চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়’

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস

এক
কেমন ছিল তার ফিরে আসার দিনটি?
কেমন ছিল ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের সেই মহা কাঙ্ক্ষিত দিনটি?
হ্যাঁ, বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার সেই দিনটি ছিল পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সেরা দিনগুলোর মধ্যে অনন্য এক উজ্জ্বল দিন। মধুমাখা এক দিন।
বঙ্গবন্ধু সেদিন এসেছিলেন ফিরে।
তার ফিরে আসার মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্য বাঙালি জাতি তার সর্বস্ব নিয়ে অধীর আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছিল। সেদিন তাদের অপেক্ষার ক্ষণটি যেন শেষ হতে চাইছিল না।
কখন আসবেন তিনি?
কখন আসবেন মহামানব?
কখন আসবেন বাঙালির স্বপ্ন পুরুষ?
কখন আসবেন বাঙালির মুক্তির অবিসংবাদিত নেতা?
তারপর শেষ হল তাদের অপেক্ষার।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর বঙ্গবন্ধু ফিরে এসেছিলেন তার ফেলে যাওয়া জল-মাটি-কাঁদামাটি মাখা ধূলিধূসরিত অবারিত সবুজের বাংলায়। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বাংলার জল, বাংলার কাঁদা, বাংলার মাটি অশ্রুসিক্ত হয়েছিল তার আগমনে।

দেশে ফেরার পথে ১০ জানুয়ারি বিমানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভারতীয় কূটনীতিক শশাংক ব্যানার্জী
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

দুই
উনিশ শ’ একাত্তর সালের পহেলা মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার অনির্দিষ্টকালের জন্য জাতীয় পরিষদের বৈঠক স্থগিতের ঘোষণা, ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুর দেশব্যাপী হরতাল আর সাত মার্চ রমনা রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ- সব কিছু বাঙালি জাতির ভেতরে স্বাধীনতার স্বপ্নটিকে উজ্জীবিত করে তোলে। দেশের মানুষ মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে একাট্টা হয়ে যায়-তারা প্রস্তুতি নেয় যুদ্ধের। অন্যদিকে পাকিস্তানী শাসকেরা সবকিছু নিয়ন্ত্রণে রাখতে মরিয়া হয়ে ওঠে। দেশের ভেতরে তারা তৈরি করে এক ভীতিকর পরিস্থিতির। পঁচিশ মার্চ গভীর রাতে তারা ঘুমন্ত জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। রচিত হয় গণহত্যা- বাঙালি জাতিকে দমন করার নামে নির্বিচারে মানুষ হত্যার উৎসবে মেতে ওঠে তারা। একইদিন রাতের আঁধারে তারা বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে।

৭ মার্চের পর থেকে পরিস্থিতির সম্ভাব্য ভয়াবহতা উপলব্ধি করতে পেরে দেশ বিদেশের অনেক বর্ষীয়ান নেতা, রাজনৈতিক গবেষক বঙ্গবন্ধুকে দলীয় নেতাদের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তারা পরিস্থিতির সম্ভাব্য পরিণতি বুঝতে পেরেই এধরনের কথা বলার প্রয়াস পেয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাদের সেই কথায় কান দেননি।

কেন বঙ্গবন্ধু তাদের কথায় কান দেননি?

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু রাজনীতিটা খুব ভাল করে বুঝতে পারতেন। তিনি তার রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিন থেকে নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনে দেখেছেন নেতাদের পলায়নপর মনোবৃত্তি- এই উপমহাদেশে অন্যান্য রাজনৈতিক নেতাদের, তিনি দেখেছেন তারা সময়ে অসময়ে রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে মোকাবিলা না করে পার্টির নেতা কর্মীদের একা ফেলে আত্মগোপনে চলে যেতেন। নেতাদের এধরনের পালিয়ে থাকার বিষয়টিকে তিনি পছন্দ করতেন না। বঙ্গবন্ধু ভাবতেন,পার্টির দুঃসময়ে পার্টির সবাইকে একা ফেলে পালিয়ে যাওয়ার এ কেমন মনোবৃত্তি!
বঙ্গবন্ধু সবসময় চেয়েছেন পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার। সেই উন্মাতাল সময়ে বঙ্গবন্ধু নিজের স্থির সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন- তিনি নিজের বাড়িতে বসে মার্চের টালমাটাল বারুদ-পরিস্থিতিকে সবাইকে নিয়ে মোকাবিলা করতে চাইলেন। তিনি মনে করতেন পালিয়ে গিয়ে কিংবা আত্মগোপনে চলে গিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তিনি সবসময় বলতেন, আমি সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাদের রাজনীতি করি-তাহলে বিপদের দিনে তাদেরকে একা রেখে আমি কেন দূরে থাকব? এ কথা তিনি লিখেছেন তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে, ‘আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না।’ ( পৃষ্ঠা ১৩৪)

