চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রোগীর মৃত্যুতে ফৌজদারি অপরাধ: হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত

Nagod
Bkash July

সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ রোগীকে চিকিৎসা দিতে অনীহা দেখালে এবং এর ফলে রোগীর মৃত্যু হলে তা ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ অর্থাৎ ‘ফৌজদারী অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে বলে হাইকোর্টের দেয়া গতকালের আদেশ স্থগিত করা হয়েছে।

Reneta June

হাইকোর্টের আদেশ স্থগিত চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষের করা আবেদনের শুনানি নিয়ে আজ আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতের বিচারপতি মো. নুরুজ্জামান হাইকোর্টের দেয়া গতকালের ১১ টি নির্দেশনার মধ্যে ১,৮ ও ৯ নম্বর নির্দেশনা বহাল রেখে এবং ১০ নম্বর নির্দেশনাটি নট প্রেস রিজেক্ট করে বাকি নির্দেশনাগুলো স্থগিত করেছেন।
আজ ভার্চুয়াল চেম্বার আদালতে রিটের পক্ষে শুনানিতে ছিলেন আইনজীবী জেড আই খান পান্না, আইনজীবী অনিক আর হক, আইনজীবী ইয়াদিয়া জামান ও আইনজীবী মাহফুজুর রহমান মিলন। আর রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা।
বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ অধিগ্রহণ ও ‘সেন্ট্রাল বেড ব্যুরো’ স্থাপন, করোনা আক্রান্ত ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিতকরণ, রোগীদের থেকে অতিরিক্ত অর্থ না নেওয়া এবং সাধারণ রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও ঢাকা শহরকে সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা চেয়ে করা ৫ টি রিটের শুনানি নিয়ে গতকাল বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ অভিমতসহ ১১ টি নির্দেশনা দিয়ে আদেশ দিয়েছিলেন।

গতকাল হাইকোর্টের দেয়া আদেশগুলো হল:-
১) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক (সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসায় গত ১১ মে জারীকৃত দুটি নির্দেশনা এবং ৫০ শয্যা বা তার বেশি শয্যা বিশিষ্ট সরকারি-বেসরকারি হাসপতালে কোভিড ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার গত ২৪ মে জারীকৃত আরেকটি নির্দেশনা।) যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে কিনা, সে বিষয়ে একটি প্রতিবেদন আগামী ৩০ জুনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সচিব এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে।

২) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক জারীকৃত নির্দেশনাসমূহ পালনে ব্যর্থ ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে এ পর্যন্ত কোন ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে কিনা, তা প্রতিবেদন আকারে আদালতকে জানাতে হবে।

৩) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২৪ মে জারীকৃত নির্দেশনা অনুসারে ৫০ শয্যা অধিক বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহে ১৫ জুন পর্যন্ত কতজন কোভিড এবং নন-কোভিড রােগীর চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে সে সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন ৩০ জুনের মধ্যে আদালতে জমা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। সেই সঙ্গে ৫০ শয্যার অধিক বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহের একটি তালিকা পাঠাতে হবে।

৪) বর্তমান প্রেক্ষপটে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনা সমূহ বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যথাযথভাবে প্রতিপালন করছে কিনা, সে বিষয়ে বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহের কর্তৃপক্ষকে ১৫ দিন পর পর একটি প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে প্রেরণ করার নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে এবং সে সকল প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ১৫ দিন পর পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে আদালতে একটি প্রতিবেদন পাঠাতে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

৫) বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিক সমূহের বিশেষত: ঢাকা মহানগর ও জেলা, চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলা সহ বিভাগীয় শহরের বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যাতে কোভিড ও নন-কোভিড সকল রােগীকে পরিপূর্ণ চিকিৎসা সেবা প্রদান করেন সে বিষয়ে সার্বক্ষণিক মনিটরিংয়ের জন্য একটি মনিটরিং সেল গঠনের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেয়া যাচ্ছে।

৬) কোন সরকারী বা বেসরকারী হাসপাতালে গুরুতর অসুস্থ কোন রােগীকে চিকিৎসা সেবা প্রদানে অনীহা দেখালে এবং এতে করে ঐ রােগীর মৃত্যু ঘটলে তা অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে বিবেচিত অর্থাৎ ‘ফৌজদারী অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হবে। এক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় আনার নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

