চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যে কারণে বছরের পর বছর শাকিবে মগ্ন বাংলা ছবির দর্শক

ঈদে মুক্তি পেয়েছে শাকিব অভিনীত ‘গলুই’ ও ‘বিদ্রোহী’

২৩ বছরের ক্যারিয়ার। রাজত্ব করছেন ১৫ বছর ধরে। লম্বা সময়ে সিনেমা ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের কাছে নায়ক মানেই তিনি! বছরের পর বছর পরীক্ষিত, মূলধারার সিনেমায় সবচেয়ে বেশি কাটতি তার!

বাংলা ছবির দর্শক মাত্রই এতোক্ষণে বুঝে নিয়েছেন, কার কথা বলা হচ্ছে। হ্যাঁ, ঢাকাই ছবির সুপারস্টার শাকিব খান!

Reneta June

দুই দশকের বেশি সময়ের বোঝাপড়ায় পরিচালক-প্রযোজকরা এখনও মনে করেন, শাকিব খানের নামেই সিনেমা চলে, তিনি মানে ছবি হিট! যা সিনেমার এই দুঃসময়ে আবারও প্রমাণ করেছেন তিনি। ঈদুল ফিতর উপলক্ষ্যে দেশের প্রায় ১৪০টির মতো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে এই তারকা অভিনেতার দুটি ছবি। একটি ‘গলুই’ এবং অন্যটি ‘বিদ্রোহী’। ‍রাজধানী শহরের আধুনিক সিনেপ্লেক্স থেকে শুরু করে মফস্বলের সিনেমা হলগুলোতেও তার টানে দর্শক সমাগম হচ্ছে। ঢাকা সহ দেশের বেশকিছু প্রেক্ষাগৃহে খোঁজ নিয়ে এমনটাই জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

লম্বা সময়ের ক্যারিয়ারে নানা উত্থান পতন দেখেছে ঢাকাই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি। যা ছুঁয়ে গেছে সিনেমার এই সুপারস্টারকেও। তবু সব সামলে তিনি আছেন বহাল তবিয়তে। দিন শেষে সিনেমা হলে তার নামে টিকেট কেটেই বিনোদিত হতে যায় হাজারও দর্শক। নতুন পুরনোদের ভিড়ে সিনেমা হলে এক চেটিয়া প্রভাব তার। কোন ম্যাজিকের বলে শাকিবে মগ্ন গ্রাম বাংলার দর্শক?

ঠিক এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছিল দেশের সুপরিচিত চলচ্চিত্র গবেষক, সমালোচক, শিক্ষক ও লেখক অনুপম হায়াতের কাছে। চ্যানেল আই অনলাইনের কাছে তিনি ব্যাখ্যা করলেন এভাবে, “কোনো ব্যক্তি যখন জনপ্রত্যাশার কাছাকাছি পৌঁছায়, তখন তিনি ‘সত্যিকারের জনপ্রিয় তারকা’ হয়ে ওঠেন। অভিনয়ের মাধ্যমে গণমানুষ তাকে দেখে বা ভোগ করে এবং নিজের আপন মনে করে। এককথায় শাকিব সত্যিকারের একজন তারকা।”

তিনি বলেন, সত্যিকারের তারকার ম্যানারিজম, চুল, পোশাক, হাঁটার স্টাইল থেকে সবকিছু দর্শক হৃদয়ে আলোড়ন তোলে। লাইফ স্টাইল এক্ষেত্রে বড় একটা কারণ। পর্দায় সেই তারকা যেভাবে হিরোয়িজম দেখায় দর্শক বাস্তব জীবনে নিজের মনে সেটা অনুভব করে; এমনকি তারকার মতো করে প্রেম নিবেদন করতে চায়। দর্শক সবকিছু জুড়ে তারকাকে নিয়ে বসবাস করতে থাকে। শাকিব ঠিক সেই মাপের তারকা বলে দর্শক তাতে মশগুল।

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক, ফললুল হক স্মৃতি পুরস্কার, শিল্পকলা পুরস্কারজয়ী অনুপম হায়াৎ উদাহরণ টানতে গিয়ে উল্লেখ করলেন মহানায়ক উত্তম কুমার ও নায়করাজ রাজ্জাকের কথা। বললেন, আমাদের যৌবনের নায়ক ছিলেন উত্তম কুমার ও রাজ্জাক। তাদেরকে আমরা অনুকরণ করতাম। ১৯৬৯ সালে রাজ্জাকের ‘নীল আকাশের নিচে’ সিনেমার ক্যারেকটারের সঙ্গে নিজেকে আইডেন্টিফাই করতাম। তার চরিত্রের মতো প্রত্যাশা করতাম। ঠিক একইভাবে শাকিব খানের সিনেমার ক্যারেকটারগুলোর সঙ্গে এখনকার তরুণ প্রজন্ম বা দর্শক নিজেদের আইডেন্টিফাই করে। তার প্রতি মানুষের আকর্ষণের আরেকটি কারণ এটি।

আগে এমন জনপ্রিয় নায়ক একাধিক থাকলেও শাকিব খানের মতো বাণিজ্যিকভাবে মূল্যবান নায়ক নেই বলে জানালেন অনুপম হায়াৎ। কেন নেই? তার উত্তর, “এখন তো সিনেমাই সেভাবে তৈরি হচ্ছে না। সিনেমা না হলে তারকা তৈরি হবে কীভাবে? তবে আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে একাধিক তারকা তৈরি হওয়া খুব দরকার। এতে কাজের প্রতিযোগিতা বাড়বে। বিনোদনের এখন বহুমুখী মাধ্যম তৈরি হয়েছে। ঘরে বসে হাতের মুঠোয় সবকিছু পাওয়া যাচ্ছে। এতো সহজলভ্য হলে সত্যিকারের তারকার মূল্য কোথায়?”

যোগ করে অনুপম হায়াৎ বলেন, ইউটিউবসহ আরও মাধ্যমে ভিডিও বানিয়ে তারকা হয়ে যাচ্ছে! যে কাজের জন্য তারকা বলা হচ্ছে, বিষয় বস্তুর চেয়ে খ্যাতির ভার হয়ে যাচ্ছে পাহাড়সম! তারকা হওয়ার যোগ্যতা তাদের আদেও আছে কিনা প্রশ্ন থেকে যায়! অথচ সিনেমা হচ্ছে বিনোদনের সবচেয়ে বাণিজ্য, এককালে রমরমা ছিল। তখন একে একে রাজ্জাক, আলমগীর, ফারুক পরবর্তীতে ইলিয়াস কাঞ্চন, মান্না, রিয়াজসহ অনেকেই ছিলেন। কিন্তু এখন একমাত্র আছেন শাকিব খান।

‘বর্তমানে সিনেমার বাণিজ্যের ঠিক পরিপূরক তারকা হচ্ছেন শাকিব খান। সিনেমার বাণিজ্য তাকে ছাড়া যেমন নির্মাতারা রিস্ক নিতে ভয় পান, তেমনি দর্শকরাও তাকে চান। বিনোদনের যে বহুমুখীতা সত্যিকারের জননন্দিত তারকা হয়ে ওঠা খুব কঠিন!’ বলছিলেন অনুপম হায়াত।

একই প্রশ্নে জাতীয় স্বীকৃতি প্রাপ্ত ও জীবন্ত কিংবদন্তী পরিচালক, চিত্রনাট্য ও কাহিনিকার কাজী হায়াত বলেন, হিংসা, ঈর্ষা সবকিছুর উর্দ্ধে শাকিব খান। তার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষানিত হয়ে অনেকে অনেকসময় তাকে নিয়ে কুৎসা রটায়। কিন্তু ও সবসময় সঠিক রাস্তায় চলেছে। আমার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অনেকগুলো সিনেমায় শাকিবের সঙ্গে অভিনয় করেছি। আমার পরিচালনায় ‘বীর’ নামে একটি সিনেমার নায়ক ও প্রযোজক শাকিব। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি সে সত্যিকার অর্থে একজন ভালো অভিনেতা, শিল্পী; জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকার যাবতীয় গুণ সে ধরে রেখেছে। এজন্য শাকিবকে দর্শক অপছন্দ করতে পারে না।

দেশের ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা সিনেমা হলের কর্ণধার, একসময়কার প্রযোজক ও সিনেমা হল মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি ইফতেখার নওশাদ বলেন, শাকিবের ছবির ক্রাউড আলাদা। অন্যরা সেই ক্রাউড সিনেমা হলে আনতে পারে না! শাকিব সিনেমার সবচেয়ে বড় ইনফ্লুয়েন্সার। তার ছবির জন্য দর্শক অপেক্ষা করে, তার জন্য রাস্তায় নেমে মিছিল করে; একজন নায়কের জন্য মানুষের এমন ভালোবাসা সবকিছুর উপরে। আমি এবার ঈদেও তার ছবি নিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে অনেক দেরীতে নক করা হয়েছিল। মধুমিতায় শাকিবের ছবির ব্যবসা খুব ভালো। বলা আছে খুব শিগগির তার ছবি চালাবো।

ঈদের দিন থেকে সারা দেশের প্রায় ১৪০টির মতো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে শাকিব অভিনীত দুটি ছবি। এরমধ্যে শতাধিক প্রেক্ষাগৃহে চলছে ‘বিদ্রোহী’। এই ছবির মাধ্যমে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা বেশকিছু সিনেমা হল পুনরায় চালু হয়েছে। মুক্তির পর থেকে সিনেমার হল রিপোর্টে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে ‘বিদ্রোহী’র প্রযোজনা সংস্থা শাপলা মিডিয়া। একই সঙ্গে ৩৪টির মতো প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেলেও বহুল আলোচিত শাকিব অভিনীত সরকারি অনুদানের ছবি ‘গলুই’ দারুণ ব্যবসা করছে। পাচ্ছে প্রশংসা। তারচেয়ে বড় কথা, ছবিটি গ্রাম বাংলার একেবারে নিজস্ব ঐতিহ্য, সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করে নির্মিত।