ব্যাংক খাতে অস্থিরতা ও আমানতের সুদ হার কমে যাওয়ায় আমানতকারীরা ছুটছেন সঞ্চয়পত্রের দিকে। ফলে চলতি অর্থবছরে পরপর দুই মাস নিম্নমুখী থাকার পর অক্টোবরে আবার বেড়েছে সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অক্টোবরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার ঋণ নিয়েছে ৪ হাজার ৬২০ কোটি টাকা। যা সেপ্টেম্বরে ছিল তিন হাজার ৬৬৫ কোটি টাকা।
সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে কথা বলে ও বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমানতের সুদ হারের চেয়েও মুদ্রাস্ফীতি বেশি হওয়া ও ব্যাংক খাতে অস্থিরতা দেখা দেয়ার কারণে সঞ্চয়পত্রের দিকে মানুষের আগ্রহ বেড়েছে।
ব্যাংকে বর্তমানে আমানতে সুদের হার পাঁচ থেকে ছয় শতাংশের মধ্যে। আবার মু্দ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশের উপরে। তবে বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্পের সুদ হার প্রায় ১১ থেকে ১২ শতাংশ।
বৃহস্পতিবার মতিঝিল বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র কিনতে এসেছিলেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ব্যাংকে আমানত রাখার চেয়ে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করা অনেক নিরাপদ ও লাভজনক। তাছাড়া ব্যাংকগুলোতে যে হারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে আমানত রাখলে তা ঠিক সময়ে ফেরত পাওয়া যাবে কিনা তা এখন ভাবনার বিষয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যমতে, আগস্টে ৩ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা অার জুলাইয়ে ৫ হাজার ৫৩ কোটি টাকা ঋণ নেয়া হয়। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ ১৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা নিলেও মোট বিনিয়োগ হয়েছে ২৬ হাজার ৯৬৩ কোটি টাকা। এর মধ্য থেকে আগের বিনিয়োগ করা সঞ্চয় স্কিমগুলোর মূল ও মুনাফা বাবদ ৯ হাজার ৬৪৮ কোটি টাকা পরিশোধের পর নিট ঋণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা।
আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের মূল ও মুনাফা পরিশোধের পর যে পরিমাণ অর্থ অবশিষ্ট থাকে, সেটাই নিট ঋণ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা, যা অর্থবছরের পুরো সময়ের লক্ষ্যমাত্রার ৫৭ দশমিক ৪৩ শতাংশ।
এ সময় সরকার বাজেট ঘাটতি মেটাতে এ খাত থেকে ঋণ নেয়ার কথা ৩০ হাজার ১৫০ কোটি টাকা।
তবে চলতি অর্থ বছরের প্রথম চার মাসে নেয়া এই ঋণ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেশি। ওই সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছিল ১৫ হাজার ৯৬০ কোটি টাকা। অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গত অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল ৭৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত চার মাসে পরিবার সঞ্চয়পত্র থেকে সরকার নিট ঋণ নিয়েছে ৬ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা, যা বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ।
এছাড়া তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্র থেকে ৪ হাজার ৫৪৩ কোটি টাকা। আর পেনশনার সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া হয় এক হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ‘ব্যাংক খাতে কিছুটা অস্থিরতা চলছে। তাছাড়া আমানতের সুদ হার ৫ থেকে ৬ শতাংশ। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি ৬ শতাংশেরও বেশি। আমানত রাখলে মুনাফা না হয়ে বরং মূলধন কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই তারা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছে।
“মূলত আমানতের সুদ হার কম হওয়ায় মানুষজন সঞ্চয়পত্রকেই নিরাপদ বিনিয়োগ মনে করে।”
বর্তমানে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিবার সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৫২ শতাংশ, পেনশন সঞ্চয়পত্রে ১১ দশমিক ৭৬ শতাংশ সুদ পাওয়া যাচ্ছে।
এছাড়া তিন বছর মেয়াদি মুনাফাভিত্তিক সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ আর ডাকঘর সঞ্চয়পত্রের সুদের হার ১১ দশমিক ২৮ শতাংশ।








