চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মৃত্যুর কষ্টতো কষ্টই, তা হোক একজন বা পঞ্চাশ জন

ঢাকার কামরাঙ্গীচরে সালেহা দুই সন্তান ও স্বামী নিয়ে থাকতো। স্বামী রিকশা চালক আর সে বাসা বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাত। গত ৩ বছর আগে এক দালালের খপ্পরে পড়ে সৌদি আরব গিয়ে বড়লোক হবার স্বপ্ন দেখে। তাকে কোনভাবেই বুঝাতে পারছে না পরিচিতজনরা সেখানকার পরিস্থিতি। সে দেশে কাজ করে যে টাকা পায় তার বেশি ওখানে পাবে না এ কথাটা বুঝতে তার অনেক কিছু হারাতে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে যে বাসাতে সে কাজ করত তাদের কাছে সালেহা ছিল পরিবারের সদস্যের মত। তারাও নানাভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয় সালেহার বিদেশ যাওয়াকে আটকাতে।

সে বিদেশ যাবার আগে ১০/১৫ দিন আরবি ভাষা আর কাজের ট্রেনিং করতে যায় মিরপুর। লেখা পড়া না জানা মেয়েটি এত অল্প সময়ে ভাষা শিখবে এটা সত্যি অবাক বিষয়। আসলে কিছু জিনিসের নাম আর রান্নাঘরের কাটাকাটি শেখায়। প্রকৃতপক্ষে এসব বিদেশে গিয়ে তেমন কাজে আসে না। যা পরে সালেহা বলে।

বিজ্ঞাপন

যেখানে বলা হয় মেয়েরা বিনা খরচে সরকারি ভাবে সৌদি আরব যায়, সেখানে সালেহা নিজের সব সহায় সম্বল বেঁচে দিয়ে আর ধার করে ২ লাখ টাকা দালালকে দেয়। আজ যাচ্ছে কাল যাচ্ছে করে ১ বছর পর তার যাবার দিন আসে। কিন্তু সালেহার কাছে দালাল টিকেট ভিসা কিছু দেয়নি। বলা হয়, এয়ারপোর্টে তাদের লোক থাকবে চিন্তা নাই। সেখানে সব বুঝিয়ে দিবে।মেয়েটা কোথায় যাচ্ছে কি হচ্ছে এসব চিন্তা করে দালালকে ভিসার কপি দিতে চাপ দিলে, সে যা দেখায় তা হতবাক করার মত। ফ্লাইটের দিন সকাল বেলা জানা যায় সালেহা যাচ্ছে টুরিস্ট ভিসায়। যার মেয়াদ আছে মাত্র ৭ দিন। সালেহাকে বলা হয় এ ভিসাতে গেলেও সৌদিআরব যাবার পর বাকি ব্যবস্থা হবে। যারা সালেহাকে নিয়ে চিন্তিত তারা বুঝতে পারছে মেয়েটা ভুল করছে।কিন্তু সব যুক্তিকে উপেক্ষা করে সালেহা চলে যায় অন্তত ২ লাখ টাকা আয়ের আশায়। তারপর ৬ মাস মেয়েটি কোথায় ছিল তা জানা সম্ভব হয়নি। সে দালালকে আর ফোনে পাওয়া যায়নি। একদিন আচমকা একটা কল পেয়ে তার স্বামী জানতে পারে সালেহা যেখানে আছে ভাল নেই। সে চলে আসতে যায়। কিন্ত তার পাসপোর্ট তার কাছে নেই। বারবার বলতে থাকে সে এসে ভুল করেছে। অনেক ভোগান্তি শেষ কোনভাবে সালেহা ফিরে আসে অনেকটা শুন্য হাতে জীবন বাঁচিয়ে।

সালেহার বিদেশে গিয়ে বড়লোক হবার স্বপ্নটা অধরা রয়ে গেল। সালেহার মত অনেক নিম্নবিত্ত নারীরা একটু ভালো থাকার আশায় গৃহকর্মী হিসাবে যাচ্ছে সৌদিতে। আর তাদের কেউ ফিরছে নির্যাতিত হয়ে আবার কেউ লাশ হয়ে।

