চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

রাজধানীতে বাজার দর নিয়ন্ত্রণের বাইরে

রাজধানীতে নিরবে-নিভৃতে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সব ধরনের জিনিসের দাম বাড়লেও এ নিয়ে নীতি নির্ধারকদের তেমন কোনো মাথা ব্যথা আছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। করোনার দুর্যোগে সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে প্রাইভেট সেক্টরের বেশিরভাগ কর্মজীবীরই আগের তুলনায় মাসিক আয় কমেছে। দিনের পর দিন বন্ধ থাকার কারণে ছোট ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তাদের ব্যবসা এলোমেলো হয়ে গেছে। লোন আর দেনার কারণে অনেকেই নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ছেড়েও দিয়েছেন। স্কুল, কোচিংসহ বিভিন্ন ধরনের প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান যারা পরিচালনা করতেন তারা অসহনীয় এক অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। বাজারে বেচাকেনাও আগের মতো নেই। কিন্তু এর মধ্যে খাদ্যপণ্যসহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় শহরের নিন্ম-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মাঝে নতুন করে হতাশা তৈরি হয়েছে।

রাজধানীর মধ্যবিত্তরা এখন বাজারে গিয়ে ভীষণ রকম হোঁচট খাচ্ছেন। শুধু চাল, ডাল নয় মাছ, মুরগি থেকে শাক-সবজি সবকিছুর দামই বেড়ে গেছে গত দুই সপ্তাহে। মাছের দাম বরাবরের মতোই আকাশ ছোঁয়া। একটা ভালো মাছ খাওয়া এখন ভাগ্যের বিষয়। দাম বৃদ্ধিও ঘটনা এখানেই শেষ নয়। প্যাকেটজাত সব খাদ্যপণ্যেরও দাম বেড়েছে। দাম বেড়েছে দুধ, ডিম, পাউরুটি থেকে শুরু করে সমস্ত ধরনের কনফেকশনারী আইটেমেও। পণ্যের দাম বাড়ার কারণে প্রতিটি পরিবারকেই এখন বেশি খরচ গুনতে হচ্ছে। অনেকে চাহিদা মোতাবেক খরচ গুনতে না পারার কারণে কম করে পণ্য কিনছেন। মূল্য বাড়ার কারণে টিসিবি থেকে পণ্য কেনার জন্যও ভীড় বাড়ছে। বাজারের বাইরে টিসিবি তাদের নির্ধারিত মূল্যে বেশ কমে তাদের পণ্য বিক্রি করছে। কিন্তু বাধ্যবাধকতা থাকার কারণে বর্তমানে টিসিবি প্রয়োজনের তুলনায় সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারছে না। পণ্যের দাম কতোটা বৃদ্ধি পেয়েছে তা যে কোনো একটি পণ্যের দামের দু-মাসের তুলনামূলক হিসেব নিকেশ করলেই বোঝা সম্ভব। ডিমের কথাই ধরা যাক। শহরের নিন্ম- মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারে ডিম খুবই প্রয়োজনীয় খাবার। পরিবারের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে ডিমের বিকল্প নেই। কিন্তু ডিমের ডজনে দাম বেড়েছে ত্রিশ টাকার মতো। মাস খানেক আগে ঢাকার বাজারে ফার্মের লাল-সাদা একডজন ডিমের গড় দাম ছিল ৯০ টাকা। কিন্তু সেই ডিমের দাম ঠেকেছে ১২০ টাকাতে। জুন-জুলাই মাসে ডজন প্রতি ডিমের দাম আরো কম ছিল। ফার্মেও বিভিন্ন ধরনের মুরগি নিন্ম-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রায় নিত্যদিনের খাবার। মাছের থেকে মুরগি বরাবরই সাশ্রয়ী। তাছাড়া পরিবারের বাচ্চারা মাছের তুলনায় মুরগি খেতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। শহরের নিন্ম-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর খাদ্যচাহিদায় এই কারণে বড় একটি উপাদান মুরগি। কিন্তু সেই মুরগির দাম এখন অনেকটাই লাগাম ছাড়া। পোল্ট্রি মুরগির দাম যেমন বেড়েছে, তেমনি পাকিস্তানি জাত বলে পরিচিত মুরগির দামও বেড়েছে। বর্তমানে পাকিস্তানি জাতের মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩২০ টাকা করে। অথচ দু সপ্তাহ আগেও এই দাম ছিল ২৭০ থেকে ২৮০ টাকার মধ্যে। পোল্ট্রি বা ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা কেজিতে। কিন্তু কিছুদিন আগেও কেজি বিক্রি হয়েছে ১৪০ টাকাতে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