প্রধানমন্ত্রী হিথ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রীটের সামনে নিজ হাতে বঙ্গবন্ধুর গাড়ির দরজা খুলে দিচ্ছেন

২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এ খবরটি এক সপ্তাহ গোপন রাখে। ৭ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের নির্জন কারাগারে গোপন বিচারে বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী ঘোষণা করে মৃত্যুদণ্ড দেয় সামরিক আদালত। এদিকে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার নির্দেশে ১০ এপ্রিল তাকে রাষ্ট্রপতি করে প্রবাসী সরকার গঠন ও ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের শপথ গ্রহণ করা হয়। দেশের মানুষ ‘তোমাদের যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পরো-‘, ‘আমি যদি হুকুম দেবার না-ও পারি-‘ মন্ত্রে যুদ্ধে নেমে পড়ল। সারাদেশে তখন একটাই মন্ত্র, ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’…

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। সেদিন ছিল নির্মল, ঝকঝকে রোদ্দুরের এক ঝলমলে দিন। সেদিন সকাল থেকে রেসকোর্সের ময়দানসহ সারা দেশে, সারা শহরে আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে গেল, তিনি আসছেন, মহামানব আসছেন- আসছেন বাঙালির হৃদয়ের রাজপুত্তুর সোনার ছেলে বঙ্গবন্ধু। তেজগাঁও বিমানবন্দর, বিমানবন্দরের আশেপাশের বিল্ডিং, ছাদ, রাস্তা, গাছপালা- সব জায়গায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। সবার আনন্দ কলরবে আকাশে বাতাসে কল্লোলিত হল সুরের ধারা- সে সুরে আনন্দ- বেদনারা নৃত্য করছিল। উপস্থিত সকলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন- কখন আকাশের গায়ে বিমানের দেখা মিলবে। কখন? একসময় আকাশে দেখা মিলল সেই কাঙ্খিত বিমানের।
বিমান থেকে নেমে ধীর পায়ে নেমে এলেন হাজার বছরের সেরা বাঙালি বঙ্গবন্ধু। তিনি দেখলেন তার জন্য অপেক্ষা করছে বাংলার অগনিত মুক্তিপ্রিয় মানুস- এইসব মানুষ হল স্বপ্নবাজ মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে দেখে সবার চোখ সজল হয়ে উঠল। তারা দেখতে পেলেন বিমান থেকে ধীরে ধীরে নেমে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন বঙ্গবন্ধু- তারা দেখছেন সাদা কবুতরের মতো দীর্ঘকায় বঙ্গবন্ধু তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন।

তিন
একদিকে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতি অন্যদিকে তার নির্দেশিত পথ- এই দুই মনোবলে বাংলার দামাল ছেলেরা যুদ্ধে জয়লাভ করল। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করল পাকিস্তানীরা। বাংলার আকাশে লাল সবুজের পতাকা উড্ডীন কিন্তু দেশের মানুষের অন্তরে বিজয়ের আনন্দের ছিটেফোঁটা নেই, আনন্দের উল্লাসধ্বনি নেই।

থাকবে কী করে?

স্বাধীনতার মহান পুরুষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। বঙ্গবন্ধু বিনে বাংলার মানুষ কী করে স্বাধীনতার আনন্দ ভোগ করে!

দেশ স্বাধীনের পর বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে এবং একইসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তির প্রশ্নে বিশ্বনেতারা এক জোট হলে পাকিস্তান সরকার চাপে পড়ে তাকে মুক্তি দিতে সম্মত হয়।

বঙ্গবন্ধু সবসময় চেয়েছেন পরিস্থিতিকে সামাল দেয়ার। সেই উন্মাতাল সময়ে বঙ্গবন্ধু নিজের স্থির সিদ্ধান্তে অটল থাকলেন- তিনি নিজের বাড়িতে বসে মার্চের টালমাটাল বারুদ-পরিস্থিতিকে সবাইকে নিয়ে মোকাবিলা করতে চাইলেন। তিনি মনে করতেন পালিয়ে গিয়ে কিংবা আত্মগোপনে চলে গিয়ে পরিস্থিতির মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। তিনি সবসময় বলতেন, আমি সাধারণ মানুষকে নিয়ে তাদের রাজনীতি করি-তাহলে বিপদের দিনে তাদেরকে একা রেখে আমি কেন দূরে থাকব? এ কথা তিনি লিখেছেন তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে, ‘আমি পালিয়ে থাকার রাজনীতিতে বিশ্বাস করি না। কারণ আমি গোপন রাজনীতি পছন্দ করি না, আর বিশ্বাসও করি না।’ ( পৃষ্ঠা ১৩৪)

