চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাহাত খানের মৃত্যু নাই

রাহাত খানের অনেক পরিচয় আছে। আমার কাছে রাহাত খান কেবলই একজন মহৎ শিশুসাহিত্যিক। দিলুর গল্পের স্রষ্টা। ৫০ বছর আগে তিনি দিলুর গল্প লেখা শুরু করেছেন। দাদাভাই সম্পাদিত মাসিক কচিকাঁচায় প্রথম দিলুর গল্প ছাপা হতে থাকে। পরে গল্পগুলো এক সাথে সেবা প্রকাশনী থেকে ‘দিলুর গল্প’ নামে বই বের হয়।

সে এক আশ্চর্য বই। এমন কৌতুকমিশ্রিত দুষ্টুমি এমনই মৌলিক, লেখন-ভঙ্গি এমনই হাস্যরস। সবটা মিলিয়ে বুঝতে পারি এমন বই বাংলা ভাষায় দ্বিতীয়টি লেখা হয়নি। এই বইয়ের সঙ্গে লীলা মজুমদারের লেখার মিল নাই। নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের যুগান্তকারী সৃষ্টি টেনিদার কোনো মিল নাই। মিল নাই কোনো মামা বা চাচা কাহিনির সাথে।

বিজ্ঞাপন

দিলুর গল্প একক ও স্বয়ম্ভু। দিলু কারো মতো নয়। এই দিলু আমাদের পাড়া মহল্লায় যে কোনো বড় ভাইয়ের মতো।

বিজ্ঞাপন

দিলুর গল্প পড়ে রাহাত খানের খুব ভক্ত হয়ে গেলাম। ছোটোবেলায় ভাবতাম পশ্চিমবঙ্গে আছেন নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়। আর আমাদের মধ্যে আছেন রাহাত খান। তখনকার পত্রপত্রিকা খুব নিয়মিত পড়ি। ছোটোদের পাতারও মনোযোগী পাঠক আমি। কিন্তু পুরো আশির দশক জুড়ে দিলুর কোনো নতুন গল্প পাাইনি পরে জেনেছি রাহাত খান আর দিলুর গল্প লিখেননি। শুধু শিশু একাডেমীর ‘শিশু’ পত্রিকায় ‘হাসি কান্নার চিকিৎসা’ নামে বড় গল্প পড়েছিলাম। পরে শিশু একাডেমী থেকে সেটা বই আকারে প্রকাশিত হয়। আমরা গভীর মনোযোগ দিয়ে সেই বই পড়ে আনন্দে মুগ্ধ হয়ে যাই।

রাহাত খানের লেখার ভক্ত। যখন দাদাভাইয়ের কাছে যাওয়া আসা শুরু করি তখন রাহাত খানের সঙ্গে চাক্ষুষ দেখা হলো। লাজুক স্বরে বললাম, আমরা আপনার লেখার ভক্ত। রাহাত ভাই আরও লাজুক।

নানা কাজের ব্যস্ততার ফাঁকে রাহাত খান আমাদের সময় দিতেন। ভালো খাওয়াতেন। পূর্বাণী হোটেল থেকে কেক পেস্ট্রি আনতেন।

আমাদের সঙ্গে মনোযোগ দিয়ে গল্প করতেন। সাহিত্যের খোঁজখবর নিতেন। প্রচুর পড়াশোনা করতেন। অধ্যাপনাও করেছেন কিছুদিন। আমাদের বন্ধু হাবিব ওয়াহিদের বোন জামাই প্রয়াত নাজমুল হক ‘অনিন্দ্য প্রকাশ’ নামে অতি আধুনিক মুদ্রণ সমৃদ্ধ একটি প্রকাশনা সংস্থা চালু করেন। হুমায়ুন আহমেদের বইকে প্রথম জনপ্রিয় করে এই প্রকাশনা। ‘হে অনন্তের পাখি’ নামে রাহাত খানের দীর্ঘ উপন্যাস প্রকাশিত হয় অনিন্দ্য থেকে। এই বইয়ের প্রকাশনার সঙ্গে শিবলি আর আমি জড়িত হয়ে পড়ি।

মনোটাইপে কম্পোজ হচ্ছে। ফাইনাল প্রুফ দেখতে নিয়ে গেলাম রাহাত খানের কাছে। রাহাত খান খুব নিষ্ঠার সঙ্গে প্রুফ দেখতেন। আমাদের খুব স্নেহ করতেন। সেই স্নেহ আজও অব্যাহত আছে।

রাহাত খান আধুনিক কথাসাহিত্যিক। অসাধারণ সব ছোটোগল্প লিখেছেন। লিখেছেন উপন্যাস। তার উপন্যাস প্রেক্ষাপট খুব আলাদা। সুবিধাবাদী উচ্চবিত্ত ব্যক্তিদের জীবনের অন্ধকার দিক তিনি উন্মোচন করেন। এমনকি মন্ত্রী, ক্লাব-সদস্য নারী, যৌন-সংস্কার বিহীন মহিলা প্রমুখ চরিত্র অসাধারণভাবে রূপায়িত হয়েছে রাহাত খানের কলমে।

দুই
রাহাত খান খুব উদার মনস্ক লেখক। তথাকথিত লেখককের মতো সরল-সোজা নিরাড়ম্বর জীবন যাপন করেন। হোটেল শেরাটনের লবি এবং ঢাকা ক্লাবে তাকে সবসময় পাওয়া যেত। চা-কফি খেতে তিনি শেরাটন যেতেন প্রতি বিকেলে। এখন ঢাকা ক্লাবে আড্ডা। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি ক্লাবের সক্রিয় সদস্য।

বিজ্ঞাপন

রাহাত খান কলাম লেখক হিসাবেও খুব খ্যাতিমান। ইত্তেফাক যখন খ্যাতির শীর্ষ গগনে তখন রাহাত খান এই পত্রিকার সহকারী সম্পাদক ছিলেন। তার ক্যারিয়ার ইত্তেফাকে শেষ হয় সম্পাদক হিসেবে।

রাহাত খান সবসময়ই সৌখিন। পরিপাটি। প্যান্ট শার্ট। ক্লিন সেভড। শীতকালে ব্লেজার। চকচকে কালো জুতো। মৃদু পদক্ষেপে হাঁটেন। কথা বলেন বিশুদ্ধ উচ্চারণে। গম্ভীর ও গাঢ় স্বরে কথা বলেন। খুব গুছিয়ে তিনি বক্তৃতা দেন।

রাহাত খান খুব সৌখিন খাবারের পক্ষপাতী। অল্প খাবেন। কিন্তু ভালো খাবেন।

এই বিষয়টা ছোটোবেলা থেকে খুব প্রভাবিত করত আমাদের। রাহাত ভাই খুব সুন্দরভাবে হাতের পাঁচ আঙুল তুলে কথা বলেন। আর দেখা হলেই বলবেন, আমীরুল একদিন সময় দাও। একসাথে বসি। নৈশভোজে। আরও কাউকে কাউকে বলো। আড্ডা দেই।

রাহাত খান সহৃদয় লেখক। অনেক তরুণ লেখকদের আইডল তিনি। সবার ব্যক্তি পর্যায়ে খোঁজ-খবর রাখতেন। তার প্রত্যক্ষ উপকার পেয়েছে এমন লেখকদের সংখ্যাও অনেক। শিল্পী-লেখক সৈয়দ ইকবাল কিংবা কবি রেজাউদ্দিন স্টালিনের জীবিকা ধারণের ব্যবস্থাও তিনি করে দেন। তারা সকৃতজ্ঞচিত্তে এখনও রাহাত খানের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে থাকে।

রাহাত খান বহুপ্রজ লেখক। দুহাত ভরে তিনি লিখে থাকেন। পত্রিকার কলাম, গল্প, স্মৃতিগদ্য, উপন্যাস বিরামহীন লেখালেখি।

সত্তরোর্ধ তরুণ তিনি। রাহাত খানের বয়স কত হলো? মনে পড়ে রাহাত খানের পঞ্চাশ বছর পূর্তি পালন। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠান হলো। রাহাত খানের পঞ্চাশ। তরুণ লেখকদের আয়োজন। তরুণরাই আলোচক। তরুণরাই সেদিন রাহাত খান সম্পর্কে কথাবার্তা বলল।

সেদিনের কথাটা মনে পড়ে। রাহাত খানের প্রতি তরুণ লেখকদের ভালোবাসা ছোট একটা সুভ্যেনির বের হয়েছিল। তরুণদের মতামত। ছোট ছোট বাক্যে। সংকলনটি কি কারো সংগ্রহে আছে?

রাহাত ভাইয়ের কাছে যাব একদিন। আড্ডা দেব। ঢাকা ক্লাবে। দলে বলে যাব। সেই সময় সুযোগ হয়ে উঠছে না।

রাহাত খানের ভক্ত-অনুরক্তের শেষ নেই। তার চলে যাওয়ায় আমরা গভীরভাবে শোকাহত। রাহাত খান তার সৃষ্টির ভেতর বেঁচে থাকবেন। রাহাত খানের মৃত্যু নাই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)