চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

৩ মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা

লাগামহীন হয়ে পড়ছে খেলাপি ঋণ, সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সব উদ্যোগকে পেছনে ফেলে তীব্র গতিতে বেড়ে চলেছে আর্থিক খাতের এই বিষফোঁড়া। চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম ৩ মাসে আরও ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি ১৪ লাখ টাকা বেড়েছে খেলাপি ঋণ। যা বিতরণকৃত মোট ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন শেষে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। তবে ৩ মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি ৩১ লাখ টাকায়। আর ১ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ১৬ হাজার ৯১৭ কোটি ৩৯ লাখ। গত অর্থবছরের ঠিক এই সময়ে খেলাপি ঋণ ছিল ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি ৯২ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খেলাপি গ্রাহকদের কোনো শাস্তির ব্যবস্থা না করে উল্টো তাদের বার বার সুযোগ দেয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে। এদেরকে শাস্তির আওতায় না আনা পর্যন্ত এই ঋণের লাগাম টানা যাবে না।

খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা বাড়লেও এটাকে ‘সামান্য’ বলে মনে করছে ব্যাংক ও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। সংস্থাটির বলছে, সাধারণত সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে ঋণ আদায় কম থাকে। তাই খেলাপি বেশি দেখা যায়। তবে ডিসেম্বর প্রান্তিকে তা কমে যাবে।

সর্বশেষ ১৭ নভেম্বর মাত্র ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে ৯ শতাংশ সুদহারে ঋণ পুনঃতফসিলের সুবিধার সময়সীমা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। উচ্চ আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আরও ৯০ দিন সময় পাবেন আবেদনকারীরা। সূত্রমতে এই সুবিধায় ঋণ পুনঃতফসিল করে নিয়মিত হয়েছেন অনেকে। তারপরেও এই খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহীম খালেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বহুবার বলেছি, যে বিষয়কে উৎসাহ দেয়া হয়, তার গতি বাড়ে। আর যে বিষয়ে শাস্তি দেয়া হয় তার গতি কমে। অর্থাৎ যদি খেলাপি গ্রাহকদের শাস্তি দেয়া হতো তাহলে আজ এই পরিস্থিতি দাঁড়াতো না। বরং দেখেছি খেলাপি গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে সুযোগ দিয়ে উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।

খেলাপি ঋণ একটা মন্দ কাজ, এটাকে কোনো দেশে উৎসাহ দেয়া হয় না, বরং শাস্তি দেয়া হয়- এমন তথ্য জানিয়ে তিনি বলেন, চীনে খেলাপি ঋণ বেড়ে গেলে সেদেশে নিয়ম করা হলো, খেলাপি গ্রাহকের পাসপোর্ট বাতিল হয়ে যাবে, বিমানে বা ট্রেনে কোনো টিকেট দেয়া হবে না, সরকারি কোনো কমিটিতে তাকে রাখা যাবে না। এ ধরণের বেশ কিছু ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেয়ায় ২/৩ বছরের মধ্যে চীনে খেলাপি ঋণ কমে গেছে। এ ধরনের অনেক উদারহন রয়েছে।

“পৃথিবীতে এমন কোনো উদাহরণ নেই যে, খেলাপিদের সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এই সুযোগ দেয়া হয়েছে। তাও আবার এই অর্থমন্ত্রী (আ হ ম মুস্তফা কামাল) দায়িত্ব নেয়ার পরে। তখন থেকে বলছি, এতে হিতে বিপরীত হবে। তা-ই হচ্ছে।”

ইব্রাহীম খালেদ বলেন, খেলাপি গ্রাহকদের বিভিন্ন সুযোগ দেয়ার পর, ভাল গ্রাহকেরাও খারাপের দিকে যাচ্ছে। কারণ তারাও ভাবছেন, খেলাপি হলে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ পাওয়া যাবে। আর খেলাপি না হলে ঋণে সুদ হবে ১২/১৩ শতাংশ।

বিজ্ঞাপন

সাবেক তত্ত্বাবধারক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।
সাবেক তত্ত্বাবধারক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট দিয়ে সঠিকভাবে খেলাপি ঋণ কমবে না, বরং এটাকে অন্যায়ভাবে কমিয়ে ফেলা হবে। কারণ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করলে খেলাপির পরিমাণ কম দেখাবে। কিন্তু বাস্তবে তো খেলাপি থেকেই যাচ্ছে। অর্থাৎ যার চেহারা কালো তা ক্রিম দিয়ে ফর্সা করা যায় না, কালোই থাকে।

ঋণ খেলাপিদের আরো সুযোগ দেয়াই সরকারের উদ্দেশ্য-এমন মন্তব্য করেছেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, খেলাপি ঋণ উদ্ধারের ব্যাপারে সরকারের কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তাদের যে জামানত রয়েছে তা বাজেয়াপ্ত করতে হবে।

“প্রয়োজনে দুদক বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আইনে খেলাপিদের দৃশ্যমান শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে এরা আরো বেপরোয়া হয়ে যাবে। কারণ খেলাপিদের সুযোগ দেয়া মানে নৈতিক সংকটে পড়া।”

তিনি বলেন, ঋণ খেলাপিদের কারণে ভাল গ্রাহকেরা বিপথে হাঁটছেন। কারণ তারা ভাবছেন, খেলাপি হলে সুযোগ পাওয়া যাবে। যেমন- ঋণের সুদ ৯ বা ১০ শতাংশ দেয়া যাবে। কিন্তু নিয়মিত হলে ১৪-১৫ শতাংশ সুদ দিতে হয়। তাই এক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগের বিকল্প নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম বলেন, খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমানোর চেষ্টা করছি। চলতি বছরের জুন প্রান্তিক (এপ্রিল-জুন) প্রান্তিকের চেয়ে সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে (জুলাই–অগাস্ট) খুব বেশি বাড়েনি। যা বেড়েছে সেটা যে খুব বেশি তা নয়, ‘সামান্য’।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র সিরাজুল ইসলাম

তিনি বলেন, প্রতিবছরই জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ঋণ আদায় কম থাকে। তাই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেশি দেখায়। কিন্তু অক্টোবর-ডিসেম্বর সময়ে ঋণ আদায় বেশি হবে। তখন খেলাপি ঋণের পরিমাণও কমে যাবে। এবং আশা করি তা এক অংকে নেমে আসবে।

খেলাপিদের শাস্তির ব্যবস্থা না করে উল্টো উৎসাহ দেয়ায় খেলাপি ঋণ বাড়ছে-অর্থনীতিবিদদের এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এই নির্বাহী পরিচালক বলেন, না। তারা যা বলছেন, ব্যাপারটা ঠিক এ রকম নয়।

গত ১০ জানুয়ারি ব্যাংকমালিকের সঙ্গে বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছিলেন, ‘আজ থেকে খেলাপি ঋণ আর এক টাকাও বাড়বে না।’ আর জানুয়ারি-মার্চ এ তিন মাসেই খেলাপি ঋণ প্রথমবারের মতো ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছিল। পরের ৩ মাসে বাড়ল ১৬ হাজার ৯৬২ কোটি টাকা। সর্বশেষ সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা।

আজ রাজধানীতে ‘বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যান এবং ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, ৮০ ও ৯০ এর দশকে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক ছিল। কিন্তু এখন ব্যাংকের সংখ্যা অনেক কিন্তু গ্রাহক কম। একই গ্রাহকের উপর একাধিক ব্যাংক নির্ভরশীল। খেলাপি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ এটি। এছাড়া বর্তমানে ইচ্ছাকৃত খেলাপিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। এদেরকে দমন করতে হলে সরকারি উদ্যোগ গ্রহণ খুবই জরুরি।