চার
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর বাঙালি জাতি বিজয়ের স্বাদ পেলেও তারা তাদের প্রাণের নেতা শেখ মুজিবকে ফিরে পেতে আকুল হয়ে অপেক্ষার সাগরে ভাসছিল।

কবে ফিরবেন নেতা?

বঙ্গবন্ধু তখনো পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী। দুঃসহ দিন কাটাচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যে তার দেশ, তার মানুষ তার নির্দেশনায় বিশ্বের মানচিত্রে লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু তাদের প্রিয় নেতা তখনো পাকিস্তানের অন্ধকার কারাগারে বন্দী। এদিকে বিশ্বের শান্তিকামী সব দেশ আর বাঘা বাঘা নেতাদের দাবী উঠল অতি দ্রুত বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে হবে। এদাবির পরিপ্রেক্ষিতে নিরুপায় হয়ে পাকিস্তান সরকার বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে বাধ্য হল। ইতিমধ্যে বঙ্গবন্ধু পৃথিবীর মুক্তিকামী মানুষের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।

বিশ্বব্যাপী সোচ্চার ধ্বনি উত্থাপিত হল বঙ্গবন্ধুর মুক্তির বিষয়টি। তখন শুধু অপেক্ষা ছিল কখন তিনি মুক্তি পাচ্ছেন। ব্যারিস্টার আনিস রহমান তখন লন্ডনে অবস্থান করছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি জানান, ‘আমরা যে শুধু মুক্তিযোদ্ধের জন্য আন্দোলন সংগ্রাম করেছি তাই নয়, আমাদের শ্লোগান ছিল রিকগনাইজ বাংলাদেশ, রিলিজ বঙ্গবন্ধু। আমরা জানতাম না বঙ্গবন্ধু ফিরছেন কিনা। ২৯ ডিসেম্বর প্রথম বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয় বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার কথা ভাবছেন ভুট্টো। আমরা বঙ্গবন্ধুর মুক্তির আন্দোলন আরো বেগবান করি। ২৯ তারিখের পর থেকে আমরা অপেক্ষায় ছিলাম বঙ্গবন্ধু কবে মুক্তি পাবেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যখন দেখা হয়, পা ছুঁয়ে সালাম করার পর তিনি জড়িয়ে ধরে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেন, ‘তোমার বাপ-মা কি জীবিত আছেন? ওরা কি আমার দেশের সব মানুষ মেরে ফেলেছে?

ব্যারিস্টার আনিস রহমান স্মৃতিচারণে আরও জানান, ব্যারিস্টার আনিস বলেন, ‘হোটেল লবিতেই সবাই গিজগিজ করছিলেন, তখন ঢাকা বা দিল্লি থেকে একটা ফোন আসল এবং বঙ্গবন্ধু হোটেলের বলরুমে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রেস কনফারেন্সে বসেন। কনফারেন্স শেষ করে ফিরে আসার সময় বিখ্যাত সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট বঙ্গবন্ধুর একটি সাক্ষাৎকার নিতে চেয়েছিলেন হোটেলে, বঙ্গবন্ধু রাজি হলেন না, বললেন তুমি বাংলাদেশে আসো। সেই ঐতিহাসিক সাক্ষাৎকারটি পরে ডেভিড ফ্রস্ট বাংলাদেশে গিয়ে নিয়েছিলেন।

৮ জানুয়ারি হোটেল ক্লারিজে বঙ্গবন্ধুর প্রেস কনফারেন্স

বিজ্ঞাপন

শুধু কি বাঙালিরাই ছুটে এসেছিলেন সেদিন! ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ তার সরকারি সফর সংক্ষিপ্ত করে ফিরে এসেছিলেন লন্ডনে। শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে সম্মান জানাতে। ৮ তারিখ বিকেল ৫টায় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে এক বৈঠকে মিলিত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। যাবতীয় রীতি উপেক্ষা করে প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ বঙ্গবন্ধুকে বহন করা গাড়ির দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিলেন যতক্ষণ না বঙ্গবন্ধু গাড়িতে ওঠেন।

উল্লেখ্য, ব্রিটেন তখনো বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসার প্রায় এক মাস পর ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল।

যদিও এডওয়ার্ড হিথের বঙ্গবন্ধুকে দে‌ওয়া সম্মান নিয়ে অনেকেই সমালোচনা করেছিলেন, উত্তরে হিথ বলেছিলেন, আমি জানি কাকে সম্মান জানাচ্ছি, তিনি হচ্ছেন একটি জাতির মুক্তিদাতা মহান বীর। তাকে এই সম্মান প্রদর্শন করতে পেরে বরং আমরাই সম্মানিত হয়েছি। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে সেদিন ছুটে এসেছিলেন ব্রিটেনের সেই সময়ের ফরেন মিনিস্টার অ্যালেকডক্লাস হিউ।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তৎকালীন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সদস্য বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি মুজাম্মিল আলী জানান , ‘সে সময় আমাদের বেশিরভাগ মানুষেরই টেলিভিশন বা রেডিও কেনার ক্ষমতা ছিল না। ৮ তারিখ সকালে হিথ্রো বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী পাকিস্তানি একটি বিশেষ ফ্লাইট ৬৩৫এ অবতরণ করার আগে সকালের বিবিসি মর্নিং সার্ভিসে প্রথম ঘোষণা করা হয় বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে লন্ডনে আসছেন।

বঙ্গবন্ধু তার এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন

সকাল ৭টায় বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথ্রো বিমান বন্দরে অবতরণ করবে। সেই সংবাদটি সাথে সাথে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সিনিয়র কয়েকজন নেতা ফোন করে জানিয়েছিলেন। রয়টার্স সেদিন শিরোনাম করেছিল ‘লন্ডনে শেখ মুজিব’।

হিথ্রো বিমানবন্দরে ভিআইপি লাউঞ্জে বৈদেশিক দপ্তরের কর্মকর্তারা তাকে স্বাগত জানান। সেখানে ছুটে আসেন ব্রিটিশ পররাষ্ট্র অফিসের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা স্যার ইয়ার মাদারল্যান্ড। তিনি বঙ্গবন্ধুকে জানান, ব্রিটিশ সরকারের সম্মানিত অতিথি হিসেবে নিতে এসেছেন তাকে।

সেখানে সেদিন উপস্থিত ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক। সাত সকালে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক মোহাম্মদ হোসেন মঞ্জু (যিনি বর্তমানে বাংলাদেশেই বসবাস করেন)। ফোন করে বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে আসার বার্তাটি বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিককে দেন এবং ক্ল্যারেজ হোটেলে চলে আসতে বলেন ।

সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, বিলেতে এক টেলিভিশন অনুষ্ঠানে নিবন্ধকারকে বলেছিলেন সেদিনের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর ভালোবাসার কথা।

মানিক বলেন, কিন্তু তিনি যে লন্ডনে এইভাবে আসবেন সেটা আমাদের কল্পনায়ও ছিল না। যে মানুষটির ডাকে জীবন বাজি রেখে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য প্রাণ দিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যাকে ধারণ করছি নিজেদের বুকে যার অপেক্ষায় স্বাধীন বাংলাদেশ, সাড়ে সাত কোটি বাঙালি, সেই মানুষটি আমাদের মাঝে আসলেন ৮ জানুয়ারি।

সকালবেলা বিখ্যাত ক্ল্যারেজ হোটেলের রাজকীয় স্যুইটে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আমরা। তখনো খুব বেশি মানুষের ভিড় হয়নি, বঙ্গবন্ধু সবার কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। দেশের ক্ষয়ক্ষতির কথা জিজ্ঞাসা করছিলেন। নারীদের মধ্যে সেখানে উপস্থিত ছিলেন ড. সুরাইয়া খানম যিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজির শিক্ষক ছিলেন পরবর্তী সময়ে। ছিলেন শেফালি বেগম ও আওয়ামী লীগ নেতা বর্তমানে যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের সভাপতি সুলতান শরীফের আইরিশ স্ত্রী নোরা শরীফ।

শেফালী-সুরাইয়ারা বঙ্গবন্ধুকে দেখে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন। শেফালী তো প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মতো অবস্থা। বঙ্গবন্ধু বারবার জিজ্ঞাসা করছিলেন শহীদদের কথা, দেশের কথা, ধ্বংসের কথা, সেখানে উপস্থিত কেউ আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। বঙ্গবন্ধু উদগ্রীব ছিলেন কখন বাংলাদেশে ফিরবেন। সেখান থেকেই দেশে টেলিফোনে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলেছিলেন।'( সূত্র / বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনঃ মহাকালের সাক্ষী লন্ডন, জুয়েল রাজ)

পাঁচ
বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়ে সরাসরি দেশে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিলেন না। তিনি যে কত দূরদর্শী আর কত বড় মাপের বিশ্বনেতা ছিলেন তার প্রমাণ দিলেন মুক্তি পাবার পর লন্ডন ও দিল্লী হয়ে দেশে ফিরে। বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার আগে লন্ডনে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ আর ভারতের রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধামন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে সার্বিক পরিস্থিতি বুঝলেন এবং বাংলাদেশ নিয়ে বিশ্বনেতাদের মতামত নিলেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর এ সিদ্ধান্তকে অনন্য সাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

কেমন ছিল ১০ জানুয়ারির দিনটি?

১০ জানুয়ারি, ১৯৭২। সেদিন ছিল নির্মল, ঝকঝকে রোদ্দুরের এক ঝলমলে দিন। সেদিন সকাল থেকে রেসকোর্সের ময়দানসহ সারা দেশে, সারা শহরে আনন্দের বার্তা ছড়িয়ে গেল, তিনি আসছেন, মহামানব আসছেন- আসছেন বাঙালির হৃদয়ের রাজপুত্তুর সোনার ছেলে বঙ্গবন্ধু। তেজগাঁও বিমানবন্দর, বিমানবন্দরের আশেপাশের বিল্ডিং, ছাদ, রাস্তা, গাছপালা- সব জায়গায় কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। সবার আনন্দ কলরবে আকাশে বাতাসে কল্লোলিত হল সুরের ধারা- সে সুরে আনন্দ- বেদনারা নৃত্য করছিল। উপস্থিত সকলে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন- কখন আকাশের গায়ে বিমানের দেখা মিলবে। কখন? একসময় আকাশে দেখা মিলল সেই কাঙ্খিত বিমানের।

বিমান থেকে নেমে ধীর পায়ে নেমে এলেন হাজার বছরের সেরা বাঙালি বঙ্গবন্ধু। তিনি দেখলেন তার জন্য অপেক্ষা করছে বাংলার অগনিত মুক্তিপ্রিয় মানুস- এইসব মানুষ হল স্বপ্নবাজ মানুষ। বঙ্গবন্ধুকে দেখে সবার চোখ সজল হয়ে উঠল। তারা দেখতে পেলেন বিমান থেকে ধীরে ধীরে নেমে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছেন বঙ্গবন্ধু- তারা দেখছেন সাদা কবুতরের মতো দীর্ঘকায় বঙ্গবন্ধু তাদের দিকে এগিয়ে আসছেন।
সেদিন বঙ্গবন্ধুর বিমানে তার সফরসঙ্গী হিসেবে আরও কয়েকজনের সঙ্গে ছিলেন প্রখ্যাত সাংবাদিক, কলামিস্ট আতাউস সামাদ।

গবেষক, সাংবাদিক আবুল মকসুদ তার এক লেখায় উল্লেখ করেছেন, ওই বিমানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে এসেছিলেন বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিনিধি সাংবাদিক আতাউস সামাদ। বিমান থেকে নিচে তাকিয়ে বঙ্গবন্ধু যখন দেখতে পান অগণিত মানুষ, তিনি বিচলিত বোধ করেন এবং স্বগতোক্তির মতো বলেন, এই মানুষগুলোকে আমি খেতে দিতে পারব তো!

সন্ধ্যাবেলা আতাউস সামাদ আমাদের বললেন, বিমানে বঙ্গবন্ধু বারবারই শুনতে চাইছিলেন কোথায় কোথায় কী কী ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে ক্ষয়ক্ষতি করেছে পাকিস্তানি বাহিনী। তিনি চিন্তিত ছিলেন কীভাবে দেশকে পুনর্গঠন করে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনবেন।

বিমানবন্দর থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আসতে দীর্ঘ সময় লাগে। একটি খোলা জিপে বঙ্গবন্ধু ছিলেন। ধারাবিবরণীতে ছিলেন আকাশবাণীর দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়। একটু পরপরই একটি রবীন্দ্রসংগীত হচ্ছিল, ‘ভেঙেছ দুয়ার, এসেছ জ্যোতির্ময়, তোমারি হউক জয়।’

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

বিজ্ঞাপন