চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ভেজাল ও নকল ওষুধ করোনার ভুয়া রিপোর্টের চেয়েও ভয়াবহ’

ভেজাল ও নকল ওষুধ প্রস্তুত করে যারা লাখ লাখ মানুষকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, তারা হত্যাকারী বলে মন্তব্য করেছেন নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার আন্দোলনের নেতারা।

তারা বলেছেন: মানহীন, ভেজাল ও নকল ওষুধের ফল ভুয়া করোনা রিপোর্টের চেয়েও ভয়াবহ। ভেজাল ও নকল ওষুধ খেয়ে যদি কারো মৃত্যু হয় তাহলে সেগুলোর উৎপাদক ও অসাধু ব্যবসায়ীদের মৃত্যুদণ্ডের দাবিও যৌক্তিক। তাদেরকে অনুকম্পার সুযোগ নেই।

বিজ্ঞাপন

সোমবার জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে ‘নিরাপদ খাদ্য ও ভোক্তা অধিকার আন্দোলন, বাংলাদেশ’র উদ্যোগে ভেজাল ও নকল ওষুধ উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রি এবং জড়িত অসাধু ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ শাস্তি ও দুর্নীতিমুক্ত স্বাস্থ্যখাতের নিশ্চিতের দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনে বক্তারা একথা বলেন।

আয়োজক সংগঠনের প্রধান নির্বাহী কামরুজ্জামান বাবলুর সভাপতিত্বে মানববন্ধনে সংহতি জানিয়ে বাংলাদেশ ন্যাপ মহাসচিব এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া, এনডিপি মহাসচিব মো. মঞ্জুর হোসেন ঈসা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সাবেক সভাপতি সাংবাদিক মীর মোহাম্মদ জসিম, আয়োজক সংগঠনের মো: শহীদুল ইসলাম, মানিক মিয়াজী, সারোয়ার নিজামী, সরদার মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার, আব্দুল আজিজ, ঈমাম হাসান, কুমিল্লা জেলা শাখার আহবায়ক এইচএম মহিউদ্দিনসহ বিভিন্ন স্তরের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন।

এম. গোলাম মোস্তফা ভুইয়া বলেন, দেশে প্রতি বছর ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধের বার্ষিক বিক্রি দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে, যা মোট বিক্রির ২০ শতাংশ। তিনি বলেন, আমরা কোথায় যাব, কী খাব? শাক-সবজিতে ভেজাল, ফলমূলে ভেজাল, তেলে ভেজাল। এসব ভেজাল খেয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে তারা যেসব ওষুধ দেবেন -সেগুলোতেও ভেজাল। এ থেকে মুক্তি পেতে ভেজালবিরোধী নতুন আইন করা জরুরি।

বিজ্ঞাপন

তিনি বলেন, খাদ্যে ভেজাল ও নকল ওষুধ প্রস্তুতকারী ব্যক্তি-প্রতিষ্ঠান দেশ ও জাতির শত্রু। তারা ব্যক্তিগত মুনাফার লোভে এই দেশের জনসাধারণকে পয়জনিংয়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হত্যায় লিপ্ত আছে। সরকারের উচিত হবে, রাষ্ট্রযন্ত্রগুলোর দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি এই ধরনের অপরাধের যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে সেটা আরও জোরদার করা এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে অপরাধীর মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

কামরুজ্জামান বাবলু বলেন, নিরাময়ের জন্য ওষুধ খেয়ে মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে নকল ও ভেজাল ওষুধ। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ জরুরি। নকল ওষুধ তৈরি ও বিক্রয়কারীরা সভ্যতা ও মানবতার শত্রু। এরা অমানুষ, এরা গণদুশমন। এদের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নকল ওষুধের মাধ্যমে যারা মানুষ হত্যা করছে তাদের কোন ক্ষমা হতে পারে না। ভেজাল ও নকল ওষুধ উৎপাদনকারী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে। তাদেরকে সামাজিকভাবেও বয়কট করতে হবে।

তিনি বলেন, বিশ্বদরবারে বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প যখন ভীষণ রকম মর্যাদাশীল হয়ে উঠছে, তখন নকল, মানহীন, অননুমোদিত, অনিবন্ধিত ওষুধে দেশের বাজার সয়লাব হয়ে যাচ্ছে, ক্রেতারা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন, নকল ওষুধের কারণে জীবন আরও বিপন্ন হয়ে উঠছে, দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে- এগুলো কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।

ওষুধ শিল্পের সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের বরাতে জানানো হয়, দেশে মোট উৎপাদিত ওষুধের অন্তত ২ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি বছর ৪শ কোটি টাকার বেশি মূল্যের ভেজাল, নকল ও নিম্নমানের ওষুধ তৈরি হয়। অন্যদিকে ওষুধ কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ওষুধ শিল্প সমিতির কর্মকর্তারা বলছেন, দেশে প্রতি বছর ভেজাল বা নিম্নমানের ওষুধের বার্ষিক বিক্রি দেড় হাজার কোটি টাকার ওপরে, যা মোট বিক্রির ২০ শতাংশ। সন্দেহ নেই, ওষুধ বাজারের সুরক্ষিত সিন্ডিকেটই বহুদিন ধরে অধিক মুনাফা লাভের আশায় এ ধরনের কাজকর্ম অব্যাহত রেখেছে। আর এই সিন্ডিকেটই অননুমোদিত, অনিবন্ধিত ভেজাল ও নিম্নমানের ওষুধের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ভেজাল ও নকল ঔষধ প্রস্তুত ও বিপণন বন্ধে

সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ১০ দফা সুপারিশ পেশ করা হয়। সেগুলো হলো: ১. নকল, ভেজাল, মেয়াদোত্তীর্ণ ও মানহীন ওষুধ সরবরাহকারী চক্রের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনে যাবজ্জীবন কারাদন্ডসহ মৃত্যুদন্ডের বিধান রেখে আইন পাস করা; ২. নিরাপদ ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিতকরণে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান ও জনবল বৃদ্ধি; ৩. নকল ও ভেজাল ওষুধ উৎপাদন, বাজারজাত ঠেকাতে মনিটরিং ব্যবস্থা আরও জোরদার করে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় সাধন; ৪. ফুটপাত, পার্ক, গণপরিবহনসহ পাবলিক প্লেসে সব ধরনের ওষুধ বিক্রি বন্ধ; ৫. ফার্মেসিগুলোতে রেজিস্টার্ড ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া ওষুধ বিক্রি না করা; ৬. নিরাপদ ওষুধ সরবরাহের লক্ষ্যে ফার্মেসিতে ফার্মাসিস্টের উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ; ৭. ফার্মাসিউটিক্যাল গবেষণাকে উৎসাহিত করা; ৮. লাইসেন্সবিহীন ফার্মেসিগুলো অতিদ্রুত বন্ধ করে আইনের আওতায় আনা; ৯. সরকারের মডেল ফার্মেসি কার্যক্রম বেগবান; ১০. সর্বোপরি মানসম্পন্ন ওষুধ গ্রহণ করতে জনগণের আরও বেশি সচেতন হওয়া।