চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যুদ্ধাপরাধের বিচার, তুরিন আফরোজ এবং বেমালুম গুজব

বাঙালি জাতির জন্মদায় শোধের অভূতপূর্ব সুযোগ আসে যুদ্ধাপরাধের বিচারের মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর আমলে এ বিচারকাজ শুরু হলেও তার হত্যাকাণ্ডের পর তা থমকে যায় এবং হাজার হাজার অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধীকে পরবর্তী সামরিক ও সামরিক-সমর্থিত সরকারগুলো দায়মুক্তি দেয়। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধের বিচারের ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে। কিন্তু বিচারকাজের শুরু থেকে নানা অসঙ্গতি ও চক্রান্ত এই বিচারকাজকে বারবার থমকে দিতে চেয়েছিলো।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী গঠিত ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার প্রধান হিসেবে শুরুতেই নিয়োগ পান যুদ্ধাপরাধী চক্রের দোসর রাজনৈতিক পরিচয়যুক্ত এক ব্যক্তি। নানা বিতর্ক-বিসম্বাদের মধ্য দিয়ে তাকে হটানো হলেও ট্রাইব্যুনালকে কেন্দ্র করে অসঙ্গতি আর চক্রান্ত থেমে থাকেনি এক দিনের জন্যও। ট্রাইব্যুনালের প্রধান দায়িত্ব কার- এ নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আমরা বিতর্ক সংঘটিত হতে দেখেছি।  ট্রাইব্যুনালে নিযুক্ত প্রসিকিউটরদের দক্ষতা-যোগ্যতা-নিষ্ঠা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বারবার।  এমনকি কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর মামলা পরিচালনায় তাদের অদক্ষতার কথা তুলে ধরেছেন খোদ আদালত। এ কারণে চূড়ান্ত বিচারে সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। আরো একাধিক মামলায় অভিযোগপত্র উত্থাপন কিংবা তদন্ত সংস্থার নানা ঘাটতির কথাও খোদ আদালতের মুখ দিয়েই উচ্চারিত হয়েছে। এমনকি রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত হয়ে রাষ্ট্রের সুযোগ-সুবিধা-নিরাপত্তা গ্রহণ করে প্রসিকিউশনের কেউ কেউ যে বেমালুম দায়িত্বে অবহেলা ও অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে চলেছেন- এমন কথাও আদালত উল্লেখ করেছেন একাধিক মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে।

বিজ্ঞাপন

২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ট্রাইব্যুনালের প্রথম মামলার রায় ঘোষিত হয়। আবুল কালাম আজাদ ওরফে বাচ্চু রাজাকারের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয় ওই মামলায়। কিন্তু রায় প্রদানের দিন কয়েক আগেই রাষ্ট্রের ব্যর্থতায় আসামী পালিয়ে যায় দেশ ছেড়ে। এরপর দ্বিতীয় মামলার রায় আসে ‘মিরপুরের কসাই’ খ্যাত যুদ্ধাপরাধী ও জামাতে ইসলামীর নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে। তাকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ ঘোষণা করা হলে রাজধানীসহ সারাদেশে প্রচণ্ড বিক্ষোভ সংঘটিত হয়। মূলত তারুণ্যের ওই বিক্ষোভ গণজাগরণ মঞ্চ বা শাহবাগ আন্দোলন নামে সারা দুনিয়ায় আজ পরিচিতি পেয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ওই রায় ঘোষিত হওয়ার পর ট্রাইব্যুনালের দুর্বলতা কাটাতে ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে সোচ্চার থাকা তরুণ ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজকে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তিনি ওইদিনই প্রসিকিউশনে যোগদান করেন। এরই মধ্যে সাঈদীর মামলা রায়ের জন্য প্রস্তুত ছিলো এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। কিন্তু সর্বোচ্চ আদালত ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর দুর্বলতা ও অদক্ষতার কথা উল্লেখ করে সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডে নামিয়ে আনেন।

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে যোগদান করার পর চলতি বছরের ৮ মে পর্যন্ত রায় ঘোষিত মোট ২৯টি মামলার মধ্যে ২০টিরই আইনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের দায়িত্ব পান। এর মধ্যে গোলাম আজম, মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, আশরাফুজ্জামান খান ও চৌধুরী মঈনুদ্দিন, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, মীর কাশেম আলী, এটিএম আজহারুল ইসলাম, সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, আব্দুস সোবহান, আব্দুল আলীম, সৈয়দ মোহাম্মদ কায়সার এর মামলা উল্লেখযোগ্য।

