চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

লগি-বৈঠা আন্দোলনের ১৩ বছর

আওয়ামী লীগ সভাপতি ও জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা শেখ হাসিনা ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর লগি-বৈঠা নিয়ে বঙ্গবন্ধু এভিনিউর সমাবেশে হাজির হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। মূল দাবি ছিল ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত সাধারণ নির্বাচন পরিচালনার জন্য যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে তার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বিচারপতি কে এম হাসানকে নিয়োগ প্রদান না করা। তিনি এক সময়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন সে জন্য বিএনপি সংবিধান সংশোধন করে বিচারপতিদের অবসর গ্রহণের বয়সসীমা বাড়িয়ে দিয়েছিল।

শেখ হাসিনা এ কৌশল ধরে ফেলেন। তিনি বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে রাজনৈতিক কর্মসূচি নির্ধারণ করতে থাকেন। ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুুরী, এইচ এম এরশাদ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনুসহ বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকেও তিনি সঙ্গে রাখতে পারেন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিরোধীদের বাইরে রেখেই খালেদা জিয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করেছিলেন। কিন্তু শেখ হাসিনার আন্দোলনের কারণে মাস খানেক টিকে থাকতে পেরেছিল তার সরকার। তিনি সংসদ বাতিল করতে বাধ্য হন। নতুন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসে।

বিজ্ঞাপন

বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপি নেতৃত্ব বলছিলেন, ১৯৯৬ সালে আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে যে ভুল করেছিল তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেওয়া হবে না। লগি-বৈঠা আন্দোলন সফল করার জন্য আওয়ামী লীগ ও তার মিত্রদের রাজপথের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেওয়া হবে না। কিন্তু বেগম খালেদা জিয়া আওয়ামী লীগের রাজপথের শক্তিকে খাটো করেছিলেন কিংবা বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর শক্তিকে বড় করে দেখেছিলেন। ২৮ অক্টোবর (২০০৬) খালেদা জিয়া পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের অনুরোধ জানান। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি কে এম হাসানকে এ দায়িত্ব প্রদানের বাধ্য ছিলেন।

কিন্তু রাজপথ অন্য বার্তা দিচ্ছিল। শেখ হাসিনা ২৮ অক্টোবর থেকে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেন। আগের সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে বেতার-টেলিভিশনে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণের পরপরই রাত সোয়া আটটার দিকে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা যাত্রাবাড়ী মোড়ে ডেমরা বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কার্যালয় পুড়িয়ে দেয়। এই কার্যালয়টি স্থানীয় সাংসদ সালাহ উদ্দিন আহমেদের কার্যালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। ২৮ অক্টোবর জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত নজিরবিহীন অবরোধে সারাদেশ অচল হয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকা বিচ্ছিন্ন এক দ্বীপে পরিণত হয়। রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও ভাংচুর সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। দোকানপাট, অফিস, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেনি। স্কুল-কলেজ-শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও আগেই বন্ধ ঘোষণা করা হয়। রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন আবাসিক এলাকাসহ অন্যান্য এলাকায় ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করে। রাজনৈতিক সহিংসতায় সারা দেশে অন্তত ১১ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার।লগি-বৈঠা আন্দোলন

রাজধানীর পুরানা পল্টন মোড়ে পুলিশ ও জামায়াতের কর্মীদের সংঘর্ষে পাঁচজন নিহত ও দুই শতাধিক আহত হয়েছেন। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে থেকে শুরু করে পল্টন মোড়, জিরো পয়েন্ট, বঙ্গবন্ধু এভিনিউ, শাহবাগ, সায়েদাবাদ, মিরপুর, যাত্রাবাড়ী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসসহ পুরো রাজধানী রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। আন্দোলনের তীব্রতা দেখে বিচারপতি কে এম হাসান ২৮ অক্টোবর বিবৃতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। শেখ হাসিনা বিষয়টিকে দেখেন আন্দোলনের বিজয় হিসেবে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা রাজপথের আন্দোলন বেগবান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। পরদিন রাজনৈতিক সংঘর্ষে আরও সাতজনের মৃত্যু ঘটে। অবরোধের কারণে রাজধানীতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করে। অচল হয়ে পড়েছে জনজীবন।

