চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ম্যারাডোনাকে বাংলাদেশে আনার পরিকল্পনা শুধু কল্পনাতেই রয়ে যাবে’

তিনি ম্যারাডোনা নন, তিনি একজন রাজা। যিনি কোটি কোটি মানুষের মনে গেঁথে আছেন আবেগ আর ভালোবাসা নিয়ে।

ফুটবলের এমন এক রাজা মাত্র ৬০ বছরেই বিদায় নিবেন-তা কি কেউ ভেবেছে! তার মৃত্যুর খবরটি যেমন আমার কাছে বড় দাগ কেটেছে, তেমনি বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবল প্রেমীকে করেছে হতভম্ব।

বিজ্ঞাপন

আমি মনে করি ডিয়েগো ম্যারাডোনার মতো কেউ কখনো আসেননি। কখনো আসবেন, সে আশা করাটাও হয়ত ভুল। যুগে যুগেই অসংখ্য ফুটবলার এসেছেন যাদের প্রতিভার ঝলক ছিল। তবে ম্যারাডোনার মতো ঝলক কেউ দেখায়নি। প্রকৃতি তাকে দেওয়ার সময় অকৃপণ হাতেই দিয়েছে।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই আর্জেন্টাইন খেলোয়াড় বিশ্বের ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। যুগে যুগে তার ক্রীড়ানৈপুণ্য ভবিষ্যৎ ফুটবল খেলোয়াড়দের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে বলে আমার বিশ্বাস।

মাত্র ৬০ বছর বয়সে ম্যারাডোনার মৃত্যু মেনে নিতে সত্যিই কষ্ট হচ্ছে। অনন্য জাদুকর ম্যারাডোনা বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেলেন। তার চলে যাওয়ায় একটা শূন্যতা রেখে গেছেন, যেটা কখনো পূরণ করা যাবে না।

আমাকে যদি প্রশ্ন করা হয় ম্যারাডোনা থেকে বাংলাদেশ কী পেয়েছে? আমি বলব ফুটবল মানেই এ দেশের মানুষ এক সময় চিনতেন ম্যারাডোনাকে। আর তাইতো যখন বিশ্ব আসর জমে ফুটবলের, তখন গোটা দেশেই এক টুকরো আর্জেন্টিনা ফুটে উঠে আসে আমাদের মাঝে।

ফুটবল সম্রাট পেলের খেলা টেলিভিশনে সরাসরি দেখার সৌভাগ্য এ দেশের ক’জন মানুষের হয়েছে আমার জানা নেই। ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০’র পেলে ব্রাজিলের হয়ে যে তিনবার বিশ্বকাপ জিতেছেন, বাংলাদেশের ক’জন মানুষেরই বা তা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে?

সেদিক থেকে ফুটবলের কোনো মহানায়কের খেলা সরাসরি টেলিভিশনে দেখার অভিজ্ঞতা এ দেশের মানুষের হয়েছে ম্যারাডোনাকে দিয়েই। ফুটবলের প্রতি গভীর ভালোবাসাটা সেখান থেকেই আসার কথা।
তবে সেই ফুটবলের প্রেমের বীজ তো আর এমনিতেই রোপন হয়নি। ম্যারাডোনার অন্য গ্রহের শিল্পিত ফুটবল শৈলী তো ছিলই। এর সঙ্গে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে আরও কিছু বিষয়।

ম্যারাডোনা ফুটবল অঙ্গনে নিজেকে বৈশ্বিক তারকা হিসেবে তুলে ধরতে পেরেছেন মূলত ১৯৮৬ বিশ্বকাপে। জাদুকরী ফুটবলের মায়ায় সেবার তিনি ফুটবল বিশ্বকে করেছিলেন মন্ত্রমুগ্ধ।

ফুটবলের সঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের বসবাস সেই অনাদিকাল থেকে। কিন্তু ছিয়াশি বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার মনোমুগ্ধকর ফুটবলের অন্য একটা গুরুত্ব আছে এ দেশের মানুষের কাছে। সেবারই প্রথম বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বকাপ দেখে রঙিন টেলিভিশনে।

