চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য এত মায়াকান্না কেন?

বেসরকারী টেলিভিশনের টক শো’র অনেক আলোচক খুবই চিন্তিত। কারণ একটাই। তা হলো, মাদক বিরোধী অভিযান কোন স্টাইলে হচ্ছে? তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, যদি ইন্দোনেশিয়া স্টাইলের হয়, তাহলে হয়তো একদিকে যাওয়া যাবে, আর যদি ফিলিপিন্স স্টাইলের হয় তাহলে সামনে খুব অন্ধকার সময় অপেক্ষা করছে।

আলোচকরা এখানে অন্ধকার বলতে কী বুঝিয়েছেন, বিষয়টা স্পষ্ট নয়। তবে তাদের একটা পরিচয় না দিলেই নয়, ওনারা সুযোগ বুঝে কথা বলেন। কারও কারও পূর্বের সব আলোচনা দেখে মাদকের আলোচনায় এমনটাই মনে হলো। যদিও বিশ্বের কোনো মানবিকতার বিচার কিংবা বিনা বিচারে কোনো হত্যাকাণ্ডই সমর্থন করা যায় না। মানবতায় একটা প্রবাদ আছে, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কোনভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

প্রশ্ন আসতে পারে মাদক ব্যবসা করে বলে কী ওরা মানুষ নয়? ওদের কি অধিকার নেই আইনের সাহায্য পাওয়ার? অবশ্যই আছে। তবে মাদক বিক্রি করে, সেই মুনাফা দিয়ে আইনি লড়াই চালিয়ে ন্যূনতম ১০ বছর যদি আদালতে হাজিরা দেয়, তাহলে মাদক নির্মুল হবে কী করে? আর যাদের রক্ষার জন্য মাদক নির্মুলের চিন্তা ভাবনা বরাবর সভ্য সমাজ করে, সেই তারুণ্য রক্ষায় এরকম দীর্ঘমেয়াদি প্রসেসে লাভ কী? আদৌ কি কোনো লাভ আছে?

এছাড়া মাদক নির্মূলে ক্রসফায়ার বিষয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের কথায় বুঝা গেল, মাদক ব্যবসায়ী দুই প্রকারের হয়। ১. আওয়ামী লীগের মাদক ব্যবসায়ী। ২. বিএনপির মাদক ব্যবসায়ী। মির্জা ফখরুল মাদক সেবন করেন এমনটা মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে তার কথায় বুঝা যায়, এখন পর্যন্ত যেসব মাদক সিন্ডিকেট বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি যেকোন উপায়ে ডাউন হয়েছে, তারা সবাই বিএনপির মাদক ব্যবসায়ী। অথচ আওয়ামী মাদক ব্যবসায়ীরা কেউ মারা যাচ্ছে না। এ কারণে হয়তো মির্জা ফখরুলরা একটু চিন্তিত হয়ে গেছেন, প্রকাশ্যেই মাদকের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তারা কিন্তু যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময়ও বিরোধিতা করেছিলেন। অথচ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারগুলো কিন্তু সঠিক আইনে, শুনানী এবং সাক্ষীর ভিত্তিতেই হয়েছিল। মির্জা ফখরুল, রুহুল কবির রিজভীরা কি সেই বিচার মেনে নিয়েছিল? সুতরাং এখনকার মাদক অপরাধীদের সেই দীর্ঘমেয়াদি বিচার হলেই যে মির্জা ফখরুলরা অভিনন্দন জানাবে, তার পক্ষে শক্ত গ্যারান্টি কী?

Advertisement

একই কথা আন্তর্জাতিক এনজিও এবং মানবাধিকার সংস্থার বেলায়ও প্রযোজ্য। এখানে তাদের আর্থিক কিছু আয়-রোজগারের বিষয় থাকে। ইউরোপীয়ান স্ট্যান্ডার্ডের এসব এনজিও এবং মানববাধিকার সংস্থাগুলো যেকোনো ধরনের জীবন নেওয়ার বিরুদ্ধে। সেটা হোক নিজামী, সাকা, মুজাহিদ কিংবা এখনকার মাদক ব্যাবসায়ী। এমন অবস্থায় এনজিওগুলো যদি বিবৃতি কিংবা সাংবাদিক সম্মেলন না করে, অনেক সময় তাদের মাসিক ইউরো বা ডলার আটকে যাবে। মাদকে দেশ সয়লাব হলে সরকারের ব্যর্থতা তুলে ধরে সাংবাদিক সম্মেলন করা যেমন তাদের দায়িত্ব, ঠিক তেমনই মাদক অপরাধীরা মারা গেলে সেটার বিরোধীতা করাও তাদের দ্বায়িত্ব।

যাহোক, মাদক দমনে সরকার কোন পথে হাটবে সেই বিষয়টা সরকারের উপরে ছেড়ে দেওয়া উচিত। ভুলে গেলে চলবে না যুদ্ধাপরাধের বিচার, সন্ত্রাস দমন, জঙ্গীবাদ দমন, পদ্মা সেতু নির্মাণ, শিক্ষা-খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, তথ্য প্রযুক্তির উন্নয়নের ওয়াদার সাথে মাদক দমন সরকারের নির্বাচনী ওয়াদা ছিল। কাজেই মাদক অপরাধ কিভাবে দমন করবে সরকার সঠিক তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে সরকার সেটা করুক। এতে কোনো ধরনের বিভ্রান্তি কিংবা অযথা বাক্যবিনিময় করার কোন দরকার নেই। জঙ্গীবাদ ও সন্ত্রাসবাদের মত মাদক সন্ত্রাসও একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। এই সমস্যা সমাধানে শক্তি যেমন খাটাতে হবে তদ্রুপ সামাজিক আন্দোলন দরকার।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় মাদক মানেই এখন ইয়াবার দাপট কথাটা চরম সত্যি। সেক্ষেত্রে মাথায় রাখতে হবে, ধর্মের দোহাই কিংবা মানবতার কথা বলে ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে জায়গা দেওয়াটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বাংলাদেশে একমাত্র ইয়াবার প্রবেশ পথ কক্সবাজার, বান্দরবন জেলার বিভিন্ন অঞ্চলের সঠিক ও নির্ভুল গত ৮ বছরের তথ্য সংগ্রহ করে, ওইসব ব্যক্তি বা পরিবারের কম করে হলেও দুইটা প্রজন্ম একেবারে ডাউন করে দিতে হবে। পাশাপাশি গত ৮ বছরে উক্ত সেইসব অঞ্চলে আইনশৃংখলাসহ সংশ্লিষ্ট সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিষয়ে যাবতীয় অনুসন্ধান করে যার সাথে ইয়াবা পাচারের নুন্যতম সহযোগিতা পাওয়া যাবে, তাদেরকে ডাউন করে দেওয়া হোক। তারপরে খুচরা বিক্রেতা ও ডিলার ইস্যু। কারণ শিকড় জীবিত রেখে ডালপালা ছাটলে গাছ হয়তো সাময়িক ভাবে দুর্বল হয়, কিন্তু চিরতরে বিনাশ হয় না। এক্ষেত্রে গত পাঁচ বছরের টেকনাফ-উখিয়ার এমপি বদির বিরুদ্ধে মাদক সংশ্লিষ্টতার সকল অভিযোগগুলো পুনরায় নির্মোহভাবে দেখা উচিত। এক্ষেত্রে সরকারকে মনে রাখতে সাংসদ বদি মোটেই আওয়ামী লীগের সম্পদ নয়, বরং বোঝা। এটা সংশ্লিষ্টরা যত সহজে বুঝবেন ততোই মঙ্গল।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)