চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘রানী রাসমণি’র বাবু রাজচন্দ্র দাসই গোপালগঞ্জের নূর

দুই বাংলার তুমুল জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘রানী রাসমণি’র বাবু রাজচন্দ্র দাসই বাংলাদেশের ছেলে। যার নাম গাজী আব্দুন নূর…

কত খবরই তো লিখি, কত খবরই তো বলি, কিন্তু কালে ভদ্রে কিছু খবর লিখা কিংবা বলার সময় এক ধরণের অহংকার কিংবা গৌরববোধ হয়। আজকের খবরটি এমনই গৌরবের।

বলছি সেকথা, খুব দরকারে একদিনের জন্য ক’দিন আগে যেতে হল কলকাতা। যাবার সময় আমার এক প্রবাসী বন্ধু বলি বা বোন তার একটাই শখ ছিলো যে করেই হোক তার প্রিয় একটা মানুষের সাথে দেখা করা। আমার একটাই স্বভাব সব কিছুতে হ্যাঁ বলা। তবে তার এই শখটি পূরণ এর দাবি এতটাই ভয়াবহ ছিল তারপরও তাকে বলেছিলাম ‘ঠিক আছে’। ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের ঝটিকা সফরে বারবার মনে হচ্ছিল আমার বন্ধু যেন তার শখ থেকে সরে আসে কিন্তু হলো না, সে নাছোড়বান্দা।

পশ্চিম বাংলায় তুমুল জনপ্রিয় গাজী আব্দুন নূর…

ঐ শহরে আমারও এক প্রিয় এবং শ্রদ্ধার মানুষকে শখ পূরণের বার্তা পৌঁছে দিলাম, শুনে খানিকটা হচকচিয়ে গেল, তারপর জানালো কথা হয়েছে ফোন নম্বর দিচ্ছি তুমি একবার কথা বলো। রিং হলো, ওপারে যখন ‘হ্যালো’ আমি তখনও বিশ্বাস করছি এমন ব্যস্ততা ছেড়ে সময় দেয়া অসম্ভব। আলাপের পর তিনি বললেন যত রাতই হোক আমি শুটিং শেষ করে আসছি আপনার হোটেলে। হোয়াটসঅ্যাপ করুন ঠিকানা। সত্যি তিনি এলেন, রাত তখন প্রায় ১০টা। হাত ভর্তি ফুল আর শরীর ভর্তি ক্লান্তি নিয়ে। কোথায় বসতে দেই হিরোকে! হোটেল ঘর এত এলামোলো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। বললেন, চলুন ঘরে বসি। তাকে দেখে হোটেলে জটলা, সেলফি তোলার ধুম আর আমার সেই প্রবাসী বন্ধুর চোখে মুখে অবিশ্বাসের চাহনি, গায়ে চিমটি কেটে দেখার জোগাড় আরও কত কি!

বাবু চন্দ্র দাস-এর হাতে ধোয়া ওঠা ব্ল্যাক কফি, শুরু হলো আড্ডা।

খুলনা বাগেরহাটের ছোট্ট শহর মোল্লারহাটের মুক্তিযোদ্ধা মান্নান গাজীর চুপচাপ গোছের পড়ুয়া ছেলেটি বৃত্তি নিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সুখ্যাত রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ওপার বাংলায় রীতিমত হইচই ফেলে দিয়েছে। এপার বাংলাতেও একই অবস্থা। কি নারী কি পুরুষ সবার কাছেই যার জনপ্রিয়তা প্রায় আসমান ছুঁয়ে ফেলার মত।

এপার বাংলায় ঠিক সন্ধ্যা সাতটা আর ওপার বাংলায় সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টায় সব চোখ আর সব অপেক্ষা তখন সাদা কালো কিংবা রঙিন কাঁচের বাক্সের সামনে। অপেক্ষা একটাই পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় সিরিয়াল ‘রানী রাসমণি’ নাটকের মধ্যমণি বাবু রাজচন্দ্র দাসের জন্য।

প্রিয় পাঠক ও পাঠিকা, আকাশ সংস্কৃতির কল্যাণে আমরা যারা বিশ্বের নানা ভাষার চ্যানেল দেখার সুযোগ পাই তারা যদি পশ্চিমবঙ্গের জি বাংলা চ্যানেলটি দেখে থাকেন তারা এতক্ষণে বুঝে ফেলেছেন আমি কার কথা বলছি।

হ্যাঁ, আমি বাবু চন্দ্র দাসের কথা বলছি। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের একটি চ্যানেলে নির্মিত ‘রানী রাসমণি’ ধারাবাহিকের রানী রাসমণির স্বামীর চরিত্রে অভিনয় করা মহা জনপ্রিয় কেন্দ্রীয় চরিত্রটির নাম বাবু রাজচন্দ্র দাস।

প্রিয় পাঠক আপনারা হয়তো জানেন না দুই বাংলার তুমুল জনপ্রিয় এই সিরিয়ালের বাবু রাজচন্দ্র দাস যে বাংলাদেশের ছেলে। ওর নাম গাজী আব্দুন নূর। আট ভাই বোনের মধ্যে সপ্তম। বাবা তৎকালীন রাইফেলসে চাকরি করতেন, ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। শুধু বাবা নয়, স্বাধীনতার জন্য নুরের মাও করেছেন মুক্তিযুদ্ধ। জন্ম বাগেরহাটে হলেও বেড়ে ওঠা মামার বাড়ি গোপালগঞ্জের মধুমতির পাড়ে। চলুন তার বেড়ে উঠা এবং কলকাতা যাওয়ার গল্প শুনি নূরের মুখেই।

নূরের ছেলেবেলা
খুব কট্টরপন্থী মুসলিম বাড়ির আলো বাতাসে বড় হওয়া। সেই পরিবারে গলা ছেড়ে গান করা তো দুরের কথা গুনগুনিয়ে কেউ গান না গাইলেও কেউ যদি গাইতে চাইতো, তাকে গলা টিপে কেউ মারতে আসতো না বরং পাশে দাঁড়াতো। নুরের সেই ইচ্ছের পাশে দাঁড়ায় তার বোনেরা।
নূর বাবাকে হারিয়েছে খুব ছোট বয়সে। মায়ের কাছেই বাবার গল্প শুনে বড় হওয়া নুর বাবার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সঙ্গে নিয়েই বাংলাদেশের নাম ছড়াতে চান পুরো বিশ্বে। ভিন দেশের ছেলে বলে পশ্চিমবঙ্গের ইন্ডাস্ট্রির কেউ তাকে দূরে সরিয়ে রাখেনি বরং পাশের বাড়ির পরম বন্ধু বলে সহযোগিতা পেয়ে যাচ্ছেন।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
প্রথমে পড়াশোনার জন্য, এখন অভিনয়ের জন্য বাংলাদেশের পাসপোর্ট নিয়েই অন্য শহরে কাজ করে যাওয়া নূর ভালো কাজ পেলে নিজের দেশে কাজ করতে চান। ইতোমধ্যে নার্গিস আকতারের পরিচালনায় বিখ্যাত নাট্যকার সেলিম আল দ্বীনের ‘যৈবতী কন্যার মন’ সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ছবিটি বড় পর্দায় মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। কথা হলো ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দায় যাওয়ার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে।

পশ্চিমবঙ্গে বড় পর্দায় কাজ নিয়ে চলছে কথাবার্তা। নূরের আশা চন্দ্র দাস ইমেজ ভাঙতে কমার্শিয়াল কিংবা প্যারালাল যে কোন ছবিতে কাজ করবেন তিনি। তবে বুঝে শুনে। কারণ সব সময় খিদেটা ভালো কাজের। নিজের দেশের নাটক নিয়ে গর্বের শেষ নেই নূরের। ছোট পর্দার দাপটে অভিনেতা মোশাররফ করিমের অন্ধভক্ত নুর, বাংলাদেশের সিনেমা নিয়েও বড় আশাবাদী। তবে ভালো গল্প এবং টেকনিক্যাল দিক নিয়ে ভাবার সময় এসেছে বলেও জানিয়েছেন নূর।