সব ধরনের শাকসবজি ও ফলের দাম আরও চড়া। শুধু আলুর দাম তুলনামূলক সহনীয় থাকলেও পেঁয়াজ থেকে শুরু করে মরিচ, শসা, লাউ, শিম, বেগুন, ঁেপপে, বরবটি, ঢেঁড়স, করলা, চিচিঙ্গা, কুমড়ো, ডাটা, গাজর সবকিছ্রুই দাম বেশি। আলু বর্তমানে ২০ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। এদিকে কিছু বাজার ভেদেও দাম যেনো আরও বেশি। বিশেষ করে রাজধানীর নিউমাকেট, মোহাম্মদপুরের টাউন হল ও কৃষি বাজারে সবকিছুর দাম তুলনামূলক অনেক বেশি। এসব বাজারে মধ্যবিত্তদের আনাগোণা বেশি। মাছের দাম নিয়ে কথা না বলাই ভালো। সব ধরনের মাছের দামই বেশি। অনেকেই বলেন, মাছের বাজারে ঢুকলে পকেটে আর টাকা থাকে না। শিং, টেংরা, পুঁটি, কাচকি, রুই, কাতলা প্রতিটি মাছের দামই এখন বেশি। খাদ্যতালিকা থেকে অনেকেই মাছকে এখন দূরে রাখেন। ফলের দাম নিন্ম-মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আপেল, নাশপাতি, আঙুর সবকিছুর দাম বেশি।

বিজ্ঞাপন

প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম হু হু করে বাড়ার কারণে অনেকেই বাজারে গিয়ে ভীষণ ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। টাউন হল বাজারে গিয়ে কথা হয় ক্রেতা এবং বিক্রেতার সাথে। অনেকেই জানিয়েছেন প্রতিটি জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই তারা পরিবারের চাহিদা মতো পণ্য ক্রয় করতে পারছেন না। বাজারে দাঁড়িয়ে এ বিষয়ে কথা বলেছিলেন, দেশের একটি দৈনিক পত্রিকার সহকারি সম্পাদক। তিনি নিজে নিয়মিত বাজার করেন। পণ্যের অতিরিক্ত দাম তাঁকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে। প্রতি মাসে তাঁর যে বাজেট সেই বাজেট দিয়ে পারিবারিক বাজার চাহিদা পূরণ করতে পারছেন না বলে জানালেন। অনেকটা ক্ষোভ প্রকাশ করেই বললেন, ‘প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। কিন্তু কেন বাড়ালো সেটা কেউ বলতে পারছে না। বাজারে পণ্যের সরবরাহ রয়েছে। কিন্তু দাম বেড়েই চলেছে।’ এই সাংবাদিক বলেন কিছুদিন আগে তিনি লাল চিনি কেজি ৮৫ টাকা কিনলেও এখন কিনতে হচ্ছে ৯৫ টাকা দরে। কিন্তু কেজিতে কেন বেড়েছে তার কোনো উত্তর নেই। জনৈক দোকানী বলেন, ‘প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়েছে। বেশি দামে কিনে আনতে হচ্ছে, তাই আমাদেরও বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।’

এদিকে সিলিন্ডার গ্যাস যারা বাসা-বাড়িতে ব্যবহার করেন তাদেরকে পড়তে হয়েছে আরও বিপাকে। কোনো কারণ ছাড়াই প্রতিমাসে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম বেড়েই চলেছে। বাড়তি দামেই ক্রয় করতে হচ্ছে গ্যাস। বাসা বাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাসের মধ্যে জনপ্রিয় ওমেরা, বেক্সিমকো, বসুন্ধরা, ইউনাইটেড, নাভানা, সৈনিক, প্যাট্রোম্যাক্সসহ অন্যান্য গ্যাস। বর্তমানে প্রতিটি কোম্পানীর গ্যাসের দাম-ই চড়া। সিলিন্ডার গ্যাসের বাজারে চলছে তুঘলকি কান্ড। বর্তমানে রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকাতে ১২ কেজির সিলি-ার গ্যাস বিক্রি হচ্ছে- ১১৫০ টাকা দরে। অথচ জুন-জুলাই মাসে এই গ্যাস এক হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। সিলিন্ডার গ্যাসের দাম সরকার নির্ধারণ করে দিলেও সে দামে কখনই বিক্রি হয় না। সবসময়ই বেশি দামে বিক্রি হয়।

আমরা জানি, আমাদের কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অনৈতিক কাজ কারবার এবং মধ্যস্বত্ত্বভোগীর দৌরাত্মের কারণে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। অনেক সময় জোগান বা সরবরাহের কৃত্রিম সংকট দেখিয়েও একশ্রেণীর মুনাফাখোররা সাধারণ মানুষের পকেট কেটে টাকা লুণ্ঠন করে। আবার কৃষি পণ্য বিপণনের ক্ষেত্রেও এখন পর্যন্ত দেশে কোনো ন্যায্য পদ্ধতি গড়ে উঠেনি। তাই আমরা দেখতে পাই যে কৃষক পণ্য উৎপাদন যারা করছে সেই কৃষককূল বাবার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। অন্যদিকে অসাধু সিন্ডিকেট পাইকার, মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা মুনাফা অর্জন করছে। মন্ত্রীরা অনেকসময় বাজার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে মেঠো বক্তৃতা প্রদান করলেও সঠিক পদক্ষেপ নিতে কখনও মাঠে নামতে দেখা যায় না। বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য নিয়মিত মনিটরিংও করা হয় না। এভাবেই চলছে। আর ভীষণরকম অর্থনৈতিকভাবে ফতুর হচ্ছে সাধারণ মানুষ। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরা এ বিষয়ে একটি দায়িত্বশীল হবেন বলে আমাদের প্রত্যাশা।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)