একজন ফুটবলার কীভাবে একা কোনো দলকে বিশ্বকাপের মতো একটি বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে টেনে নিতে পারেন, সেই উদাহরণও তো প্রথম ম্যারাডোনাকে দিয়েই দেখেছে ফুটবল বিশ্ব।

বিজ্ঞাপন

বাতিস্তা, দানিয়েল পাসারেলা, লুইস বুরোচাগা, ভালদানোর মতো খেলোয়াড়ও আর্জেন্টিনার ছিয়াশি বিশ্বকাপ দলে ছিলেন। কিন্তুু এটা তো সবারই জানা আর্জেন্টিনা সেবার বিশ্বকাপ জিতেছিল ম্যারাডোনা নামের অতিমানবীয় এক ফুটবলারের নৈপুণ্যে!

সেই বিশ্বকাপে ম্যারাডোনাকে নিয়ে কত স্মৃতিই না ভেসে ওঠে মানুষের মনে। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালের ম্যাচটিই ধরুন। এ ম্যাচ নিয়ে আলোচনার শেষ কি কখনো হয়েছে!

ম্যারাডোনার জোড়া গোলে ম্যাচটি ২-১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচে একই সঙ্গে নায়ক এবং খলনায়ক ম্যারাডোনা। খলনায়ক ৫১ মিনিটে করা প্রথম গোলটির কারণে। যদিও তিনি খলনায়ক শুধু ইংলিশদের কাছে।

গোলটি যে ম্যারাডোনা করেছিলেন হাত দিয়ে! হেডের জন্য লাফিয়ে উঠেছিলেন। কিন্তু মাথা দিয়ে বলের নাগাল পাননি। রেফারিকে আড়াল করে নিজের বাঁ হাত দিয়ে বলটি ঠেলে দেন ইংল্যান্ডের গোলকিপার পিটার শিলটনের জালে।

ম্যারাডোনার এই গোলটি কখনোই মেনে নিতে পারেননি শিলটন বা ইংল্যান্ডের কেউ। তবে ম্যারাডোনা নিজে এই গোলের নাম দিয়েছিলেন ‘ঈশ্বরের হাতের গোল’! বিতর্কিত এই গোলটির কথা বাদ দিন।

৪ মিনিট পর ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের মাঝমাঠ আর রক্ষণের প্রায় সব খেলোয়াড়কে কাটিয়ে যে গোলটি করেছিলেন সেটিকে বিশ্বকাপের ইতিহাসেরই সেরা গোল মানেন অনেকে। গোলটির পর ইংলিশ ধারাভাষ্য বেরি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘আপনাকে স্কীকার করতেই হবে যে এটি জাদুকরী।’

জাদুকরী সেই ম্যারাডোনা পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে ফাইনালেও খেলেছেন অসাধারণ ফুটবল। আর সবশেষে বিশ্বকাপ জয়ের পর তার ট্রফি উঁচিয়ে ধরার দৃশ্যটিও ছিল মোহনীয়। যে দৃশ্য এখনো চোখে লেগে আছে বিশ্বজোড়া ফুটবলপ্রেমীদের।

ম্যারাডোনাকে আমি একজন দক্ষ সংগঠকও বলব। কারণ হচ্ছে-তিনি যে টিমেই হাতে দিয়েছেন বা যে ক্লাবেরই নেতৃত্ব দিয়েছেন- সেই টিম বা ক্লাব হয়ে উঠেছে সেরাদের সেরা। এটি সম্ভব হয়েছে তাঁর দক্ষ নেতৃত্বের কারণে।

বাংলাদেশের মানুষ আজ যেমন ফুটবলের এই কিংবদন্তীকে হারিয়ে হতবাক, তেমনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও শোকাহত।

আপনারা জানেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতিতে এই মুজিব বর্ষে ফুটবল নিয়ে আমাদের অনেক বড় বড় পরিকল্পনা ছিল। কথা হচ্ছিল ম্যারাডোনাকেও অ্যাম্বাসেডর হিসেবে বাংলাদেশে নিয়ে আসার। আজ থেকে সেই পরিকল্পনা শুধু কল্পনাতেই রয়ে যাবে। আমি প্রত্যাশা করব ম্যারাডোনার অনুপ্রেরণা নিয়ে বিশ্বমাঝে ফুটবল টিকে থাকুক যুগে যুগে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)