চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

যুক্তরাষ্ট্রে বঙ্গবন্ধুর আরেক খুনি রাশেদ চৌধুরীর সম্পদের পাহাড়

বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পলাতক আসামি মেজর (বরখাস্ত) এ এম রাশেদ চৌধুরী যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।

সে দেশে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকা রাশেদ চৌধুরী বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের রাজধানী সেক্রামেন্টো থেকে প্রায় ১১০ কিলোমিটার দূরের শহর কনকর্ডের হ্যাকলবেরি ড্রাইভে বসবাস করছেন।

বিজ্ঞাপন

বারবার স্থান বদল করে ২০১৫ সাল থেকে তিনি কনকর্ডে বসবাস করছেন। এর আগে ক্যালিফোর্নিয়া, কলোরাডো, ইলিনয় এবং মিসৌরিসহ বেশ কয়েকটি জায়গায় বসবাস করেছেন।

বিজ্ঞাপন

ক্যালিফোর্নিয়ায় দুটি বাড়ির মালিক রাশেদ চৌধুরী। যার একটি কনকর্ডে এবং অন্যটি সেক্রামেন্টোতে। ২০১৫ সালে কনকর্ডে প্রায় চার লাখ ষাট হাজার ডলার দিয়ে কেনা বাড়িটির বর্তমান মূল্য প্রায় পাঁচ কোটি দশ লাখ টাকা।

কনকর্ডের বাড়ি কেনার সময় বাড়ির অংশীদার হিসেবে রাশেদ চৌধুরীর স্ত্রী মমতাজ চৌধুরী ও তার বড় ছেলে রূপম চৌধুরীকে দেখানো হয়। এছাড়াও ২০১০ সালে সেক্রামেন্টোতে প্রায় এক লাখ ৮ হাজার ডলার দিয়ে কেনা বাড়িটির বর্তমান মূল্য প্রায় দুই কোটি ৩০ লাখ টাকা।

রাশেদ চৌধুরীর দুই ছেলে রূপম জে চৌধুরী এবং সুনাম এম চৌধুরী। তার দুই পুত্রও তাদের পরিবার নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকেন।

রাশেদ চৌধুরী’র বড় ছেলে রূপম চৌধুরী ক্যালিফোর্নিয়ার ওয়ালনাট ক্রিকে থাকেন। তার স্ত্রী কাজল এন ইসলাম এবং তাদের দুই সন্তানকে (একটি মেয়ে এবং একটি ছেলে) নিয়ে সেখানে বসবাস করছেন।

ওয়ালনাট ক্রিকে ২০১৬ সালে তিনি প্রায় দশ লাখ ৪০ হাজার ডলারে বাড়িটি কিনেন। যার বর্তমান মূল্য প্রায় ১১ কোটি চার লাখ টাকা।

রূপম বিপণন পরিচালক হিসেবে হিসাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাল্টিন্যাশনাল গণমাধ্যম করপোরেশন এওএল-তে কাজ করছেন। তিনি ২০১২ সালের অক্টোবরে এই সান ফ্রান্সিসকো ভিত্তিক সংস্থায় যোগদান করেন। এওএল-এ যোগদানের আগে তিনি ইয়ং অ্যান্ড রুবিকামে কাজ করতেন।

রাশেদ চৌধুরীর বড় ছেলে রূপম চৌধুরী

রূপম ১৯৯৯ সালে মিশিগানের আলবিয়ন কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্শাল স্কুল অফ বিজনেসেও পড়াশুনা করেন।

রূপম চৌধুরী কাজল এন ইসলামকে বিয়ে করেছেন। কাজল ওকল্যান্ড উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। এরআগে, তিনি সান ফ্রান্সিসকো ভিত্তিক রিয়েল স্টেট ইনভেস্টমেন্ট গ্রুপ রিয়েলটিশেয়ার্সে লিড ট্রানজেকশন কো-অর্ডিনেটর হিসাবে কাজ করতেন।

কাজল এন ইসলাম ক্যালিফোর্নিয়া ওয়ালনাট ক্রিকের নর্থগেট উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। সেন্ট্রাল ফ্লোরিডা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিনান্সে স্নাতক ডিগ্রি এবং ২০০৫ সালে লস অ্যাঞ্জেলেসের লয়োলা ল স্কুল থেকে আইনের ওপর ডিগ্রি অর্জন করেন।

রূপম চৌধুরীর স্ত্রী কাজল এন ইসলাম

চৌধুরীর ছোট ছেলের সুনাম চৌধুরী রাশেদ। বর্তমানে ক্যালিফোর্নিয়ার এলক গ্রোভের ওয়াইল্ড অর্কিড ওয়েতে বসবাস করেন। প্রজেক্ট কন্ট্রোল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে গোল্ডেন স্টেট ইউটিলিটি সংস্থায় কাজ করছেন তিনি। ২০০৪ সালে স্যান হোজে স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল এবং এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন।

