চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বুলবুলের মূল্যায়ন হয়নি : সাবিনা ইয়াসমিন

গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও সাবিনা ইয়াসমিন গানের ক্ষেত্রে ছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। সাবিনা ইয়সামিনের গাওয়া অনেকগুলো তুমুল জনপ্রিয় গানের রূপকার ছিলেন বুলবুল। বিশেষ করে দেশের গানে সাবিনা ইয়াসমিনের যত কালজয়ী গান প্রায় সবগুলোতে সম্পৃক্ত ছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সদ্য প্রয়াত সংগীতের কিংবদন্তি আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের জীবদ্দশায় ‘যথাযথ মূল্যয়ন হয়নি’ বলে মনে করেন গানের পাখি সাবিনা ইয়াসমিন। 

চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে আলাপে মঙ্গলবার বিকেলে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বুলবুলকে আমরা সঠিক মূল্য দিতে পারিনি। গানে বুলবুলের প্রতিভা এক বিস্ময়! তার মতো মেধাবীর কোনো দাম দিতে পারিনি।’ যোগ করে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘ছোটবেলায় মাত্র ১৪ বছর বয়সে বুলবুল মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। দুই নম্বর সেক্টরে সৈনিক ছিল সে। সেই হিসেবে তার অনেক কিছু পাওয়ার ছিল, কিন্তু তাও পাননি। আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি, বুলবুল একেবারেই সাধারণ দিনযাপন করতো। তার বাসা ও স্টুডিওতে গেলে এটা বোঝা যায়।’

১৯৭৮ সালে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় সাবিনা ইয়াসমিনের। তখন বুলবুল গিটার বাজাতেন। সে সময় সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বুলবুল আমার কাছে এসে বলেছিল, আপনাকে দিয়ে কয়েকটা গান গাওয়াবো। সুর করে রেখেছি। আমি তখন ততোটা কেয়ার করিনি। বলেছিলেন, এতো ছোট ছেলে তুমি গান করবে কিভাবে? দরকার নেই, পরে হবে ওসব। কিন্তু বুলবুল ছিল নাছোড়বান্দা। একদিন তার গান শুনি। কয়েকটা গান শুনে একদম ‘থ’ হয়ে গিয়েছিলাম। মনে করছিলেন, দেশের গান এত সুন্দর হতে পারে!’

ওই বছরেই (১৯৭৮) আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল এবং সাবিনা ইয়াসমিন প্রথম একসঙ্গে কাজ করেন। সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বিটিভির একটা অনুষ্ঠানের জন্য একসঙ্গে পাঁচটা গান করি আমরা প্রথম। সবগুলোই দেশের গান ছিল। এখনও মনে আছে। অদ্ভুত ছিল সেই সুর! একদম আলাদা সুর। আমাদের দেশে এমন গান তো শুনিনি। আমি অভিভূত হয়ে গিয়েছিলাম।’

Advertisement

বুলবুলের সংগীতে সাবিনা ইয়াসমিন গেয়েছিলেন ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না’, ‘সেই রেল লাইনের পাশে’র মতো কালজয়ী কিছু গান। এ প্রসঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, ‘বুলবুলের প্রতিটি গানের মধ্যে একটা করে ছবি দেখতে পাই। বিশেষ করে দেশের গানগুলো চোখের সামনে ভেসে আসে, আমি ধারণ করি মনের মধ্যে। আমার মনে হয় সেজন্য গানগুলো আজও বেঁচে আছে। মানুষ গ্রহণ করেছে।’

গেল বছর আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সঙ্গে সর্বশেষ দেখা হয়েছিল সাবিনা ইয়াসমিনের। একটি ছবির গানের রেকর্ডিং ছিল। সাবিনা ইয়াসমিনের সঙ্গে ছিলেন এন্ড্রু কিশোর। এরপর আর দেখা হয়নি বুলবুল-সাবিনার। কথা কথায় সাবিনা ইয়াসমিন বললেন, ‘বিটিভিতে যখন নিয়মিত গান করতাম তখন বুলবুলের আরো অনেক ভালো ভালো গান গেয়েছি। সেগুলো বিটিভির কাছে সংরক্ষিত আছে কিনা জানি না। আমি নিজে উদ্যোগী হয়ে কয়েকটি গান নতুন করে করেছি। তা না হলে এতদিন মানুষ গানগুলো শুনতেও পেত না, হারিয়েই যেত। সবগুলো গান সংরক্ষণ করতে পারিনি। আরো কিছু গান রয়েছে। বুলবুলের সঙ্গে কথা হয়েছিল। ১৯৭৮ থেকে ৮০ সালে যে গানগুলো করেছিলাম সেগুলো নিজেই নতুন করে সংরক্ষণ করবো।’

আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল চলে যাওয়ায় গানে যে ক্ষতি হলো, তার শূন্যস্থান কখনই পূরণ হবে না বলে মনে করেন সাবিনা ইয়াসমিন। তিনি বলেন, ‘বুলবুল মাঝেমধ্যে বলতো তার মৃত্যুটা যেন স্বাভাবিক হয়। তাই হয়েছে। যন্ত্রণা, কষ্ট, রোগে পড়ে থাকা ছাড়াই সে চলে গেল। বুলবুলের মতো মিউজিক ডিরেক্টর কখনো আসেওনি, ভবিষ্যতেও আসবে কি না জানি না। তাকে সেলুট জানাই। তার আত্মার শান্তি কামনা করি।’

আজ, মঙ্গলবার ভোরে রাজধানীর আফতাবনগরে নিজ বাসায় হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন বীর মুক্তিযোদ্ধা, গীতিকার, সুরকার ও সংগীত পরিচালক আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল। তারপর তাকে মহাখালীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করা হয়। মৃত্যুকালে আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।

এর আগে ২০১৮ সালের মাঝামাঝি বুলবুলের হার্টে আটটি ব্লক ধরা পড়ে। তার শারীরিক অবস্থার কথা জানতে পেরে চিকিৎসার দায়িত্ব নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রাষ্ট্রপতির পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হন। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের মৃত্যুতে সংগীত অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি দুজনেই শোক প্রকাশ করেছেন।