৩০ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজ দায়িত্বের অতিরিক্ত হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসেন যখন রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টার শপথ পড়ান, তখন বঙ্গবভনের দরবার হলের অনেক আসনই শূন্য ছিল। প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগসহ ১৪ দল এবং সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী আরও কিছু দলের কোনো নেতা বা প্রতিনিধিকে এই সমাবেশে দেখা যায়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের দায়িত্ব বদলের অনুষ্ঠান আক্ষরিক অর্থেই ছিল অনাড়ম্বর। রাষ্ট্রপতি নিজেই সংবিধানের ছয়টি বিকল্পের মধ্যে সর্বশেষটি বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য পাঁচটি সঠিকভাবে নিষ্পত্তি করেছিলেন কি না, এ নিয়ে সন্দেহ ও প্রশ্ন ছিল। কারণ প্রথম বিকল্প অনুযায়ী সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি কে এম হাসান আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানালেও পরের দুটি বিকল্প হিসেবে সম্ভাব্য প্রধান উপদেষ্টা সাবেক প্রধান বিচারপতি মাহমুদুল আমীন চৌধুরী এবং বিচারপতি হামিদুল হক আনুষ্ঠানিক অপারগতা জানাননি।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইয়াজ উদ্দিন আহম্মেদের প্রতি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, ভোটার তালিকা সংশোধন, প্রশাসনিক দায়িত্ব পুনর্বণ্টন, দুর্নীতি দমনসহ ১১ দফা দাবি উত্থাপন করে। এসব দাবি বাস্তবায়নের জন্য আগামী ৩ নভেম্বের পর্যন্ত সময় বেঁধে দেন। এ সময়ের মধ্যে দাবি আদায় না হলে আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সেই সঙ্গে ১৪ দলের লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। ৩১ অক্টোবর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১০ উপদেষ্টা শপথ নেন।

১ নভেম্বর বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে বৈঠক করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ। খালেদা জিয়ার ক্যান্টমেন্টের বাসভবনে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে এরশাদ বিএনপির চেয়ারপারসনের কার্যালয় হাওয়া ভবনে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন।এ বৈঠকে জাতীয় পার্টিকে চারদলীয় জোটে আনার ব্যাপারে আলোচনা হয়। জাতীয় পার্টি সূত্র বলেছে, আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ৩৫ থেকে ৪০টি আসন দেওয়া ছাড়াও ক্ষমতায় গেলে এরশাদকে রাষ্ট্রপতি করার প্রস্তাব দেওয়া হয় বিএনপি থেকে। কিন্তু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বিচক্ষণতায় এ উদ্যোগ সফল হয়নি। এইচ এম এরশাদ আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকার সিদ্ধান্ত নেন। শেখ হাসিনা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ ১১ দফা মানার আহ্বান জানান। ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে পল্টন ময়দানে ১৪ দল আয়োজিত বিশাল জনসভায় শেখ হাসিনা রাষ্ট্রপতির উদ্দেশ্যে বলেন, ‘সহনশীলতাকে দুর্বলতা ভাববেন না। আমরা আন্দোলনে আছি। আন্দোলন চলবে।’লগি-বৈঠা আন্দোলন

বিজ্ঞাপন

এর মধ্যে অধ্যাপক মুহম্মদ ইউনুস নোবেল পুরস্কার পেলেন শান্তিতে অবদান রাখার জন্য। তাকে বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মদ সংবর্ধনা দেন। অনুষ্ঠানে ড. ইউনূস রাষ্ট্রপতির প্রতি অনুরোধ রেখে বলেন, ‘আপনি সবার কথা শুনবেন, আবার কারও কথাই শুনবেন না। সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে, একতালে এবং একযোগে চলবেন।’ তার এ অবস্থানকে বিএনপির প্রতি এক ধরনের সহানুভূতি হিসেবে ধরে নেয় রাজনৈতিক মহল। কিন্তু বিস্ময়করভাবে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নেয়। ৬ নভেম্বর বঙ্গভবন বা তেজগাঁওয়ে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘মেঘনা’য় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দশজন উপদেষ্টার বৈঠক হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, শপথ গ্রহণের পরে আট দিন অতিবাহিত হলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজে গতি না আসায় এবং সঠিকভাবে নির্দলীয় ভাবমূর্তি ও সেভাবে দেশবাসীর আস্থা অর্জনের কাজ করতে না পারায় উপদেষ্টারা হতাশা ব্যক্ত করেন। বিশেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ আজিজকে পদত্যাগে রাজি করাতে না পারা এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের জটিল সমস্যা নিয়ে তারা আলোচনা করেন।

পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে যখন রাষ্ট্রপতি ও তত্ত্বাধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মদ নিজের সরকারকে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার হিসেবে চিহ্নিত করেন। তিনি বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অতিরিক্ত দায়িত্ব তার ওপর অর্পিত হওয়ায় বর্তমান সরকারের ধরন হয়েছে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার। ৯ নভেম্বর সচিবদের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আরও বলেন, ‘আমার পছন্দ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিয়েছি এবং তারা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। আমার ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের নিয়ে মহলবিশেষের মন্তব্য অনভিপ্রেত ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে হস্তক্ষেপের শামিল।’ এ ভাষণে রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। সরকারের নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা এ বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন।

বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ ১১ দফা দাবি পূরণ না হওয়ায় আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের আহ্বানে ১১ নভেম্বর থেকে সারা দেশে লাগাতার অবরোধ শুরু হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশ ১৪ দলের ডাকা অবরোধ কর্মসূচিসহ সব ধরনের মিছিল, সভা-সমাবেশ ও ঘেরাও নিষিদ্ধ করে। অবরোধ কর্মসূচির সময় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলা হলে গুলি চালানোরও নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশ সূত্র জানায়, রাজধানীতে ২৫ হাজারের বেশি পুলিশ, বিডিআর ও র‌্যাব মোতায়েন করা হয়েছে। রাজধানীর থানায় থানায় মাইকে প্রচার করে অবরোধ কর্মসূচি থেকে বিরত থাকতে পুলিশ আহ্বান জানায়।

নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, বিশেষত প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি এম এ আজিজ, নির্বাচন কমিশনার স ম জাকারিয়া ও সচিব আবদুর রশিদ সরকারের অপসারণ, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং প্রশাসনকে নির্দলীয় করার দাবিতে ১৪ দল অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়। শেখ হাসিনা প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বিচারপতি এম এ আজিজকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়ে দলমত নির্বিশেষে সমগ্র জাতি কর্তৃক ধিক্কৃত সিইসিকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। বিএনপি-জামায়াতের ইচ্ছা পূরণের খেয়াল ছেড়ে তাকে জনগণের ইচ্ছার প্রতি সম্মান দেখাতে হবে।

বিরোধীদের আন্দোলনের তীব্রতার মধ্যেই ২৭ নভেম্বর মধ্যরাতে বঙ্গভবনে বৈঠক শেষে পরদিন সকালেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২১ জানুয়ারি। চারদলীয় জোট ছাড়া বাকি সব রাজনৈতিক দলের দাবি উপেক্ষা করে এভাবে হঠাৎ তফসিল ঘোষণা করায় নানা মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও হতাশা সৃষ্টি হয়। বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানালেও আওয়ামী লীগসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল তফসিল প্রত্যাখ্যান করে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টারা তফসিলের ব্যাপারে কিছুই জানতেন না।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে থাকার প্রেক্ষাপটে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. ইউনূস বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট এড়াতে ও শান্তির জন্য ৭ দফা খসড়া প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, ‘ভয়ঙ্কর যুদ্ধের মধ্যেও একটি দেশে শান্তির চুক্তি হয়। তাই দুই দলের উচিত দেশের স্বার্থে এই শান্তির চুক্তি করা।’লগি-বৈঠা আন্দোলন

২৯ নভেম্বর বিএনপি নেতা ও ঢাকার মেয়র সাদেক হোসেন খোকার উদ্যোগে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের দেওয়া নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি ১৪ দলকে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অবরোধ দেশকে এমন জায়গায় নিয়ে যাবে যেখান থেকে আর ফেরত আসা যাবে না। রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে অর্থনীতি আজ ধ্বংসের পথে। শিশুরা স্কুলে যেতে পারছে না, তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি ও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকট নিয়ে তিনি বলেন, দেশের মানুষের মধ্যে এখন দুই ধরনের অনুভূতি কাজ করছে। একদিকে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে দুশ্চিন্তা, ক্ষোভ ও হতাশা। তিনি ১৪ দলকে অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানালেও বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের পটভূমি বা নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাজের মান নিয়ে মন্তব্য করেননি। তার সাত দফা ছিল নিুরূপ : দুই জোট শান্তির চুক্তি করে নির্বাচনে অংশ নেবে; নির্বাচনের পর অনধিক দুই বছরের কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হবে; কে রাষ্ট্রপতি হবেন তা আগেই ঠিক করা হবে; কোয়ালিশন সরকার দুই জোটের নির্বাচনী ইশতেহারের অভিন্ন বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করবে; এই সরকার নির্বাচনী সংস্কার বাস্তবায়ন করবে; এরপর একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার এক বা দুই বছরের মধ্যে নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে এবং নির্বাচনের ফলাফল সবাই সানন্দে মেনে নেবে।

রাজনৈতিক বাস্তবতা ছিল একেবারেই ভিন্ন। আওয়ামী লীগ গোটা ডিসেম্বর মাস জুড়ে আন্দোলন চালিয়ে যায়। রাজপথে সেনাবাহিনী নামিয়েও তা মোকাবেলা করা সম্ভব হয়নি। বেগম খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে যেতে থাকেন। কিন্তু রাজপথ থাকে শেখ হাসিনার নিয়ন্ত্রণে। এ প্রেক্ষাপটেই আসে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারির জরুরি অবস্থা, যা অবসান ঘটায় বিএনপি শাসনের। অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মদ নামমাত্র রাষ্ট্রপতি থাকেন। ক্ষমতা চলে যায় সেনাবাহিনীর সমর্থনপুষ্ট বিশেষ ধরনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। তাদের নিয়ন্ত্রণে ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

সেই থেকে টানা ১১ বছর শেখ হাসিনা ক্ষমতায়। সংবিধান অনুযায়ী আরও চার বছর তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। বিএনপি কি লগি-বৈঠার মতো রাজপথের কোনো আন্দোলন গড়ে তুলে তাকে ক্ষমতা থেকে মাঝপথে সরিয়ে দিতে পারবে? এ চেষ্টা তারা ২০১২ সালের শুরু থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত কয়েক দফা করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে এ ধরনের সাফল্য আসবে, এমন সম্ভাবনা কিন্তু বিএনপির প্রতি অতিমাত্রায় আস্থা পোষণকারীরাও দেখেন না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View