চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি

২০২০ সালে ৮ নভেম্বরের অনুষ্ঠিতব্য মিয়ানমারের নির্বাচনে (অনেক বিশেষজ্ঞ এটাকে মিয়ানমারের মুক্ত নির্বাচন হিসেবে অবহিত করেন) অং সান সূচির রাজনৈতিক দল এনএলডি সংসদের ৪৭৬টা আসনের মধ্যে ৩৯৬টা আসনে জয়ী হয়। অপরদিকে, সেনাসমর্থিত দল ইউনিয়ন সলিডারিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি শুধুমাত্র ৩৩টি আসনে জয় লাভ করে। এই নির্বাচনের সামরিক বাহিনী সমর্থিত দলের ভরাডুবির পর দেশটির সামরিক বাহিনী কারচুপির অভিযোগ তোলে। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইয়ের নেতৃত্বে সামরিক অভ্যূথানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে। মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন দলের প্রধান অং সান সুচি, রাষ্ট্রপতি উইন মিন্ট এবং সূচির রাজনৈতিক দল এনএলডির অনেক নেতাকে গ্রেপ্তার করে। এই ঘটনায় বর্তমানে মায়ানমারের রাজনৈতিক সংকট চলমান রয়েছে।

মিয়ানমারের সাথে ৫টি দেশের সীমান্ত রয়েছে। দেশগুলো হলঃ বাংলাদেশ, ভারত, চীন , লাউস এবং থাইল্যান্ড। মিয়ানমারের আন্তঃ রাজনৈতিক সংকটের কারণে এই সীমান্ত অঞ্চলগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি খুবই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিকভাবে চীনের সাথে মিয়ানমারের শক্তিশালী কূটনৈতিক ব্যবস্থার কারণে চীনের প্রতি এই সংকটের প্রভাব না পরলেও পার্শ্ববর্তী দেশ বিশেষত বাংলাদেশ, ভারত এবং থাইল্যান্ডের সীমান্ত নিরাপত্তার জন্য বিষয়টি উদ্বেগজনক। বর্তমান মিয়ানমারের রাজনৈতিক সংকট সীমান্ত নিরাপত্তা ,উগ্র-সন্ত্রাসবাদের তৎপরতা, শরণার্থী সমস্যার সমাধান এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

১৯৪৮ সালে গণতান্ত্রিক চেতনার মূল্যবোধ নিয়ে মিয়ানমার রাষ্ট্র ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও গত প্রায় ৭৩ বছরে মিয়ানমারের শাসনবাবস্থায় ছিল সামরিক ও একনায়কতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার আধিপত্য। ১৯৬২ সালে জেনারেল নে উইন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উনু’র সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে মিয়ানমারের ফেডারেল ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে ‘নিজস্ব ঘরানার সমাজতন্ত্র’ চালু করেন। তাছাড়াও তিনি অর্থনীতিকে জাতীয়করণ ও সোশ্যালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি নামে একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েম করেন এবং দেশটিতে স্বাধীন সংবাদমাধ্যমও নিষিদ্ধ করেন। ১৯৬২ সালে সেনা অভভুথানের মাধ্যমে দেশের শাসন ভার সেনাবাহিনীর দখলে চলে যায়। ১৯৬২ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত মাঝে মাঝে মিয়ানমার গনতন্ত্রের স্বাদ পেলেও সেটা ছিল সেনাবাহিনীর ক্ষমতার মোড়কে আবৃত ছায়া গণতন্ত্র। এই সামরিকতন্ত্রের যাঁতাকলে এবং মিয়নামারের সামরিক বাহিনীর বুটে পিষ্ট হয়েছে মিয়ানমারের নাগরিক অধিকার এবং সংখ্যালঘুদের মর্যাদা।

সংবিধান সংশোধনের নামে সামরিকতন্ত্রের পাকাপোক্ত করণের পাশাপাশি নাগরিকহীন করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদেরকে। ১৯৮২ সালে বার্মা নাগরিকত্ব আইনের নামে রোহিঙ্গাদেরকে নাগরিকহীন করার পাশাপাশি তিন স্তর বিশিষ্ট নাগরিক পরিচয় নির্ধারণ করে নাগরিকদের মাঝে সৃষ্টি করেছে চরম বৈষম্য। বিভিন্ন সময়ে বিরোধীমতকে দমনের নামে সাধারণ জনগণের উপর চলেছে অমানুষিক নির্যাতন। ১৯৭৮ সালে অপারেশন ‘ড্রাগন কিং বা নাগামিনের’ নামে বাস্তুচ্যুত করা হয় লক্ষ লক্ষ নাগরিককে। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের সেনাবাহিনী এবং তাদের দোসরদের বর্বরোচিত জেনোসাইডের শিকার হয়ে প্রায় ১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে পালিয়ে আসে এবং কক্সবাজার সীমান্তের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নেয়। প্রতিনিয়ত বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত রোহিঙ্গাদের দ্বারা সংগঠিত বিভিন্ন অপরাধ যেমনঃ মাদকপাচার, চোরাচালান,চাঁদাবাজি , অপহরণ, হত্যার মত ঘটনা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি, অবৈধ আইডি কার্ড ব্যবহার করে বাংলাদেশের শ্রম বাজারে গোপনে তাদের সস্তা শ্রম বাংলাদেশীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টিকে হুমকীর মুখে ফেলে দিচ্ছে। শ্রমবাজারের সাথে সাথে পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় হচ্ছে রোহিঙ্গাদের বসবাসের জন্য। কক্সবাজার এলাকায় বিভিন্ন রোহিঙ্গা উগ্রবাদী সন্ত্রাসী যেমন আল ইয়াকিন (কক্সবাজারে রোহিঙ্গা নিয়ন্ত্রিত সশস্ত্র বাহিনীটির নাম হারাকা ‘আল-ইয়াকিন’। বর্তমানে রোহিঙ্গাসহ স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করেছে এ বাহিনীর সদস্যরা। কক্সবাজারে আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি -আরসা নামেও এরা পরিচিত।

বিজ্ঞাপন

কক্সবাজারবাসী একে ‘জঙ্গি বাহিনী’ বলেও আখ্যা দিয়েছেন (ঢাকা পোস্ট ০১ জুলাই ২০২১ )। সালমান শাহ গ্রুপের মত উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গ্রুপের তৎপরতায় এখন স্থানীয় বাংলাদেশিরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ছে । এই সমস্ত উগ্রবাদী সংগঠনে তৎপরতা ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বাংলাদেশের সাথে ২০১৭ সালের ২৩ নভেম্বর ১৯ দফা সংবলিত একটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর হলেও বিগত চার বছরে বাংলাদেশ থেকে একজনও রোহিঙ্গাকে মায়ানমার ফেরত নেয়নি। গত ০১ ফেব্রুয়ারি সামরিক শাসনের ফলে নীতিগত পরিবর্তনের বিষয়টি এখন পুনরায় ‘রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের’ বিষয়ে নতুনভাবে ভাবনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনের’ বিষয়টি যতই দীর্ঘ হবে, ততই বাংলাদেশের নিরাপত্তার বিষয়টি ক্রমেই হুমকির মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের মত ভারতের জন্য সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ফলে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ১০ জুন ২০২১ সালের আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মিয়ানমারের হাজার হাজার মানুষ পালিয়ে ভারতের মিজোরাম, মনিপুর এবং নাগাল্যান্ডে আশ্রয় নিচ্ছেন। এখন পর্যন্ত ১৬ হাজারের মতো মানুষ আশ্রয় নিয়েছে এসব অঞ্চলে।“ সবচেয়ে বেশী সংখ্যক মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন মিজোরামের টিয়াও নদীর তীরবর্তী ঘন বনাঞ্চলে যেখানে গণতন্ত্রপন্থী যোদ্ধারাও রয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে । পূর্ব থেকেই এই অঞ্চলে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ছিল বলে জানা যায়। এই সমস্ত সন্ত্রাসী গোষ্টী শরণার্থীদের ব্যবহার করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করার জন্য তৎপরতা চালাতে পারে। অদূর ভবিষ্যতে যদি এই সমস্ত শরণার্থী সংকটের বিষয়ে ভারত যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে না পারে, তাহলে সীমান্ত নিরাপত্তা ,উগ্রসন্ত্রাসবাদের তৎপরতা এবং ভারত ও মিয়ানমারের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কের নতুন মোড় নিতে পারে। এই বিষয়টি ভারতের আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিকে নতুনভাবে ভাবাতে শুরু করেছে।

এই সংকটের আঁচ লাগতে শুরু করেছে থাইল্যান্ডের সীমান্তেও। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী কারেন রাজ্যে বিমান হামলার ফলে হাজার হাজার গ্রামবাসী ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে থাইল্যান্ডে আশ্রয় নেয়ার চেষ্টা করে। থাইল্যান্ড তাদেরকে প্রাথমিকভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে ফলে, থাইল্যান্ডের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত সালউইন নদীর তীরের জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। মাঝে মাঝে কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের (কেএনইউ) বাহিনীগুলো সেনাবাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। কারেন ন্যাশনাল ইউনিয়নের সদস্যরা তাদের তৎপরতাকে চালানোর জন্য থাইল্যান্ডের সীমান্তকে বিভিন্নভাবে ব্যাবহারের চেষ্টা করে যাচ্ছে যা থাইল্যান্ডের নিরাপত্তার জন্য খুবই উদ্বেগজনক।

মিয়ানমারের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সংকটের প্রভাব ইতোমধ্যেই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর নিরাপত্তায় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সংকট যতই দীর্ঘায়িত হবে, ততই আঞ্চলিক নিরাপত্তার সমস্যার বিষয়টি আরও ঘনীভূত হতে পারে !

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)