এদের মধ্যে আদালতের ভাষায় ‘সর্বোচ্চ সাজা প্রদানের যোগ্য হলেও বয়স বিবেচনায়’ গোলাম আজমকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আব্দুল আলীমকে ‘শারীরিক অবস্থা বিবেচনায়’ আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বাকি উল্লেখযোগ্য আসামী তথা শীর্ষ সব যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতের রায়েও এসব মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয় এবং নিজামী, মুজাহিদ, সাকা চৌধুরী, কামারুজ্জামান, মীর কাশেমের মতো শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে বাংলাদেশ। তুরিন আফরোজ কর্তৃক আইনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপিত ২০টি মামলায় মোট ৪৬ জন আসামীর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত হয়েছে। এ পরিসংখ্যান বিবেচনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর হিসেবে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের দক্ষতা ও নিষ্ঠা প্রশ্নাতীত।

উপরন্তু প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমে যোগদানের পর থেকে সকল মামলায় তথ্য ও গবেষণার কাজে সহযোগিতা করে আসছেন এবং ২০১৪ সালের শুরু থেকেই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবেই এ কাজে নিযুক্ত আছেন। এছাড়া ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ সংক্রান্ত দায়িত্বও তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পালন করে আসছেন। এর বাইরেও তুরিন আফরোজ বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ বিচাররে স্বপক্ষে দেশের বিভিন্ন জেলায় বক্তৃতা-সেমিনার-জনসভা, দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে নিয়মিত লেখালেখি, সাক্ষাৎকার, আলোচনায় অংশগ্রহণ, অপরাপর বিভিন্ন দেশে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, ইউরোপীয় পার্লামেন্ট শুনানি, সুইডিশ পার্লামেন্ট শুনানি, ফরাসী পার্লামেন্ট শুনানি, আর্জেন্টিনা সেমিনার, হংকং সেমিনার, সিঙ্গাপুর সেমিনার, জার্মানি সেমিনার ইত্যাদি আন্তর্জাতিক ফোরামে বিশ্ব জনমত গঠনের কাজটি দক্ষতা ও যোগ্যতার সাথে করে আসছেন। দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেও তিনি যুদ্ধাপরাধের বিচার বিষয়ক নিয়মিত লেকচার প্রদান করে আসছেন।

এমতাবস্থায় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরদের মধ্যে অপেক্ষাকৃত ‘তরুণ’ ও ‘নারী’ প্রসিকিউটর হিসেবে ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের এ সাফল্য অন্যদের জন্য ঈর্ষার কারণ হয়েছে বৈকি। যদিও রাষ্ট্রীয় এতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার চেতনার প্রতি মানবীয় ও নাগরিক দায়বোধের কারণে এ জাতীয় ঈর্ষা স্রেফ অবাঞ্ছনীয় হলেও প্রসিকিউটরদের মধ্যে পারস্পরিক রেশারেশি ও হীন প্রতিযোগিতার মানসিকতা ইতোপূর্বে দফায় দফায় প্রকাশ ঘটেছে। এগুলো গণমাধ্যমের সংবাদের খোরাকও হয়েছে একাধিকবার। এ কারণেই তুরিন আফরোজের প্রতি অন্যদের, বিশেষ করে দক্ষতা প্রমাণে ব্যর্থ প্রসিকিউটরদের ঈর্ষার প্রকাশ সঙ্গত। আর তারও চেয়ে বড় নির্মম বিষয় হলো- তুরিন আফরোজ একজন নারী। এ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে নারী সমাসীন থাকলেও অন্য নারীদের সাফল্য এখনও এ সমাজে ঈর্ষণীয় এবং পুরুষতন্ত্রের চোখে অবাঞ্ছনীয়।

হঠাৎ করেই গত ৯ মে ‘দৈনিক আমাদের সময়’ পত্রিকায় ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজের সাথে এক অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী, প্রাক্তন এনএসআই প্রধান ওয়াহিদুল হকের সাথে সাক্ষাৎ, আর্থিক লেনদেন ও পারস্পরিক যোগসাজসের অভিযোগ সম্পর্কিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এরপর বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে কিছু নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হয়। এখানে একটি পুরনো ইতিহাস মনে করিয়ে দিতে চাই- ‘আমাদের সময়’ পত্রিকার মালিক নূর আলী বিতর্কিত ১/১১ এর সময় সেনা-সমর্থিত অসাংবিধানিক ও তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিতর্কিত মামলা দায়ের করে ওই সরকারের সুবিধাভোগী হয়েছিলেন।

পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদটি যে প্রসিকিউশনের ভিতর থেকে ‘বেমালুম সাপ্লাই’ করা তা ঘটনার পূর্বাপর বিশ্লেষণে রীতিমতো পরিষ্কার। অভিযুক্ত যুদ্ধাপরাধী মুহাম্মদ ওয়াহিদুল হক ইতোপূর্বেই গ্রেপ্তার। তার গ্রেপ্তারের নিমিত্তে ট্রাইব্যুনালে আবেদন এবং শুনানিও করেছেন ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ। ওই মামলা পরিচালনায় দায়িত্বেও ছিলেন তিনি এবং সঙ্গত কারণেই মামলার তদন্তকাজের স্বার্থে তুরিন আফরোজ অভিযুক্তের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন।

উল্লেখ্য, অভিযুক্ত ওয়াহিদুল হকের গ্রেফতারের পর উত্থাপিত অভিযোগ অনুসারে গত ৭ মে থেকে ওই মামলা এবং ৮ মে থেকে অন্যান্য সকল মামলা পরিচালনার দায়িত্ব থেকে তুরিন আফরোজকে প্রত্যাহার করেন চিফ প্রসিকিউটর মহোদয়। মজার বিষয় হলো, তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের মামলার একজন আসামীর সাথে এতো গুরুতর যোগসাজশের অভিযোগ থাকা সত্বেও আজ পর্যন্ত চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয় থেকে তলব, কোনো প্রকার ব্যাখ্যা দাবি বা কারণ দর্শানোর কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে কোনো প্রকার তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে কিনা তা নিয়েও ধোঁয়াশা বিদ্যমান। তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগটি নিঃসন্দেহে গুরুতর এবং তা সত্য হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্র, বাঙালি জাতি এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে বিশ্বাসঘাতকতার মতো অপরাধের কারণে তিনি সারা জাতির কাছে ঘৃণিত ও অভিশপ্ত হয়েই থাকবেন। কিন্তু এতো বড় অভিযোগের মুখে তার কাছ থেকে কোনো প্রকার জবাব চাওয়ার পরিবর্তে কেবলমাত্র গণমাধ্যমে তাকে নিয়ে কুৎসা রটনার ঘটনা সাধারণ মানুষের চোখে নিছক প্রসিকিউটরদের ভিতরকার সেই পুরনো পারস্পরিক ঈর্ষা আর রেশারেশির দিকটিই নির্দেশ করে। ট্রাইব্যুনালের অপরাপর এক বা একাধিক প্রসিকিউটরের অতি উৎসাহী প্রকাশ্য বক্তব্য এ বিষয়ে ‘বেমালুম গুজব’ সৃষ্টিতে আরো সহায়তা দিচ্ছে।

পরিষ্কারভাবেই মনে রাখা দরকার, যুদ্ধাপরাধের এ বিচারকাজ নিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জামাত-বিএনপি-স্বাধীনতাবিরোধী চক্রের শক্তিশালী লবি এবং তার ফলস্বরূপ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তার দোসর অন্যান্য আন্তর্জাতিক শক্তি, এমনকি খোদ জাতিসংঘ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বছরের পর বছর ধরে চাপের ভিতর রেখেছে। এ বিচারকাজকে বিতর্কিত করে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ইতিহাসের ইতিবাচক অগ্রগতির ধারার খোলনলচে পাল্টে দেবার চক্রান্ত থেমে নেই এক মুহূর্তের জন্যও। এ অবস্থায় ট্রাইব্যুনালের একজন প্রসিকিউটরকে উদ্দেশ্যমূলক প্রশ্নবিদ্ধ করে কার লাভ হাসিল করা হচ্ছে? তার বিরুদ্ধে সত্যিকারেই যদি অভিযোগের কোনো ভিত্তি থাকে তবে তা যথাযথ তদন্ত করা হোক, তাকে জবাবদিহির আওতায় আনা হোক। কিন্তু তা না করে যখন কেবলমাত্র মিডিয়াবাজি করে তাকে বিতর্কিত করাই একমাত্র কাজ হয়ে দাঁড়ায় তখন নিঃসন্দেহে প্রশ্ন তোলার অবকাশ থেকে যায়। মনে রাখা দরকার যে, তুরিন আফরোজ প্রসিকিউটর হিসেবে ২০টি মামলা পরিচালনা করে ৪৬ জন যুদ্ধাপরাধীর মৃত্যুদণ্ড আদায় করেছেন। এখন সামান্য বালখিল্যতা তাকে কেবল নয়, পুরো এই ২০টি মামলার রায়কেও প্রশ্নবিদ্ধ করবে। প্রসিকিউটরদের কারো কারো ব্যক্তিগত ঈর্ষার চেয়ে নিশ্চয়ই রাষ্ট্রীয় স্বার্থ অনেক বড়।এবার তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা যাক! উত্থাপিত অভিযোগ অনুসারে, তুরিন আফরোজ যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা ও পরবর্তীতে এনএসআই প্রধান ওয়াহিদুল হকের সাথে দেখা করেছেন, পৌনে তিন ঘণ্টা ধরে বৈঠক করেছেন, ২৫ কোটি টাকার লেনদেন করেছেন, মামলার গোপন নথিপত্র পাচার করেছেন এবং সর্বোপরি মামলার স্বার্থ-পরিপন্থী কাজ করেছেন। নিঃসন্দেহে অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ।

বিজ্ঞাপন

২৫ কোটি টাকার লেনদেনের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, প্রকাশিত পৌনে তিন ঘণ্টার অডিও রেকর্ডে তার ইঙ্গিতমাত্রও পাওয়া গেছে কি? এ প্রশ্নের কোনো উত্তর আজ পর্যন্ত অভিযোগকারী অন্যান্য প্রসিকিউটরদের তরফ থেকে পাওয়া গেলো না। ওই বৈঠকের পরবর্তীতেও যদি এ ধরনের কোনো লেনদেন যদি হয়ে থাকে, তদন্ত সাপেক্ষে তার প্রমাণপত্র জাতির সামনে হাজির করা হচ্ছে না কেন? অভিযোগ উত্থাপনের চার মাস তো পার হলো, ২৫ কোটি টাকার লেনদেনের প্রমাণ বের করতে দেশের সুদক্ষ গোয়েন্দা বাহিনীর এতো সময় লাগার কথা নয়। যেখানে সাবেক প্রধান বিচারপতির অবৈধ লেনদেনের তথ্যপ্রমাণ বের করা গেছে, সেখানে সেই তুলনায় সামান্য তুরিন আফরোজের এ লেনদেনের তথ্য বের করাও অসম্ভব ছিলো না। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ ধরনের কোনো প্রমাণপত্র পাওয়া গেলো না।

অভিযোগ হলো, একজন প্রসিকিউটর হওয়া সত্বেও তুরিন আফরোজ আসামীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। একটা ব্যাপার সম্পর্কে আগে স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার- ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনটি অন্য ফৌজদারি আইনের মতো নয়। এই আইন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ বিচার প্রক্রিয়ায় ফৌজদারী কার্যবিধি (সি.আর.পি.সি) এবং প্রথাগত সাক্ষ্য আইন প্রযোজ্য হয় না (ধারা ২৩)। এই আইনের প্রয়োগে জেল কোড প্রযোজ্য হয় না (কাদের মোল্লা আপিল ও রিভিউ কেস দ্রষ্টব্য)। এছাড়াও এই আইনের ১৯ ধারা অনুযায়ী অনেক কিছুকেই সাক্ষ্য-প্রমাণ হিসেবে গ্রহণ করার এখতিয়ার ট্রাইব্যুনালের রয়েছে যা অন্য ফৌজদারি মামলাতে সম্ভব নয়। এই আইনের অধীনে নিযুক্ত প্রসিকিউটরদের দায়িত্ব পালনের ধারাও অন্য যে কোনো রাষ্ট্রপক্ষের নিযুক্ত আইনজীবীদের মতো নয়।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ এর ৮(২) ধারায় সুপষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে- “Any person appointed as a Prosecutor is competent to act as an Investigation Officer and the provisions relating to investigation shall apply to such prosecutor”. অর্থাৎ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে যদি কাউকে প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় তবে তার একজন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করার দক্ষতা আছে বলেই ধরে নেয়া হবে এবং ওই আইনে তদন্ত করার ক্ষেত্রে যে প্রক্রিয়া বর্ণিত আছে সবই ওই প্রসিকিউটরের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, আলোচ্য আইন অনুযায়ী একজন প্রসিকিউটর একাধারে তদন্ত কর্মকর্তা ও আইনজীবী হিসেবে দ্বৈত ভূমিকা পালন করেন। উল্লেখ্য যে, ন্যুরেমবার্গ ট্রায়াল আইনের আর্টিকেল ১৪ এবং ১৫; টোকিও ট্রায়াল আইনের আর্টিকেল ৮; ICTY ট্রায়াল আইনের আর্টিকেল ১৬; ICTR ট্রায়াল আইনের আর্টিকেল ১৫ এবং ICC ট্রায়াল আইনের আর্টিকেল ৫৩ এবং ৫৪ অনুযায়ী প্রসিকিউটরগণই তদন্তের কাজ করে থাকেন।

আইন অনুযায়ীই প্রসিকিউটর কাম তদন্ত কর্মকর্তা ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ তার এক সহকারীকে সাথে নিয়ে গত বছরের ১৮ নভেম্বর গুলশানের অলিভ গার্ডেন রেস্টুরেন্টে ওয়াহিদুল হকের সাথে দেখা করেন। কেন গিয়েছিলেন তুরিন আফরোজ? জানা মতে, ওই সাক্ষাতে আসামী ওয়াহিদুল হকের সাথে ১৯৭১ সালের রংপুর ক্যান্টনমেন্টের ঘটনাবলি বিষয়ে কথাবার্তা হয়। আসামীও প্রসিকিউটরকে নানা চমকপ্রদ তথ্য প্রদান করেন। অর্থাৎ ওই সাক্ষাৎ ছিলো তুরিন আফরোজের পাতা ফাঁদ।

এখন প্রশ্ন হলো- একজন প্রসিকিউটর আইনগতভাবে তদন্ত পর্যায়ে আসামীর সাথে দেখা করতে পারেন কিনা! আইনের ৮(৪) ধারাতে উল্লেখ করা আছে- “Any Investigation Officer making an investigation under this Act may examine orally any person who appears to be acquainted with the facts and circumstances of the case.” অর্থাৎ একজন তদন্ত কর্মকর্তা (এক্ষেত্রে একজন প্রসিকিউটর) তার তদন্তকালীন সময়ে অপরাধ সংক্রান্ত ঘটনাবলির ব্যাপারে ওয়াকিবহাল যে কোনো ব্যক্তিকে মৌখিকভাবে কথা বলে ঘটনার সত্যতা যাচাই বাছাই করবার অধিকার রাখেন। অতএব এটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, প্রসিকিউটর তুরিন আফরোজ ওই সাক্ষাতে কোনোভাবেই আইন ভঙ্গ করেননি। বিশ্বাস রাখি, তুরিন আফরোজ কেবল ওয়াহিদুল হকের মামলার ক্ষেত্রেই নয়, ইতোপূর্বে অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও একই ধরনের কৌশল অবলম্বন করে থাকবেন, অন্যান্য প্রসিকিউটররাও হয়তো তদন্তের স্বার্থে এ ধরনের কোনো না কোনো কৌশল অবলম্বন করে থাকবেন। তাহলে এ ঘটনাটিকে এতো বিতর্কিত করা হচ্ছে কার স্বার্থে? তুরিন আফরোজ এ মামলার তদন্ত ও আইনী পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত হওয়ায় অন্য কারো কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয়নি তো! সন্দেহের অবকাশ তো থাকছেই।

আরেকটি অভিযোগ হলো- আলোচ্য ওই সাক্ষাতে তুরিন আফরোজ নাকি আসামী ওয়াহিদুল হককে মামলার গোপন নথিপত্র প্রদান করেছেন। জানা মতে, ওই সময় পর্যন্ত মামলাটির তদন্ত কাজ যেখানে শেষই হয়নি, তদন্ত রিপোর্টই যেখানে তৈরি হয়নি, মামলার কোনো কাগজই যেখানে প্রস্তুত হয়নি, সেখানে মামলার নথি তুরিন পেলেন কোথা থেকে? ফলে সঙ্গত কারণেই এ অভিযোগটিও ভিত্তিহীন বলে আমাদের মতো সাধারণেই কাছে প্রতীয়মান।

তুরিন আফরোজের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার দেখা যাচ্ছে যাকে, সেই প্রসিকিউটর এ্যাডভোকেট জেয়াদ আল মালুম ২০১১ সালে আরটিভি’র একটি টকশোতেও বলেছিলেন যে ট্রাইব্যুনাল আইনে প্রসিকিউটরদের তদন্তের সুযোগ আছে এবং তারা (প্রসিকিউটররা) সে সুযোগ নিচ্ছেন। ইউটিউবের এই লিঙ্কে গেলে পাঠক সেটি দেখতে পাবেন: https://www.youtube.com/watch?v=Hau8zfgDlIQ&feature=youtu.be তাহলে অন্যান্য প্রসিকিউটররা আইনের এ সুযোগ নিতে পারলে তুরিনের বেলায় ভিন্নতর হবে কেন?

এসব অভিযোগ যে ভিত্তিহীন এবং তুরিনের সুনাম ও দক্ষতায় ঈর্ষান্বিত হয়েই করা হচ্ছে তার আরো প্রমাণ আছে। ‘ভিতর থেকে সাপ্লাই করা’ এসব সংবাদ যেসব পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে তাদের ইতিহাসটাও যাচাই করে দেখা জরুরি। ইতোপূর্বে ‘আমাদের সময়’ পত্রিকার মালিক নূর আলীর কীর্তির কথা বলা হয়েছে। সম্প্রতি আরো একটা পত্রিকা তুরিনের চরিত্র হননে নেমেছে। গত ১৮ মে তারিখে ‘দ্য নিউ নেশন’ তার রিপোর্টার সাগর বিশ্বাস এর বাইলাইনে একটি খবর প্রকাশ করে (https://goo.gl/rfGFEQ)। ‘Allegations of daring corruption against Tureen in prosecution’ শিরোনামের ওই খবরটিও যে ডাহা মিথ্যার বেসাতি এবং ফরমায়েশি তা পাঠকমাত্রই বুঝবেন। খবরটিকে আরো ভিত্তিহীন করেছে খবরটির একটি সাব-হেডলাইন। সাব-হেডে লেখা ছিলো- “She is now safely in London” অর্থাৎ ‘তুরিন এখন নিরাপদে লন্ডনে অবস্থান করছেন’। অথচ ৮ মে দেশে ফেরার পর থেকে তুরিন এখন পর্যন্ত দেশেই আছেন, বিদেশে সফর করেননি।

গত ৩ সেপ্টেম্বর ‘দৈনিক মানবকণ্ঠ’-এ ‘গুজবে সাগর-বিশ্বাস’ শিরোনামের একটি লেখায় তুরিন আফরোজ নিজেই এ বিষয়ে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছেন। প্রমাণ হিসেবে তুরিন নিজের পাসপোর্টকে রেফারেন্স হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবারের পত্রিকাটির নাম ‘দ্য নিউ নেশন’। এর মালিক ব্যারিস্টার মঈনুল হোসেন ১/১১ এর সবচেয়ে সুবিধাভোগী ও কুশীলবদের অন্যতম, সে সময়কার তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচেয়ে প্রভাবশালী উপদেষ্টা! পত্রিকাটিতে প্রকাশিত আলোচ্য ওই প্রতিবেদনের রিপোর্টার সাগর বিশ্বাস।

জানা যাচ্ছে, আলোচ্য সাংবাদিক সাগর বিশ্বাসের সাথে পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের নিয়মিত যোগাযোগ ও মেলামেশা দীর্ঘদিনের। সম্প্রতি পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব তাহমিনা জানুজা এবং পাকিস্তানের তথ্য, সম্প্রচার ও জাতীয় ঐতিহ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব সাফকাত জলিলের সাথে এই সাগর বিশ্বাসের ঘনিষ্ঠ দুটো ছবি সামাজিক গণমাধ্যমেও ঘোরাফেরা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বেশকিছু সাংবাদিককে পাকিস্তান সরকারের বিশেষ আমন্ত্রণে ইসলামাবাদ-করাচী দৌঁড়ঝাঁপ করতে দেখা গেছে, এসব সফরের পুরোটাই নাকি পাকিস্তান সরকারের খরচে হয়। সরকারও নিশ্চয়ই এ বিষয়ে ওয়াকিবহাল। তা সত্ত্বেও সরকারি অনুদানপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের তালিকায় শুরুর দিকেই নাম থাকে এই সাগর বিশ্বাসদের। এদের কাজ ‘বেমালুম গুজব’ প্রচার করা। এতে যুদ্ধাপরাধের বিচার যতোই ক্ষতিগ্রস্ত হোক না কেন তাদের কিংবা তাদের মালিকদের কিছু আসে যায় না। বিপদগ্রস্ত হয় শেখ হাসিনার সরকার, বিপদগ্রস্ত হয় বাংলাদেশ। এরপরও কি এসবের কোনো প্রতিকার নেই?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View