কিন্তু নারীদের এমন ঘটনা নিয়ে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তি বেফাঁস কথা জনগণের বিবেবকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বিগত সময়ে ভিন্ন সরকারের আমলে মৃত্যু নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল্য ভাবে কথা বলেছে বেশ কজন মন্ত্রী। আর সে পথেই হাঁটলেন বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন, তিনি বলেছেন ” বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ৬ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে ২ লাখ ২০ হাজার কর্মরত আছেন সৌদিতে। এর মধ্যে মাত্র ৮ হাজারের ফিরে আসা এবং তাদের মধ্যে ৫৩ জন সেদেশে মারা যাওয়ার ঘটনা সংখ্যার হিসেবে বড় কিছু নয়।”

মন্ত্রী মহোদয় হয়তো স্বজন হারানোর বেদনাকে উপলব্ধি করতে পারেনি বলে ৫০ জন মৃত্যুকে সংখ্যা দিয়ে আনুপাতিক হারে বিশ্লেষণ করেছেন। মানবিকতা আর বিবেকবোধকে বির্সজন দিয়ে দেশের উন্নয়নের কথা বলা বাতুলতা মাত্র। এক একটি লাশ এক একটি পরিবারের জন্য কতটা আপনজন, তা এক মুহুর্তের জন্য অনুভব করলে এ নারীদের গণিমতের মাল মনে করতেন না তিনি। সেক্ষেত্রে ৫০টি লাশকে নগন্য ভাবতে বিবেক বাধা দিতো।

বিজ্ঞাপন

যেখানে বিশ্বের অন্যান্য দেশ সৌদিতে নারী শ্রমিক পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছে সেখানে তিনি অবলীলায় কিছু মন গড়া ব্যাখ্যা দিয়ে আরও বলেন, “৮ হাজার নারী ফিরে এসেছেন যা খুবই নগণ্য। নারীরা দূতাবাসের শেল্টারহোমে অভিযোগ না করে দেশে এসে অত্যাচারের কথা বলেন। যদি সংখ্যা দেখেন তাহলে খুবই ছোট একটা সংখ্যা। ৯৯ শতাংশ নারী ম্যানেজ করে নিয়েছেন, দেশে তারাও টাকা পাঠাচ্ছেন।”

“নারীরা ম্যানেজ” করে নিয়েছে এ শব্দটি দিয়ে তিনি নতুন একটি প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে। দেশের মানুষের জানামতে পরারাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন দীর্ঘ দিন ধরে আমেরিকারতে বাস করে নিজের মেধা ও মননশীলতার স্বাক্ষর রেখেছেন নানাভাবে। আর তার সে মেধা প্রজ্ঞা দিয়ে দেশের উন্নয়নে নতুন বিষয় যোগ হবে এমনটাই প্রত্যাশা দেশের মানুষের ও সরকারের ।

পুরুষদের সাথে নারীদের অংশগ্রহণে দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে প্রতিটি সেক্টরে দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়া অত্যাবশক। সেক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশে নার্সিং, আইটি, হোটেল ম্যানেজমেন্ট ইত্যাদি পেশাতে নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে পাঠানোর পদক্ষেপ না থাকাটা দুঃখজনক। এ ক্ষেত্রগুলোকে কাজে লাগিয়ে উন্নত বিশ্বে নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করলে দেশের রেমিট্যান্স বৃদ্ধি পাবে উল্লেখযোগ্যভাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তা না করে বির্তকিত দেশে নারীদের পাঠিয়ে বিপন্ন করা হচ্ছে তাদের জীবন।।

অক্ষরজ্ঞানহীন নারীদের নামমাত্র প্রশিক্ষণের কথা কাগজে কলমে বলা হয়ে থাকা সৌদি আরব পাঠানো গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে। এ অবস্থায় ভাষাগত বা ভিন্ন কারনে গৃহকর্মী হিসাবে নারীদের জীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়ার দায়ভারকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই সরকারের দায়িত্বশীল মন্ত্রণালয় ও ব্যক্তিদের।

নারী শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানো বন্ধের প্রতিবাদের বিপক্ষে নানা কারণ দেখানো হচ্ছে দেশের স্বার্থে।

কিন্তু সব কিছুর উর্ধ্বে মানবতা। যেখানে নিজের ভোগবিলাসিতা বা যৌনভোগের কারণে নারীকে পণ্য হিসাবে ব্যবহার করে সেখানে নিজের দেশের নারীকে হেয় করা অনুচিত। একজন নারী মৃত্যু বা নির্যাতনের খবরে কেবল একটি পরিবার নয় বরং লজ্জিত হয় সারাদেশ এ কথাটি কারো ভুলে গেলে চলবে না।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

Bellow Post-Green View