চোখধাঁধানো নকশায় নির্মাণ করা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন একটি মসজিদ। এছাড়া মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষা কমপ্লেক্স হিসেবে রয়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর আধুনিক স্থাপত্যের মেলবন্ধনে নির্মিত এই মসজিদটি দেখতে ও ইবাদত করতে সারা দেশ থেকে দর্শনার্থীসহ ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা প্রতিদিনই ভিড় করছেন।
যার ফলে একেবারে প্রত্যন্ত অঞ্চলটি আলোকিত হয়েছে। মসজিদটি অবস্থিত লক্ষ্মীপুর জেলা শহর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে রামগতি উপজেলার পোড়াগাছা ইউনিয়নের শেখের কিল্লা গ্রামে। মসজিদের ভেতরে নেই কোনো বৈদ্যুতিক বাতি। বাতি ছাড়াই প্রাকৃতিক আলোয় সব সময় উজ্জ্বল ও ফর্সা থাকে মসজিদের অভ্যন্তর। পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আলো মুগ্ধতা ছড়ায় মসজিদের অন্দরে।
নজরকাড়া নকশায় নির্মিত মসজিদটি দেশের অন্যতম স্থাপনাগুলোর মধ্যে অনন্য নজির বলে জানিয়েছেন রামগতি পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর ও আলেকজান্ডার শিশু একাডেমির পরিচালক ছৈয়দ মুর্তাজা আল আমিন। শুধু নকশাতেই নয়, এর কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। দ্বিতল এই মসজিদে কোনো আলাদা জানালা নেই। মসজিদটির নকশাই এমন যে চারদিক থেকে কোনো বাধা ছাড়াই আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে ভেতরে। তবে মুসল্লিদের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য রয়েছে দুটি দৃষ্টিনন্দন দরজা।

রোদে গরমে কেউ পুড়বেন না, বৃষ্টিতেও ভিজবেন না। দিনের বেলায় সামনের পুকুরের পানিতে মসজিদটির প্রতিচ্ছবি এক অপূর্ব দৃশ্যের সৃষ্টি করে, যা দর্শনার্থীদের হৃদয় কেড়ে নেয়। গরমে মসজিদকে শীতল রাখার জন্য ভেতরে রয়েছে পানি সংরক্ষণের চারটি জলাধার। গ্রীষ্মকালে মসজিদকে শীতল রাখতে জলাধারগুলোতে রাখা হয়েছে শীতল পাথর।
দ্বিতল এই মসজিদটির নিচতলা দুই ভাগে বিভক্ত। সামনে রয়েছে মেহরাব ও মসজিদের মূল অংশ। এর পেছনে মাঝ বরাবর গলিপথ এবং দুই পাশে শীতল জলাধার, রোদ ও বৃষ্টির প্রবেশপথ। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জন্য একটি প্রশান্তিময় স্থান তৈরি করতেই মসজিদে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পেছনের অংশে রয়েছে বড় গ্যালারিসহ নামাজের স্থান, যেখানে বসে মুসল্লিরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে ইবাদত করতে পারেন। গ্যালারির পেছন দিক থেকে দোতলায় ওঠার সিঁড়ি রয়েছে। দোতলায় নারীদের নামাজ আদায়ের আলাদা ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মসজিদটির ছাদ প্রচলিত স্থাপনার মতো নয়। পুরো মসজিদের দেয়াল বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় পুরোটা ইটের তৈরি। মূলত ইট দেখা গেলেও এর ভেতরে রয়েছে রড, সিমেন্ট ও ইটের সংমিশ্রণে নির্মিত আরসিসি ঢালাই। পুরো মসজিদে একসঙ্গে প্রায় ৭০০ মুসল্লি জামাতে নামাজ আদায় করতে পারেন।

স্থানীয় রহিমা মমতাজ ও সাইফ সালাহউদ্দিন ট্রাস্টের উদ্যোগে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও জনহিতকর কাজের অংশ হিসেবে এটি স্থাপন করা হয় বলে ট্রাস্ট সূত্রে জানা যায়। ২০১৭ সালে নির্মাণকাজ শুরুর পর ২০২১ সালে কাজ শেষ হলে আর্কি গ্রাউন্ড লিমিটেডের নকশায় নির্মিত মসজিদটি মুসল্লিদের ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
প্রায় ৪ হাজার বর্গফুট আয়তনের এই দ্বিতল মসজিদকে ঘিরেই গড়ে তোলা হয়েছে আস-সালাম হাফেজিয়া মাদরাসা। কোরআনে হাফেজ ও ইংরেজি শিক্ষার সমন্বয়ে এটিকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও শিক্ষা কমপ্লেক্সের অধীনে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
রামগতি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দায়রা বাড়ির সন্তান শাহ মো. শিব্বির বলেন, “এটি শুধু লক্ষ্মীপুর জেলার জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশের জন্য গর্বের বিষয়। এর নকশা ও স্থাপত্য যেন এক নতুন যুগের সূচনা।” মসজিদের খতিব মুফতি হামিদুর রহমান জানান, “মসজিদের নিচতলা ও দোতলায় প্রায় ৭০০ মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।”
কনসালটেন্সি ফার্ম আর্কি গ্রাউন্ড লিমিটেডের চেয়ারম্যান স্থপতি নবী নেওয়াজ খান শমিন বলেন, “মসজিদটির ছাদ প্রচলিত অন্য স্থাপনার মতো নয়। প্রকৃতির সঙ্গে সংযোগ তৈরি করতেই মসজিদটির এমন নকশা করা হয়েছে। প্রাকৃতিক আলো-বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা থাকায় এখানে এসিসহ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার তেমন নেই। ইবাদত করতে আসা মানুষজন সহজেই গভীর প্রশান্তিতে ডুবে যান।”
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘স্বপ্ন নিয়ে’র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক আশরাফুল আলম হান্নান বলেন, “চরপোড়াগাছা ইউনিয়নটি শিক্ষাসহ অবকাঠামোগত দিক থেকে অবহেলিত অঞ্চল। এখানে গড়ে তোলা দৃষ্টিনন্দন আস-সালাম জামে মসজিদ ইতোমধ্যেই দর্শনার্থীদের নজর কেড়েছে। মসজিদকেন্দ্রিক শিক্ষা কমপ্লেক্সে আরবি ও ইংরেজি শিক্ষায় পাণ্ডিত্য অর্জন করে এখানকার শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা আশা করছি।”
লক্ষ্মীপুর প্রেসক্লাবের সিনিয়র সদস্য ও দৈনিক কালের কণ্ঠের জেলা প্রতিনিধি কাজল কায়েস বলেন, “মসজিদটির অবকাঠামো এতটাই আকর্ষণীয় যে বারবার দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা জাগে। সবচেয়ে বড় কথা, মসজিদকেন্দ্রিক একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।”
(এই বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)








