চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রথম বাংলাদেশ কংগ্রেস উদ্বোধন

বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মিলার রোগতত্ত্ব ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রথম বাংলাদেশ কংগ্রেসের উদ্বোধন করেছেন। দুই দিনব্যাপী (মার্চ ৩১ এবং এপ্রিল ১) এই সম্মেলনে সশরীরে উপস্থিত হয়ে এবং অনলাইনের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন অধিবেশনে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ সম্পর্কিত তাদের অভিজ্ঞতা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান বিনিময় করেন।

পাশাপাশি, কোভিড-১৯ সংক্রান্ত জ্ঞান ভবিষ্যতের মহামারি ও প্রাদুর্ভাব মোকাবেলায় ব্যবহার এবং বাংলাদেশে এপিডিমিওলোজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের সংখ্যা বাড়ানোর লক্ষ্যে সহায়তা করতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একটি বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক প্রতিষ্ঠিত হবে ।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) কোভিড-১৯ মহামারি চলাকালে বাংলাদেশ ও বিশ্বের মানুষের জীবন বাঁচাতে ও তাদেরকে সুস্থ রাখতে ‘ফিল্ড এপিডিমিওলোজি’ ও জনস্বাস্থ্য যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে তা তুলে ধরতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়; রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) এবং বাংলাদেশ এপিডিমিওলোজি অ্যাসোসিয়েশন এর সাথে যৌথভাবে প্রথমবারের মতো এই জাতীয় কংগ্রেস আয়োজন করছে।

সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে রাষ্ট্রদূত মিলার এবং আইইডিসিআর এর পরিচালক ড: শিরিন সিডিসির অর্থায়নে পরিচালিত ‘ফিল্ড এপিডিমিওলোজি ট্রেনিং প্রোগ্রাম (এফইটিপি)’ সফলভাবে সমাপ্তকারী ১০ জন স্নাতককে সনদ প্রদান করেন। ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশে এফইটিপি কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৩৩ জন বাংলাদেশী এপিডিমিওলোজিস্ট দুই বছরের এই কঠোর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। এই কোর্সের প্রশিক্ষিত ফেলোরা গত এক বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় সম্মুখসারিতে থেকে কাজ করছেন। তারা প্রাণঘাতি এই ভাইরাসের গতিবিধি বোঝা ও নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে কী করণীয় খুঁজে পেতে সম্মুখসারিতে থেকে কোভিড-১৯ কেস তদন্ত, কন্ট্যাক্ট ট্রেসিংসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাজ করছেন।

দুই দিনব্যাপী সম্মেলনে বাংলাদেশ ও বিশ্বের রোগতত্ত্ববিদ, তরুণ গবেষক, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী, বাংলাদেশ ও অন্যান্য দেশের কমিউনিটি মেডিসিনের শিক্ষকবৃন্দ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইন্সটিটিউট (আইইডিসিআর) ও অন্যান্য সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি, স্থানীয় মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন ও মেডিকেল শিক্ষা খাতের প্রতিনিধি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)-সহ আন্তর্জাতিক সংস্থাসমূহ এবং দাতা সংস্থার প্রতিনিধিবৃন্দ কোভিড-১৯ ও অন্যান্য রোগ যেমন ডিপথেরিয়া, ডেঙ্গু, ইনফ্লুয়েঞ্জা, কলেরা, হেপাটাইটিস ইত্যাদি রোগের প্রাদুর্ভাব এবং পরিবেশগত স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য, হৃদরোগ, টক্সিকোলজি বা বিষবিজ্ঞানসহ ক্রমবর্ধমান স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে বাংলাদেশের বৈজ্ঞানিক পাঠগুলোসহ জনস্বাস্থ্য বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করবেন। এপিডিমিওলোজি ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে একই ধরনের বৈজ্ঞানিক সম্মেলন প্রতিবছর আটলান্টাতে সিডিসির সদর দপ্তরে এবং আরো অনেক দেশে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এবারই প্রথমবারের মতো এই বিষয়ের উপরে জাতীয় কংগ্রেস আয়োজন করা হলো, যা আগামীতে প্রতি দুই বছর অন্তর আয়োজন করার ইচ্ছা আয়োজকদের রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