ওপাড় বাংলার জনপ্রিয় অভিনেত্রী ঋতুপর্ণার সঙ্গে নূর

নূরের প্রথম প্রেম, প্রথম ভুল এবং ভালোলাগা
প্রায় ত্রিশের কাছে যাওয়া নুরের জীবনে কি শুধুই ক্যামেরা আর ডায়ালগ? ব্যক্তি নূর কেমন? কী তার ভালোলাগা কী তার ভালোবাসা কিসে তার ভয় কিসে তার আনন্দ কত কিছুই তো জানতে চায় দর্শক।

লাজুকতার রেশ নেই বরং নম্রতা আর বিনয়ে আপাদমস্তক মোড়ানো নূর অনর্গল কথা বলছে অভিনয় সাহিত্য রাজনীতি এবং প্রেম নিয়ে। এত খ্যাতি এত যশ এত ভক্তকূল কী করে সামাল দেন সে কথা যেমন বললেন। তেমনি শোনালেন ১৫ ঘণ্টা কাজে ডুবে থাকার কথা। জানতে চাইলাম প্রেমের খবর। জানালো ২০০৯ সালে বাগেরহাটে প্রেমে পড়েছিলেন একজনের তবে সেটিকে এখন ভুল ভেবে ভুলে যেতে চান। সেই প্রেমকে খুব ছোটকালের অবাধ্যতাও বলে মনে করেছেন। আর বড় বেলায় ২০১৫ তে রবীন্দ্র ভারতীতে পড়ার সময় আবারো প্রেম। সেই প্রেমও শেষ। তারপর থেকে প্রেম মানেই নাকে খত কিংবা কান ধরে দৌড়। সেই অর্থে এখনও গভীর প্রেমের জটিল সমীকরণ ছাড়াই বেশ ফুরফুরে মেজাজে একাই বেশ ভালো আছেন লক্ষ নারীর আরাধ্য দেবতা বাবু চন্দ্র দাস রুপী নূর।

প্রেম নিয়ে নূর আমাদের যা বললেন সেটিই বিশ্বাস করতে হলো কারণ তারারা প্রেম নিয়ে লুকোচুরি করবে এটাই স্বাভাবিক। তবে নূরের যে ভক্ত এবং বন্ধুর সংখ্যা গণনাহীন সেটি বিশ্বাসযোগ্য। একটু সময় পেলেই আড্ডাবাজী সেই সঙ্গে বাজার করা রান্না করা এবং খাওয়ানো তার বদ অভ্যাস কিংবা প্রিয় অভ্যাস দুটোই বলতে পারি। হাজারো ব্যস্ততায় বই পড়া কিংবা বই কেনা আরেক বাতিক নূরের। সময় পেলেই বাগেরহাট থেকে মা ছুটে যান ছেলের কাছে। যে যখন সময় পান তখনই ভাইকে দেখতে বোনেরা আসে। এমন করেই চলছে বাংলাদেশে জন্ম নেয়া কিন্তু ভারতে আলো ফেলা ভীষণ রকম জনপ্রিয় কিন্তু অসম্ভব রকম সাধারণ নূরের রোজকার জীবন।

প্রিয় পাঠক শুরুতে বলেছিলাম কিছু খবর লিখতে সাংবাদিকদের ভীষণ ভালোলাগা ভর করে। কেনো বলেছিলাম এতক্ষণে পুরোটাই বুঝেছেন। আসলে শিল্পী আর শিল্পের কোন দেয়াল নেই নেই কোন সীমান্ত। আকাশ সংস্কৃতির হাত ধরে ভালোমন্দ সবই আপনার হাতের মধ্যে। কোনটা বেছে নিবেন তার জন্য প্রস্তুত আছে রিমোট। ওপারে আলো ছড়াচ্ছে আমাদের বাংলাদেশের নুর সেটি তো অহংকারের সেই জন্য ধন্যবাদ আকাশ মাধ্যমকে। গল্পের প্রয়োজনে বাবু রাজচন্দ্র দাস এর অধ্যায় শেষ হলেও নূর তোমাকে নতুন রূপে নতুন ভাবে দেখার অপেক্ষায় রয়েছে তোমার বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন: