিন্তাও করেন।

বই লেখার উন্মাদনা এক আর প্রকাশের উন্মাদনা আরেক। নতুন পুরোন সব লেখকই বই প্রকাশের আগ মুহূর্তে অস্থির থাকেন। নানারকম স্বপ্ন ও কল্পনাজাল তার ভেতরে আসে। কল্পনার এই জালবোনা বোনা চলতে থাকে। বইটি হাতে পাবার মুহূর্ত পর্যন্ত। হাতে পেলে কারো মন ভালো হয়, কারো চাপ কমে যায়, কেউ কেউ আবেগে আরো অস্থির হয়ে যান। বড় লেখকরা চাপ নেননা। কখনো কখনো চাপ এসে যায়। বড় লেখকদের কথা ভাবছি না। তাদের বই নিয়ে বেশি উচ্ছ্বাস ও অস্থিরতায় থাকেন প্রকাশকরা। কিন্তু কথা হচ্ছে, বই প্রকাশের পর এই উচ্ছ্বাস কোথায় যায়?

নবীন লেখকদের ক্ষেত্রে তার টাকার হিসেব চুকে গেলেই শেষ। লেখক জানেন তার বই বেরিয়েছে তিনশ কপি। প্রকাশক তাকে দিয়েছে বিশ কপি। প্রকাশনার স্টলে আছে বিশ কপি। আর প্রকাশনার কারখানায় আছে দশ কপি। সবমিলিয়ে এই বইগুলিই প্রকাশ করেছে প্রকাশনী। বেশি কপি কিনতে চাইলে টাকা দিয়ে কিনতে হবে। এই বাস্তবতা মেনে নিতে হয় নতুন লেখকদের পাশাপাশি অনেক পুরোনো লেখকদেরও। তারা মনের গভীরে লালন করেন, অসাধারণ লিখেছেন তিনি। কিন্তু তার মূল্যায়ণ করবে কে? সবাই তো জানে না মার্কেটিং রীতি।