চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘মন্দের ভালো’ই ‘মন্দের’ চেয়ে ভালো বিকল্প

বাংলাদেশে সম্প্রতি একটি মেয়র নির্বাচন হয়েছে; যেখানে ক্ষমতাসীন দলের তিনজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন। তারা বিজয়ী না হলে বিজয়ী হতেন সাম্প্রতিক সময় অবরোধে মানুষ পোড়ানো দল বিএনপির তিন প্রার্থী। তাতে খুব লাভ হতো বলে মনে হয় না। ভোটে ভোটারদের সিদ্ধান্ত নেবার প্রবণতা থেকে এটা স্পষ্ট, ভোটাররা হয় আওয়ামী লীগকে ভোট দেবে; নয়তো বিএনপিকে। এই যেখানে অবস্থা; সেখানে ‘মন্দের ভালো’ আওয়ামী লীগকেই অপেক্ষাকৃত যৌক্তিক বিকল্প বলে মনে হয়।

যে কোনোভাবে পুরো দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ‘মন্দের ভালো’ই এখন পর্যন্ত সেরা বিকল্প। যতোক্ষণ পর্যন্ত ‘ভালো’ বিকল্প তৈরি না হচ্ছে; ততোক্ষণ ‘মন্দের ভালো’ই ‘মন্দের’ চেয়ে ভালো বিকল্প। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকারটি যেমন ছিলো ‘মন্দের ভালো’। কিন্তু তাদের নিরংকুশ একনায়কী আচরণে বিরক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ তৃণমূল কংগ্রেসের ‘মন্দ’টিকে ক্ষমতায় নিয়ে আসে। এতে করে ভালো তো এলোই না; মন্দ এসে সিন্দাবাদের ভূতের মত চেপে বসেছে তাদের ঘাড়ে।

সেই অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের বাংলাদেশেও যথেষ্ট সচেতনতার দরকার রয়েছে। মন্দের ভালোর সমালোচনা এবং প্রশংসা করে যতোটা ভালো পাওয়া যায় তাতেই সন্তুষ্ট থাকা বাস্তবসম্মত। হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের নিয়তিই মন্দের ভালো নিয়ে বেঁচে থাকার। মন্দের চেয়ে মন্দের ভালো শ্রেয়তর; পশ্চিমবঙ্গের অভিজ্ঞতা তাই বলে।

এ কারণে গতবছরের ৫ জানুয়ারির জোড়াতালি দেয়া নির্বাচনকে আমরা আওয়ামী লীগের ‘ইলেকশান অফ দ্য ল্যাম্বস’ নির্বাচনী চলচ্চিত্র-বিনোদন হিসেবে সাদরে উপভোগ ও সমর্থন করেছি। কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে গণতন্ত্রের সুষ্ঠু চর্চা ও রাজনৈতিক সংস্কারের সুযোগটি থেকে যায়। এই নির্বাচনে যে বেশি ভোট পাবে তাকেই জয়ী হতে দিতে হবে। নইলে জনগণতো গণতন্ত্র বিষয়টিকে আর সিরিয়াসলি নেবে না। ‘আই হেট পলিটিকস’ প্রজন্ম তৈরি হবে।

বিজ্ঞাপন

ভোটারদের ভোট দেবার ক্ষেত্রে চয়ন পদ্ধতিতে ত্রুটি রয়েছে। গত রাজশাহী ও বরিশাল মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যোগ্য দুজন প্রার্থী হেরেছেন; যারা নিজ নিজ শহরের উন্নয়নে সন্তোষজনক কাজ করেছিলেন। সেটা ভোটারদের ভুল। এই ভুল থেকে তারা শিখবে বর্তমান মেয়র আগের মেয়রের মতো উন্নয়ন কাজ করতে না পারলে।

এখন কাগজে কলমে একদলীয় গণতন্ত্র যেহেতু নেই; সেখানে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে কাজ করতে দিতে হবে। এর মধ্যে জামায়াত পড়বে না। একাত্তরের ঘাতক দলটি বাংলাদেশে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার হারিয়েছে। তবে ইসলামী ব্যাংক ও জামায়াতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বদৌলতে তারা আছে রসে-বশে।

ঢাকার মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোট কারচুপির বেশ কিছু ফুটেজ দেখেছি, বিএনপির নেতাদের টেলিফোনে নির্বাচন বর্জনের টেলি-সংলাপও শুনেছি। গণতন্ত্রের এই দূষিত অডিও-ভিজুয়াল প্রামাণিক দলিল আমাদের হাতে। মেয়র নির্বাচনে একটি কেন্দ্রেও যদি ভোট কারচুপি হয়ে থাকে; তবে তাকে জাস্টিফাই করার সুযোগ নেই। যা ভুল তা ভুল।

এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো যারা পৃথিবীর সব দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে; কোথাও ‘ভোট কারচুপি দেখলে’ (ফুটেজ যেহেতু মজুদ) ফোন করে ওই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকার প্রধানকে। এটা রুটিন ওয়ার্ক।

মেয়র নির্বাচনের ‘ভোট কারচুপি’ বিষয়ে জাতিসংঘের মহাসচিব ফোন করলে সেটি যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর ষড়যন্ত্র বলে যারা ব্যাখ্যা দেন; তারা ‘যুদ্ধাপরাধ’ বিষয়টিকে অজ্ঞাতসারে কম গুরুত্বপূর্ণ করে ফেলেন। কারণ বৈশ্বিক জাতিসমূহের মত প্রকাশের অধিকার সুরক্ষার জন্যই জাতিসংঘের সৃষ্টি।

আবার যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের যে ফোন এসেছে মৃত্যুদণ্ড রদ করার অনুরোধ নিয়ে, সেটি তারা সব দেশেই করে। কিন্তু যুদ্ধাপরাধ যেহেতু গুরুতর মানবতাবিরোধী অপরাধ; এক্ষেত্রে শাস্তি সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনেই হওয়া যুক্তিসঙ্গত।

প্রত্যেকটি ইস্যুকে আলাদা করে নৈর্ব্যক্তিকভাবে দেখার প্রতীতী না থাকলে রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রবৃদ্ধি ঘটবে না। অর্থনীতির উপরিকাঠামোগত কিছু জেল্লা আসবে সৌদি আরবের মতো। কিন্তু সারবত্ত্ব (এসেন্স)বিহীন এ সমাজ গড়ে তো লাভ নেই।

‘ডিনাইয়াল’ দক্ষিণ এশিয়া তথা ভারতীয় উপমহাদেশের মজ্জাগত একটি রোগ। ‘জাস্টিফিকেশান’ প্লেগের মতো ছড়িয়ে পড়েছে অনেকের মনোজগতে। এটা নিঃসন্দেহে উত্তরণ নয়।

দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ এখন কট্টরপন্থার ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। এ কেবল ধর্মীয় কট্টরপন্থা নয়; এ নিরংকুশ ক্ষমতার কট্টরপন্থাও।

‘আমরা যাই করবো তাই ঠিক’ না মানলে ‘তুই ষড়যন্ত্রকারী’, এই লোকজ তালগাছ সূত্রটি অনেকের মাথার মধ্যে শেকড় গেঁড়ে বসেছে। এটি মর্মান্তিক এক ভ্রান্তি। বাংলাদেশ যতোক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবী নামের গ্রহতে আছে; ততোক্ষণ পর্যন্ত জাতিসংঘের ফোন আসবে। জাতিসংঘের শান্তি মিশনে যতোদিন বাংলাদেশের শান্তি কর্মীরা যাবেন, ততোদিন ফোন আসবে, জাতিসংঘের দাতাসংস্থাগুলোর অনুদানে যতোদিন স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট নির্মিত হবে; ততোদিন ফোন আসবে। উন্নতির প্যারাস্যুটে চড়ে বাংলাদেশ যতোদিন পর্যন্ত মঙ্গলগ্রহে না চলে যাচ্ছে; ততোদিন পর্যন্ত এ ফোন আসতেই থাকবে। এ ফোন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ওবামার কাছেও যায়; রাশিয়ার নেতা পুতিনের কাছেও যায়। শোনা না শোনা তাদের ব্যাপার। কিন্তু তাই বলে ওবামা-পুতিনের ভুল একগুঁয়েমিগুলো ইতিহাস বিস্মৃত হয় না।

তাই যতো দোষ জাতিসংঘ ঘোষ হচ্ছে বাচ্চার পরীক্ষায় ফেল করার জন্য যে শিক্ষকরা খাতা দেখেছেন তাদের দায়ী করার মতো ব্যাপার।

এই একবিংশ শতকে অষ্টাদশ শতাব্দীর ভাবনা নিয়ে, একগাছা ষড়যন্ত্রসূত্রের বয়ান হচ্ছে ‘ডিনাইয়াল‘ এবং ‘জাস্টিফিকেশান’-এর রঙ্গিন মিকশ্চার ভাইরাস।

মাসকাওয়াথ আহসান: লেখক, সাংবাদিকতার শিক্ষক

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন