হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনের সীমান্তজুড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ৮০০-তে পৌঁছেছে। এখনো ৩ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় প্রতিকূল আবহাওয়া ও পানির উচ্চতা বাড়ায় উদ্ধারকাজ কঠিন হয়ে পড়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এ পর্যন্ত ৭৮১ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২ হাজার ৫০২ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে চীনের গিরং কাউন্টিতে ১৬ জনের মৃত্যু এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।

হিমবাহ ধসের পর বরফ, পাথর, কাদা ও পানির স্রোত বুধবার হিমালয়ের উপত্যকা ও নদীগুলোতে নেমে আসে। এতে নেপাল ও চীনের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ হয়। রেড ক্রসের হিসাবে, এই দুর্যোগে ৯০ হাজারের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারেন।
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই শনিবার নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর সবচেয়ে ভয়াবহ আন্তঃসীমান্ত দুর্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেন। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, উদ্ধারকাজের জটিলতা ও কঠিনতা নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে।
এদিকে নেপালে ত্রিশূলী নদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির পর নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দা ও উদ্ধারকর্মীদের উঁচু এলাকায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

এর আগে দুর্যোগে সীমান্তবর্তী এলাকায় একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছিল। হ্রদটির পানি উপচে পড়ায় নেপালের লেন্দে খোলা ও ত্রিশূলী নদীতে পানির প্রবাহ বেড়ে যায়। শনিবার সন্ধ্যার মধ্যে হ্রদটির পানি অনেকটাই নেমে গেলেও পরে ড্রোনে ওই এলাকার প্রায় ২ দশমিক ৮ কিলোমিটার ভাটিতে নতুন একটি ভূমিধস শনাক্ত করা হয়। এতে নদীতে নতুন বাঁধ ও জলাধারের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
নেপালে উদ্ধারকাজের বড় অংশ এখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর দিকে কেন্দ্রীভূত হয়েছে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের মধ্যে আপার ত্রিশূলী প্রকল্পে একটি সুড়ঙ্গে প্রায় ৩৫০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

উদ্ধারকাজে নেপালের প্রায় ১০ হাজার সেনা মোতায়েন রয়েছে। তাদের সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষজ্ঞ দলও কাজ করছে। রোববার দুর্গম এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি নিয়ে যায় নেপালের সেনাবাহিনী। একটি সুড়ঙ্গের প্রবেশপথে পৌঁছে উদ্ধারকারীরা ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজ শুরু করেছেন। প্রবেশপথ পরিষ্কার হলে অক্সিজেন সরবরাহ ও ক্যামেরা নিয়ে উদ্ধারকারীরা ভেতরে প্রবেশ করবেন।
দুর্যোগের কয়েক দিন পরও বহু মরদেহ শনাক্ত না হওয়ায় নেপালে গণদাফন শুরু হয়েছে। চিতওয়ান জেলার দেবঘাট এলাকায় বন্যায় ভেসে আসা মরদেহগুলোর জন্য শত শত কবর খোঁড়া হয়েছে।
শনিবার ৯৬টি অজ্ঞাত মরদেহ দাফন করা হয়েছে। রোববার আরও শতাধিক মরদেহ দাফনের পরিকল্পনা রয়েছে। পরিচয় শনাক্তের জন্য মরদেহগুলোর ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ এবং দাফনের স্থান নথিভুক্ত করা হচ্ছে।

নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গে উদ্ধার, ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ সংরক্ষণ এবং পচে যাওয়া মরদেহ শনাক্তকরণের মতো বিশেষায়িত কাজে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
এদিকে চীন জানিয়েছে, তিব্বতে ২৩টি দেশের ২৬১ জন বিদেশি এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে নেপাল, ভারত ও লাটভিয়ার নাগরিকের সংখ্যাও রয়েছে।
চীনা বিশেষজ্ঞদের উদ্ধৃতি দিয়ে সিসিটিভি জানিয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমবাহের অস্থিতিশীলতা থেকেই এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে চীন ২ হাজার ১০০-এর বেশি উদ্ধারকর্মী মোতায়েন করেছে এবং অন্তত ২২ কোটি ইউয়ান বরাদ্দ দিয়েছে।









