চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিষণ্ণ দিনের শেষে স্বপ্নিল সন্ধ্যা

বিশ্বকাপ দিনলিপি-৭

ব্রিস্টল থেকে: বর্ষার বৃষ্টি সাহিত্যের বড় অনুষঙ্গ ‍হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে কয়েক শতাব্দী আগেই। সময়ের স্রোতে যা কেবলই প্রবাহমান। ফেসবুকের বিস্তার ঘটার পর সেটির চর্চা হয়ত বহুগুণে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। বৃষ্টি নিয়ে ছড়া, কবিতায় নিজের অনুভূতি বন্ধুদের মাঝে ছড়িয়ে দেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। বৃষ্টি মানেই উদাস মন। তবে মঙ্গলবার সারাদিন ব্রিস্টলে যেভাবে বৃষ্টি ঝরল, তার প্রভাব একদমই ভিন্ন। এখানকার কাউন্টি গ্রাউন্ডে বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কা ম্যাচ পরিত্যক্ত হওয়ায় মঙ্গলবার দিনটি ছিল কেবলই মন খারাপের।

বাংলাদেশ দলের সমর্থকরা কায়মনোবাক্যে চেয়েছিলেন ম্যাচটা হোক। তীব্র ঠাণ্ডা, ঝোড়ো হাওয়া, বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা অপেক্ষায় ছিলেন দীর্ঘক্ষণ। ম্যাচ ভেস্তে যাওয়ায় ‍বিশ্বকাপে বাংলাদেশের সেমিফাইনাল খেলার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা যে কঠিন হয়ে গেল সেটি এখন কারও অজানা নয়। স্টেডিয়ামের মাঠকর্মীকে একজন বাংলাদেশি সমর্থক তো বলেই বসলেন, ‘তোমরা চাইলে আমাদের সাহায্য নিতে পারো, আমরা সবাই মিলে মাঠ শুকিয়ে দেব। ম্যাচটা হোক আমরা চাই, একটা পয়েন্ট হারালে আমাদের সেমিফাইনালে ওঠা কঠিন হয়ে যাবে।’ এ কথা শুনে মুচকি হাসা ছাড়া উপায় ছিল না ওই ব্রিটিশ মাঠকর্মীর। বৃষ্টি থামলে তবেই না মাঠ শুকানোর প্রশ্ন!

বিজ্ঞাপন

ম্যাচটা হোক হৃদয় থেকে চেয়েছিল বাংলাদেশ দল ও সমর্থকরা। বৃষ্টিতে ভেস্তে গেলে পরে সংবাদ সম্মেলনে টাইগার কোচ স্টিভ রোডসও লুকাতে পারেননি হতাশা। মাইক্রোফোনের সামনে বারবার ছেড়েছেন দীর্ঘশ্বাস। মঙ্গলবারের বৃষ্টি যে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে জয় তুলে ২ পয়েন্ট নেয়ার লক্ষ্যটা।

ক্লিফটফের সাসপেনশন ব্রিজ

পেশাদার সাংবাদিক হলেও নিজ দেশের ভালমন্দে স্বাভাবিকভাবে আমরাও প্রভাবিত হই। ব্রিস্টলের বৃষ্টির কান্নায় সেটি আরও প্রকটভাবে ধরা দিল কর্মব্যস্ত দিন শেষে। স্টেডিয়াম থেকে বের হয়ে আমরা ৬ সাংবাদিক মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম কোথাও ঘুরতে যাবো। ব্রিস্টলে আমাদের ধরাবাঁধা ট্যাক্সি ড্রাইভার আজম ভাই জানালেন, কাছাকাছি দর্শনীয় জায়গা ক্লিফটফের সাসপেনশন ব্রিজ।

দূর থেকে চোখ রাখতেই কাটতে লাগল বিষণ্ণতা। এক পাশে পাহাড় ও জঙ্গল, আরেক পাশে ঝুলন্ত ব্রিজ। অ্যাভন নদীর ওপর ১৮৩১ সালে নির্মিত এই ব্রিজটি। অন্যশহর থেকে বাংলাদেশের ম্যাচ দেখতে ব্রিস্টলে আসা কয়েকজন প্রবাসী বাঙালির সঙ্গেও দেখা হল, কথা হল। ব্রিজের আরও কাছে যেতেই সাংবাদিকের দলটা আরও বড় হল।

প্রিয় বাকের ভাইকে ঘিরে বাংলাদেশি সাংবাদিকরা

বিজ্ঞাপন

এর মাঝেই অভূতপূর্ব দৃশ্যপটে অন্যরকম এক আনন্দের অনুভূতি পেলাম গোধূলি বেলায়। ব্রিজের দিকে যখন এগিয়ে আসলেন অত্যন্ত পরিচিত এক মুখ। জনপ্রিয় অভিনেতা ও সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর। বিশ্বকাপের তিনটি ম্যাচ দেখতে এসেছেন ইংল্যান্ডে। ব্রিস্টলেই ছিল তার শেষ ম্যাচ। দেশে ফিরে যাওয়ার আগে ঐতিহাসিক স্থানটিতে এসেছিলেন কিছুটা সময় কাটাতে। বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে তার ক্রিকেটীয় গল্প শেষ হতে হতেই নেমে এল সন্ধ্যা। আন্তরিকতা, সৌজন্যতার যে নজির রেখে গেলেন সবার প্রিয় বাকের ভাই, তা ওই দর্শনীয় স্থানের মতোই মুগ্ধতা জাগানিয়া। সাসপেনশন ব্রিজে দাঁড়িয়ে তিনি মোবাইল-রেকর্ডারের সামনে কথা বললেন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও।

‘বিষণ্ণ একটা দিন। প্রকৃতি যেমন বিষণ্ণ, তেমনি আমরা যারা বাংলাদেশ থেকে খেলা দেখতে এসেছি বা যারা প্রবাসী বাঙালি আছেন, সকলেই বিষণ্ণ হয়ে আছেন। কারণ খেলাটা হয়নি। ম্যাচটা আমাদের জন্য খুব জরুরী ছিল। শ্রীলঙ্কাকে আমরা হারানোর মতো শক্তি রাখি এবং তাতে করে আমরা আজ (মঙ্গলবার) জিতলে অনেকদূর এগিয়ে যেতাম। সেই জায়গাটিতে আমাদের একটা সমস্যা তৈরি হল। ঝুঁকি তৈরি হল।’

সাসপেনশন ব্রিজ

‘আশা করি আমাদের দল আগামীতে আরও ভালো খেলে বাংলাদেশকে একটা শক্তিশালী জায়গায় নিয়ে যাবে এবং আমরা বাংলাদেশ দলটাকে নিয়ে যেন গৌরব করতে পারি। আশা করি সে সুযোগ তারা করে দেবে। সকলের প্রতি শুভেচ্ছা এবং শুভকামনা জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশের ওয়ানডে অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নড়াইল-২ আসনের সাংসদ। ক্রিকেট ও রাজনীতি দুটিই চালিয়ে যাচ্ছেন। আসাদুজ্জামান নূরের আশা ক্রিকেট মাঠের মতোই জনসেবায় অবদান রাখবেন তার অনুজ।

‘সংসদ সদস্য হিসেবে আগামীতে ক্রিকেট খেলা সহজ হবে কিনা জানি না, হয়ত কঠিনই হয়ে যাবে। তবে মাশরাফী আমাদের বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক বড় অবদান রেখেছে এবং অধিনায়ক হিসেবে, একজন ক্রিকেটার হিসেবে অসাধারণ নেতৃত্ব দিয়ে বাংলাদেশকে একটা বড় জায়গায় নিয়ে গেছে। এজন্য তাকে অভিনন্দন জানাই। সংসদে একজন সহযাত্রী হিসেবে পেয়ে নিশ্চিতভাবেই গর্বিত। সংসদ সদস্য হিসেবে ভূমিকা পালন করার সুযোগ সেভাবে এখনও পায়নি। আশা করি ক্রিকেটে যেমন সাফল্য দেখিয়েছে, সংসদ সদস্য হিসেবে তেমন সাফল্য তিনি দেখাবেন।’

বিশ্বকাপ কাভার করতে ইংল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতেই পেয়েছি বৃষ্টির ছোঁয়া। পরদিন লন্ডনের দ্য ওভাল স্টেডিয়ামও স্বাগত জানিয়েছে বৃষ্টির জলে। কার্ডিফ ও ব্রিস্টলে একই অভিজ্ঞতা। ৫ জুন সকালে লন্ডনের বিমানে ওঠার আগে ঢাকায় যে অঝোরধারার বৃষ্টি দেখেছি, এখানে তেমনটা নয় একদমই, এখানে গুঁড়িগুঁড়ি।

ইংল্যান্ডে এখন বর্ষাকাল। বর্ষায় বৃষ্টি আমাদের কাছে স্বাভাবিক মনে হলেও এখানকার স্থানীয়দের কাছে এমন আবহাওয়া বড্ড অচেনা। ইংলিশদের কাছে এটি ‘অস্বাভাবিক আবহাওয়া’। এক সপ্তাহে ইংল্যান্ড এন্ড ওয়েলসের তিনটি শহরে কাটিয়ে ইংলিশ আবহাওয়া সম্পর্কে আমাদেরও ধারণা হতে শুরু করেছে। বুধবার দুপুরে আমাদের গন্তব্য আরেক ভেন্যু টন্টন। ১৭ জুন সেখানে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। যাদের হারিয়ে বিশ্বকাপের আগে আগেই আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজ জিতেছে মাশরাফীর দল। বাংলাদেশের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা।