চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বোধোদয়ে ৫০ বছর লাগল বিএনপির

মহান স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ। দেশ স্বাধীনের পঞ্চাশ বছরের এই আয়োজন এবার বেশ ঝাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হচ্ছে। এর আগে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীতে দেশ এভাবে উৎসবে মাতেনি। পঁচিশ বছরের বাংলাদেশের সেই স্বাধীনতা দিবস, সেই বিজয়ের দিনটিকে কেন্দ্র করে বর্ষব্যাপী উৎসবের আয়োজন করা হয়নি। ছিয়ানব্বইয়ে যখন বাংলাদেশের পঁচিশ বছর পূর্তি হয়, তখন ক্ষমতায় ছিলো বিএনপি সরকার। আরও পরিস্কার করে বললে বলতে হয় ক্ষমতায় ছিলো বিএনপি-জামায়াতে ইসলামির চারদলীয় জোট সরকার। সেই সরকারের মধ্যে একাধিক শীর্ষ যুদ্ধাপরাধী থাকার কারণে মহান স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর সেই উৎসবকে জাতীয়ভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে পালন করা হয়নি।

রজতজয়ন্তী বর্ষে যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী, যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদ, যুদ্ধাপরাধী সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, যুদ্ধাপরাধী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীদের প্রভাবে প্রভাবিত বিএনপি সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে বর্ষব্যাপী কোন উৎসবের সূচনা করেনি। কেবল তাই নয়, দল হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে রজতজয়ন্তীর উৎসব পালন করা হয়নি। চারদলীয় জোট সরকারের নেতৃত্বে বেগম খালেদা জিয়ার বিএনপি থাকলেও সেই সরকার ছিলো জামায়াতে ইসলামির প্রভাবে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। মুক্তিযুদ্ধকেও তারা দূরে ঠেলেছিল জামায়াতের সেই প্রভাবে। এই ক্ষত আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়ায়, তাড়িয়ে বেড়াবে অনাগত দিনগুলোতেও।

স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী বর্ষকে বিএনপি যথাযথ গুরুত্ব না দিলেও এবার স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী দলীয়ভাবে বর্ষব্যাপী নানা আয়োজনে পালন করার কথা জানিয়েছে। এ লক্ষ্যে একাধিক কমিটিও করেছে। বিএনপির এই উদ্যোগকে সাদাচোখে ধন্যবাদ জানানোই যায়, কেননা ক্ষমতা হারিয়ে তারা দেশের স্বাধীনতার প্রতি অন্তত কিছুটা হলেও শ্রদ্ধাশীল হতে শিখেছে। দেখে-দেখে শেখা হোক ঠেকায় পড়ে শেখা কিংবা দেখানোর জন্যে যেভাবেই হোক না কেন, এটা ইতিবাচক নিঃসন্দেহে। দেখে-দেখে শেখা বলছি কারণ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের নানা কর্মসূচি আছে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নানা কর্মসূচি আছে। এছাড়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের এই কর্মসূচিগুলোতে গণমানুষের আগ্রহও আছে। গণমানুষের এই আগ্রহ, সরকার ও ক্ষমতাসীন দলের কর্মসূচিগুলো বিএনপিকে অনেকটাই বাধ্য করেছে দলীয়ভাবে কিছু কর্মসূচি গ্রহণের।

দেশ যখন স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে তখন বিএনপির পক্ষ থেকে কোনো কর্মসূচি না থাকলে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে দলটির অবস্থানকে আরও বেশি প্রশ্নের মুখে পড়ত। দলটির মধ্যে পাকিস্তানি ভাবধারার উপস্থিতি, পাকিপ্রেমি নেতাদের উপস্থিতি এবং একাত্তরের বাংলাদেশবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্কের কারণে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তাদের নানা দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেনি। বলা যায়, তারা অনেকটা বেকায়দায় পড়েই এবার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে দলীয় কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বেকায়দায় পড়ে বলছি জোর দিয়েই। কারণ স্বাধীনতার পঁচিশ বছর পূর্তিতে দলটি ক্ষমতায় থাকলেও দলীয় বড়ধরনের কোনো কর্মসূচি ছিলো না। বিএনপি তাদের প্রতিষ্ঠাতা সামরিক শাসক মেজর জিয়াউর রহমানকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ বলে দাবি করে, আর এই দাবিতেই সীমাবদ্ধ থাকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। একাত্তরের নয় মাসের মুক্তিযুদ্ধ যে দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রামের চূড়ান্ত ধাপ এটা তারা প্রকারান্তরে অস্বীকারই করে। এছাড়া স্বাধীনতার ঘোষণার যে অংশ নিয়ে ক্রেডিট ছিনতাইয়ের বিএনপির অপপ্রয়াস সেটা মার্চের সাতাশ তারিখের ঘটনা হলেও তারা ছাব্বিশে মার্চের দিনটিকে স্বাধীনতা দিবসও পালন করে। অবশ্য এটা অস্বীকারের উপায় নাই তাদের কারণ ছাব্বিশে মার্চের বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা বিশ্বস্বীকৃত।

বিজ্ঞাপন

স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিএনপির এই অপরাজনীতি চলে আসছে দীর্ঘদিন ধরেই। এই অপরাজনীতি করতে গিয়ে তারা দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকেই বিকৃত করে চলেছে। এই বিকৃতি এমন পর্যায়ে ছিলো যে তারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়েও বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছে, অপপ্রচার চালিয়েছে। খোদ খালেদা জিয়াও মুক্তিযুদ্ধে শহীদদের সংখ্যা নিয়ে মিথ্যাচার করে ধিক্কৃত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিএনপির এই যখন অবস্থান তখন তারা মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনীতি করে এটা ভাবা কষ্টকর। হয়েছেও তাই। এর ধারাবাহিকতায় ক্ষমতায় থাকাকালে জামায়াতের প্রভাবে তারা স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী বর্ষকে উৎসবে সাজায়নি, বলা যায় অবহেলায় কাটিয়ে দিয়েছে। তবে এখন যখন দেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনে ব্যস্ত, তখন ক্ষমতার বাইরে থাকলেও তারা দলীয়ভাবে এই উৎসবে শামিল হয়েছে। রজতজয়ন্তীবর্ষে তাদের সেই ভূমিকার কথা উল্লেখ করলাম কারণ এটা ইতিহাস হয়ে আছে, এবং চাইলেও এই ইতিহাস মুছে ফেলা সম্ভব না।

যাইহোক, এবার বিএনপির সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন, বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের রেসকোর্সে দেওয়া সেই ভাষণের দিন জাতীয় ঐতিহাসিক দিবসে তাদের কথা বলতে চাওয়ায় অনেকের আপত্তি দেখছি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এটাকে বিএনপির ‘রাজনৈতিক ভণ্ডামি’ বলে আখ্যা দিলেও সুবিবেচনাপ্রসূত মন্তব্যে বিএনপির এই অবস্থানকে গ্রহণ করেছেন তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। এই সুবিবেচনাপূর্ণ রাজনীতি কেবল হাছান মাহমুদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না, এর প্রভাবও পড়তে হবে দলটির সাধারণ সম্পাদকের ওপরও। তা না হলে ভুল ও ইতিহাসকে অস্বীকারের এই প্রবণতা আমাদেরকে কেবলই পেছন টানবে।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে বিএনপির ক্রেডিট ছিনতাইয়ের ব্যর্থ চেষ্টার রাজনীতি আছে অনেকদিন ধরেই। তবে এবার মুক্তির সংগ্রামের অন্যতম ধাপ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাতই মার্চের ভাষণ নিয়ে তারা ইতিবাচকভাবে ভাবতে শুরু করেছে। অন্তত পঞ্চাশ বছর পর হলেও ‘৭ই মার্চ’ বুঝার চেষ্টা করছে বিএনপি। দল ও নেতাদের এই বোধোদয়ের প্রভাব নিশ্চয়ই দলটির তৃণমূলের নেতাকর্মীদের ওপর পড়বে। আর এর পথ ধরে একটা সময়ে আমরা আমাদের জন্মযুদ্ধ একাত্তর ও দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম নিয়ে একটা ইতিহাসই পড়ব, যা সত্যিকার অর্থে সত্যিকারের ইতিহাস।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন