বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই নিজের স্থান করে নিয়েছেন। আমাদের সামগ্রিক চিন্তাভাবনা, বোধ, মনন আর বিশ্বাসের সর্বত্র জুড়ে তিনি একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে রেখেছেন। তাঁর শিশু সাহিত্য বাঙালির মানস জগতকে বিস্তৃত করেছে নানাভাবে। তাঁর ছড়া আর গান শুনে শুনে বাঙালি বড় হয়ে উঠেছে।
রবীন্দ্রনাথের শিশুতোষ ছড়াগ্রন্থ মূলত দু’টি- ‘খাপছাড়া’ ও ‘ছড়া’।
‘খাপছাড়া’ ছড়াগ্রন্থ শুরু করেছেন তিনি এভাবে-
‘সহজ কথা লিখতে আমায় কহ যে
সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।
লেখার কথা মাথায় যদি জোটে
তখন আমি লিখতে পারি হয়তো,
কঠিন লেখা নয় কো কঠিন মোটে
যা-তা লেখা তেমন সহজ নয় তো।’
রবীন্দ্র ভাষা, রবীন্দ্র চিন্তা-চেতনা শাসন করছে আমাদের। রবীন্দ্রনাথ সহজ কথাগুলোকে কি অসাধারণ নৈপুণ্যে গুছিয়ে লিখে আমাদের ভেতরে জাগিয়ে তুলতে চেয়েছেন এক অন্য বোধের।
কি রকম! যেমন-
‘ভোলানাথ লিখেছিলো / তিন-চারে নব্বই
গণিতের মার্কায় / কাটা গেল সর্বই।
তিন-চারে বারো হয় / মাস্টার তারে কয়
লিখেছিনু ঢের বেশি / এই তার গর্বই।’
(৬৩ সংখ্যা ছড়া : খাপছাড়া)
ছড়ার ভেতর যে কৌতুক, শ্লেষ থাকে তা শিশুমনস্তত্ত্বের যেমন একটা বিশেষ দিক তেমনি এর অসংলগ্নতা অগোছালো কথাবার্তাও ছড়ার লৌকিক রঙ-রূপের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য। প্রথম থেকেই লোকসাহিত্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথের একটা বিশেষ দুর্বলতা ছিল, বিশেষ করে লোকছড়ার প্রতি তিনি বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন।
এর প্রমাণ পাওয়া যায় তার ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ ও ‘গ্রাম্যসাহিত্য’ প্রবন্ধে। তিনি অনেক লোকছড়া সংগ্রহও করেছিলেন। ‘ছেলে ভুলানো ছড়া’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বাংলা ভাষায় ছেলে ভুলাইবার জন্য যে সকল মেয়েলি ছড়া প্রচলিত আছে, কিছুকাল হইতে আমি তাহা সংগ্রহ করিতে প্রবৃত্ত ছিলাম। আমাদের ভাষা ও সমাজের ইতিহাস নির্ণয়ের পক্ষে সেই ছড়াগুলির বিশেষ মূল্য থাকিতে পারে কিন্তু তাহাদের মধ্যে যে একটি সহজ কাব্যরস আছে সেইটিই আমার নিকট অধিকতর আদরনীয় হইয়াছিল।’ আর এরই যেন প্রভাব পাই আমরা রবীন্দ্রনাথের রচিত ছড়াগুলোতে।
‘ছড়া’ গ্রন্থের ৬ সংখ্যক ছড়াটির আংশিক পাঠ নেয়া যাক-
দিন চলে যায় গুনগুনিয়ে ঘুমপাড়ানির ছড়া,
শান বাঁধানো ঘাটের ধারে নামছে কাঁখের ঘড়া।
আতা গাছে তোতা পাখি, ডালিম গাছে মৌ
হীরে দাদার মড়মড়ে থান, ঠাকুর দাদার বৌ।
পুকুর পাড়ে জলের ঢেউয়ে দুলছে ঝোপের কেয়া
পাটনি চালায় ভাঙা ঘাটে তালের ডোঙার খেয়া।
খোকা গেছে মোষ চরাতে, খেতে গেছে ভুলে
কোথায় গেল গমের রুটি শিকের পরে তুলে।
আমার ছড়া চলেছে আজ রূপকথাটা ঘেঁষে
কলম আমার বেরিয়ে এল বহুরূপীর বেশে।…
এখানে লৌকিক রঙ-রসের বহুবিধ ব্যবহার। এখানে লোকছড়ার মতো যেমন পরস্পরহীন ঘটনা বা অসমন্ধতা আছে তেমনি আছে বিভিন্ন লৌকিক শব্দের ব্যবহার (আতা গাছে তোতা পাখি…) সেই সাথে আছে লৌকিক সুর ও ছন্দ।
লৌকিক ছন্দের চমৎকারিত্ব ফুটে উঠেছে নিচের ছড়াটিতেও-
‘গলদা চিংড়ি তিংড়ি মিংড়ি লম্বা দাঁড়ার করতাল
পাকড়াশিদের কাঁকড়া-ডোবায় মাকড়সাদের হরতাল।
পয়লা ভাদর পাগলা বাঁদর লেজখানা যায় ছিঁড়ে
পালতে মাদার, সেরেস্তাদার কুটছে নতুন চিঁড়ে।
কলেজপাড়ায় শেয়াল তাড়ায় অন্ধকলুর গিন্নি
ফটকে ছোঁড়া চটকিয়ে খায় সত্যপীরের শিন্নি।…
সিরাজগঞ্জে বিরাট মিটিং তুলো বের করা বালিশ
বংশু ফকির ভাঙা চৌকির পায়াতে লাগায় পালিশ।’
(২ সংখ্যক ছড়া : ছড়া)
লোকছড়ার অন্তর্নিহিতভাব তার সরল-সহজ ছন্দরীতি রবীন্দ্রনাথকে দারুণভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদেয় এল বান’ এই লোকছড়াটি প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, ‘এই ছড়াটি বাল্যকালে আমার নিকট মোহমন্ত্রের মতো ছিল এবং সেই মোহ আমি এখনো ভুলিতে পারি নাই।’ তিনি যে লোকছড়ার প্রভাব প্রকৃতই ভুলতে পারেননি তার প্রমাণ পাওয়া যায় ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর’, ‘সাত ভাই চম্পা’, ‘শিশু’ ‘শিশু ভোলানাথ’ প্রভৃতি কবিতায়।
‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ কবিতাটির কিয়দংশ এখানে তুলে ধরা হলো-
‘বাদলা হাওয়ায় মনে পড়ে ছেলে বেলার গান
বিষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদেয় এল বান।…
কবে বিষ্টি পড়েছিল বান এল সে কোথা
শিব ঠাকুরের বিয়ে হলো কবেকার সে কথা।
সেদিনও কি এমনিতর মেঘের ঘটাখানা
থেকে থেকে বাজ-বিজুলি দিচ্ছিল কি হানা। …
কোন ছেলেরে ঘুম পাড়াতে কে গাহিল গান
বিষ্টি পড়ে টাপুর-টুপুর নদেয় এল বান।’
রবীন্দ্রনাথের ছড়ায় বাঙালি মানস বিচিত্র রূপে ফুটে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথ শিশু হৃদয়ে নিজেকে প্রতিস্থাপিত করে সেই চোখে দেখতে পেরেছিলেন বসুধাকে। এখানেই রবীন্দ্রনাথ অনন্য, অসাধারণ।
(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