৭) স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক কেন্দ্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত সরকারী হাসপাতালে আইসিইউ ব্যবস্থাপনা কর্যক্রমকে অধিকতর জবাবদিহিমূলক ও বিস্তৃত করতে হবে। ভুক্তভােগীরা যাতে এই সেবা দ্রুত ও সহজভাবে পেতে পারেন তা নিশ্চিত করতে হবে। কোন হাসপাতালের আইসিইউতে কত জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন এবং কতটি আইসিইউ শয্যা কী অবস্থায় আছে তার আপডেট প্রতিদিনের প্রচারিত স্বাস্থ্য বুলেটিন এবং অন্যান্য সামাজিক যােগাযােগ মাধ্যমে প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে। আইসিইউ ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং সেলে ভুক্তভােগীরা যাতে সহজেই যােগাযােগ করতে পারে সেজন্য ‘আইসিইউ হটলাইন’ নামে পৃথক হটলাইন চালু এবং হটলাইন নাম্বারগুলাে প্রতিদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষতঃ টেলিভিশন মাধ্যমে প্রচারের ব্যবস্থা নিতে হবে।

৮) আইসিইউ তে চিকিৎসাধীন কোভিড-১৯ রােগী চিকিৎসার ক্ষেত্রে বেসরকারী হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ যাতে মাত্রাতিরিক্ত বা অযৌক্তিক ফি আদায় না করতে পারে সে বিষয়ে মনিটরিং এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৯) অক্সিজেন সিলিন্ডারের খুচরা মূল্য এবং রিফিলিংয়ের মূল্য নির্ধারণ করে দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে। খুচরা বিক্রেতাদের সিলিন্ডারের নির্ধারিত মূল্য প্রতিষ্ঠান বা দোকানে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃত্তিম সংকটরােধে চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র এবং রোগীর পরিচয়পত্র ব্যতিত অক্সিজেন সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রয় বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিবেচনা করতে পারে। আর অক্সিজেন সিলিন্ডার সরবরাহ ও বিক্রয় ব্যবস্থা মনিটরিং জোরদার করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া যাচ্ছে।

১০) সরকার ইতােমধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা বিবেচনায় লাল, হলুদ ও সবুজ জোনে বিভক্ত করে পর্যায়ক্রমে লকডাউনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। এমতাবস্থায়, বর্তমান পর্যায়ে লকডাউনের বিষয়ে কোন আদেশ দেওয়া সংগত হবে না মর্মে আদালত মনে করছে।

১১) দেশে বিদ্যমান সামগ্রিক পরিস্থিতি অর্থাৎ বর্তমানে দেশে বিরাজমান করােনা পরিস্থিতিকে একটি ‘দুর্যোগ’ বিবেচনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গৃহীত কার্যক্রমের পাশাপাশি সরকার “ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এ্যাক্ট-২০১২” এর ধারা-১৪ অনুসারে “ন্যাশনাল ডিজাস্টার রেসপন্স কো-অরডিনেশন গ্রুপ” এর কার্যক্রমকে সক্রিয় করার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে। যে কমিটির সমন্বয়ে ওই গ্রুপ সে কমিটির সুপারিশের আলােকে ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট এ্যাক্ট এর ২৬ ধারা অনুযায়ী বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিক রিকুইজিশান করা যেতে পারে।

এর আগে হাইকোর্টে ৫ টি রিটের পক্ষে আলাদাভাবে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ, আইনজীবী ইয়াদিয়া জামান, আইনজীবী অনিক আর হক, আইনজীবী মাহফুজুর রহমান মিলন ও আইনজীবী জামিউল হক ফয়সাল। আর হাইকোর্টে রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মুরাদ রেজা, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত তালুকদার ও সহাকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অবন্তী নূরুল।
এর আগে ভিন্ন-ভিন্ন সময়ে ভার্চুয়াল হাইকোর্টে ৫ টি রিট করা হয়। বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউ অধিগ্রহণ ও ‘সেন্ট্রাল বেড ব্যুরো’ স্থাপনার নির্দেশনা চেয়ে রিট করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ডা. আব্দুল আল মামুন।

অন্যদিকে, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল থেকে সাধারণ রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট করেন আইনজীবী এ এম জামিউল হক, মো. নাজমুল হুদা, মোহাম্মাদ মেহেদী হাসান এবং ব্যারিস্টার একেএম এহসানুর রহমান।

এছাড়া, সাধারণ রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিতের নির্দেশনা চেয়ে জাস্টিস ওয়াচ ফাউন্ডেশনের পক্ষে আর একটি রিট করেন প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক আইনজীবী মাহফুজুর রহমান মিলন। আর করোনা চিকিৎসায় সরকারি নির্দেশনার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে রিটটি করেন আইনজীবী আইনুন্নাহার সিদ্দিকা। এছাড়া করোনাভাইরাস সংক্রামণের প্রেক্ষাপটে ঢাকা শহরকে সম্পূর্ণ লকডাউন ঘোষণা চেয়ে রিট করেন অ্যাডভোকেট মো: মাহবুবুল ইসলাম।

BSH
Bellow Post-Green View