কংগ্রেসে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত মিলার বাংলাদেশে কোভিড-১৯ মোকাবেলায় অব্যাহতভাবে কাজ করার জন্য এপিডিমিওলোজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা করে এই ধরনের একটি কংগ্রেস আয়োজনের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “বিশ্বব্যাপী ও বাংলাদেশে এপিডিমিওলোজি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগ বাড়াতে অনেকের যে প্রচেষ্টা তার প্রতি সমর্থন জানিয়ে একাত্মতা প্রকাশ করতে আজ আমি এখানে এসেছি। মহামারি আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। তার মধ্যে একটি হলো নীতি ও কার্যক্রমের কার্যকারিতা এর ভিত্তি বিজ্ঞান ও ডেটার কার্যকারিতার সমতুল্য। আমরা মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার কথা বলছি, যা আজ আমরা এখানেও পালন করছি, কারণ বিজ্ঞান ও ডেটা থেকে আমরা জানতে পেরেছি এগুলো কার্যকর। আমরা ভ্যাকসিনের প্রচার করছি কারণ ভ্যাকসিনের পরীক্ষা ও ভ্যাকসিন পরবর্তী সার্ভিল্যান্স ডেটা থেকে আমরা জেনেছি যে ভ্যাকসিন নিরাপদ ও কার্যকর। এর কোনটাই সম্ভব ছিলো না যদি এপিডিমিওলোজিস্ট ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা কাজ না করতেন … আমরা সকলেই চ্যালেঞ্জপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক [কোভিড-১৯ সম্পর্কে] তথ্য পেতে চাই… এবং [এই তথ্য পাওয়ার জন্য] আমরা এপিডিমিওলোজিস্ট (রোগতত্ত্ববিদ) ও জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের দ্বারস্থ হই, যারা বিভিন্ন ধরনের তথ্যগুলো একত্রিত করে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরেন অনেকটা সেই গোয়েন্দাদের মতো যারা অপরাধের ঘটনায় অপরাধের দৃশ্যগুলো একত্রিত করে অপরাধকে উম্মোচন করেন। এটা কোন সহজ কাজ নয়। তবে এটি যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তা আমরা আর অস্বীকার করতে পারি না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সিডিসি-র সুপারিশ মতে প্রতি ২ লাখ জনসংখ্যার জন্য অন্ততপক্ষে একজন করে মেডিকেল এপিডিমিওলোজিস্ট (রোগতত্ত্ববিদ) থাকার হিসেব অনুযায়ী বাংলাদেশে কমপক্ষে ৮৫০ জন পূর্ণ-প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মেডিকেল এপিডিমিওলোজিস্ট নিয়োজিত থাকার কথা উল্লেখ করে সিডিসির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ড. মাইকেল ফ্রিডম্যান বলেন যে, ” ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে সিডিসি-র অর্থায়নে পরিচালিত এফইটিপি-র অসাধারণ অর্জনে আমরা গর্বিত, তবে এখনো অনেক কিছু করার আছে। লক্ষ্যকৃত ৮৫০ জন পূর্ণ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিল্ড এপিডিওমোলজিস্ট তৈরি করা ও তাদেরকে নিয়োগ দিতে হলে বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক সহযোগীদের দিক থেকে এফইটিপির মতো প্রশিক্ষণ কর্মসূচি বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিটি জেলায় এপিডিমিওলোজিস্টের পদ সংযোজন করতে হবে। কোভিড-১৯ মহামারি বিশ্বকে শিখিয়েছে যে এপিডিওমোলজিস্ট বা রোগতত্ত্ববিদগণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ এবং নিজের এলাকা, দেশ কিংবা বিশ্বে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে ইচ্ছুক তরুণ স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের জন্য এটি একটি পছন্দনীয় সেরা পেশা বা কর্মজীবন হতে পারে।”

সিডিসির অর্থায়নে এপিডিমিওলোজি ও জনস্বাস্থ্য বিষয়ক প্রথম বাংলাদেশ কংগ্রেস আয়োজন গতবছর থেকে কোভিড-১৯ পরীক্ষায় বাংলাদেশী ল্যাবরেটরিগুলোর সামর্থ্য বৃদ্ধি, কোভিড-১৯ রোগীদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও এই রোগের বিস্তার রোধসহ বাংলাদেশের করোনাভাইরাস মোকাবেলা প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দেওয়া ৭৩ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অনুদানে নেওয়া উদ্যোগগুলোর একটি। এটি গত বিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সহায়তার সাথে যুক্ত হয়ে বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্য মানসম্মত, জীবন-রক্ষাকারী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী প্রতিশ্রুতির কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি) যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংস্থা, যা ১৯৪৬ সালের জুলাই মাসে কমিউনিকেবল ডিজিজ সেন্টার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যার কাজের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল আমেরিকাজুড়ে ম্যালেরিয়া রোগ ছড়িয়ে পড়া রোধ করা। রোগের উপর নজরদারি করা সিডিসির মূল দায়িত্ব হয়ে পড়ে। সিডিসি ৬০ বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বব্যাপী কাজ করছে এবং বর্তমানে বাংলাদেশসহ ৫০টিরও বেশি দেশে কাজ করছে। সিডিসি তাদের প্রথম মেডিকেল এপিডিমিওলজিস্ট ড. স্ট্যানলি ফস্টারকে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে নিয়ে আসে। তিনি চার বছর (১৯৭২-১৯৭৬) ঢাকায় ছিলেন। এই সময়ে তিনি বাংলাদেশ থেকে গুটিবসন্ত নির্মূলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের সাথে কাজ করেছেন। পরবর্তীতে আরো অনেক সিডিসি এপিডিমিওলোজিস্ট বাংলাদেশকে বিভিন্ন ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূলে সহায়তা করেছে, যার মধ্যে রয়েছে পোলিও নির্মূল করা, কলেরা হ্রাস, বাংলাদেশে শক্তিশালী টিকাদান কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা, পুষ্টি ঘাটতি মোকাবেলা করা, এবং নিপাহ ভাইরাসের মতো নতুন ধরনের সম্ভাব্য মহামারি সৃষ্টিকারী জীবাণু তদন্ত করা। ২০১৫ সাল থেকে সিডিসি বিশ্বব্যাপী মহামারি ও বড় ধরনের রোগ শনাক্তকরণ, নিয়ন্ত্রণ ও প্রাদুর্ভাব রোধ করতে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার লক্ষ্যে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য নিরাপত্তা বিষয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে। সিডিসি বাংলাদেশ রোগের বিস্তার রোধে দেশের সামর্থ্য বাড়াতে ও বাংলাদেশীদের সুস্থ জীবনযাপনে সহায়তা করতে বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং অন্যন্য কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকারি সংস্থা, মেডিকেল ও গবেষণা অ্যাসোসিয়েশন এবং অন্যান্যদের সাথে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়ে সিডিসির কাজ সম্পর্কে আরো তথ্য জানতে দেখুন: https://www.cdc.gov/globalhealth/index.html.

কংগ্রেস সম্পর্কে আরো জানতে অনুগ্রহপূর্বক আইইডিসিআর এর ওয়েবসাইট www.iedcr.gov.bd, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ওয়েবসাইট www.dghs.gov.bd এবং কনফারেন্সের ওয়েবসাইট www.fetpbangladesh.org দেখুন।