২০১৩ সালের এপ্রিলে সুনাম ক্যালিফোর্নিয়ার ডেভিস থেকে মদ্যপান করে গাড়ি চালাতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন সুনাম চৌধুরী। তিনি মিরান্ডা ট্রেলেভেনকে বিয়ে করেন। মিরান্ডা ক্যালিফোর্নিয়ার ভ্যাকাভিলে অঞ্চলে বড় হয়েছেন। সুনাম ও মিরান্ডার বিয়ের অনুষ্ঠানে রাশেদ চৌধুরী ও তার আত্মীয়রা উপস্থিত ছিলেন।

বিজ্ঞাপন

রাশেদ চৌধুরীর ছোট ছেলে সুনাম চৌধুরী

পঁচাত্তরে পরিবারে জাতির পিতাকে হত্যার পর ১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় রাশেদ চৌধুরী জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেটে দ্বিতীয় সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। পরে তিনি কেনিয়া, মালয়েশিয়া, জাপান ও ব্রাজিলে বাংলাদেশ দূতাবাসে কাজ করেন।

আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ১৯৯৬ সালের জুলাইয়ে বঙ্গবন্ধুর এ খুনিকে চাকরি থেকে অব্যহতি দিয়ে দেশে ফেরার নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি দেশে না ফিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সানফ্রান্সিসকো চলে যান।

রাশেদ চৌধুরীকে ফিরিয়ে দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বারবার আবেদন জানিয়েছে বাংলাদেশ। সর্বশেষ ২০১৯ সালের ৫ নভেম্বর এই বিচারের কাগজপত্র চায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

স্ত্রী মিরান্ডা ও সন্তানের সঙ্গে সুনাম চৌধুরী

ওইদিন সন্ধ্যায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ঢাকা সফররত যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী এলিস ওয়েলসের সঙ্গে এক বৈঠকের পর এমন তথ্য জানিয়েছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেন। কিন্তু এখনও তাতে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সুদীর্ঘ বছর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বারবার বিচারে বাধা দেওয়া হয়েছে। এমনকি  ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে আইনগতভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল বিএনপি সরকার। এমনকি  আত্মস্বীকৃত এই ১২ খুনিকে বিদেশে বাংলাদেশের বিভিন্ন মিশনে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসন করে দলটি।

দুই ছেলের সঙ্গে রাশেদ চৌধুরী ও তার স্ত্রী মমতাজ চৌধুরী

১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর ১২ নভেম্বর ইনডেমনিটি আইন বাতিল করে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার করার পথ সুগম করে। তারপর বিচারের আয়োজন করা হয়। ২০০৯ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে দণ্ডিত আসামিদের বিরুদ্ধে রেডএলার্ট জারি করে বাংলাদেশের পুলিশ।

নানান আইনি প্রক্রিয়াশেষে ২০১০ সালের ২৭ জানুয়ারিতে পাঁচজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

যেসব খুনির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে তারা হল, সাবেক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফারুক রহমান, মহিউদ্দিন আহমেদ (আর্টিলারি), শাহরিয়ার রশিদ খান এবং একেএম মহিউদ্দিন আহম্মেদ (ল্যান্সার) ও সাবেক মেজর বজলুল হুদা।

ঢাকা ও ব্যাংককের মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তি স্বাক্ষরের পর বজলুল হুদাকে থাইল্যান্ড থেকে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে বন্দি বিনিময় চুক্তি না থাকলেও সেনাসমর্থিত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বরখাস্তকৃত লেফটেন্যান্ট কর্নেল একেএম মহিউদ্দিন আহমেদকে যুক্তরাষ্ট্র ফিরিয়ে দেয়।

নাতি নাতনি ও পুত্রবধূদের সঙ্গে রাশেদ চৌধুরী

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি হলেন ক্যাপ্টেন আব্দুল মাজেদ। তিনি দীর্ঘদিন বিদেশে পালিয়ে ছিলেন। গত সোমবার রাত সাড়ে তিনটায় রাজধানীর মিরপুরের পল্লবী থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন চ্যানেল আই অনলাইনকে নিশ্চিত করেন।

পলাতক অন্য পাঁচ খুনি হলেন; আব্দুর রশিদ, শরিফুল হক ডালিম, এম রাশেদ চৌধুরী, এসএইচএমবি নূর চৌধুরী ও রিসালদার মোসলেম উদ্দিন। এদের মধ্যে কানাডায় নূর চৌধুরী, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ে রাশেদ চৌধুরী। মোসলেম উদ্দিন জার্মানিতে ও শরিফুল হক ডালিম স্পেনে আছে। তবে খন্দকার আবদুর রশিদ কোন দেশে অবস্থান করছেন তার সঠিক তথ্য পুলিশের কাছে নেই।

দণ্ডিত আরেক খুনি আবদুল আজিজ পাশা পলাতক অবস্থায় জিম্বাবুয়েতে ২০০১ সালের ২ জুন মারা যান।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক দল ক্ষমতালোভী সেনা কর্মকর্তার হাতে সপরিবারে হত্যার শিকার হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সে সময় তার দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় বেঁচে যান।