চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় ইতিহাস গড়লেন আফ্রিকান নারী এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালা

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন আফ্রিকা মহাদেশের দেশ নাইজেরিয়ার সাবেক অর্থমন্ত্রী এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালা।

আন্তর্জাতিক এই সংস্থাটির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দ্বিতীয় স্থানে এগিয়ে থাকা এই নারী সংস্থাটিকে সঠিকভাবেই পরিচালনা করতে পারবেন বলে ধারণা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

কারণ নাইজেরিয়ার রাজনীতির নোংরা জলে বেঁচে থাকার পর, এমনকি তাকে সতর্কবার্তা দেয়ার জন্য তার মাকে অপহরণ করার পরও দেশটিতে তিনি টিকে রয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম বিবিসির এক খবরে এসব তথ্য বলা হয়েছে।

৬৬ বয়সী এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালা আফ্রিকা অঞ্চলের প্রথম নারী হিসেবে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায়র মহাপরিচালক পদে নিযুক্ত হয়েছেন।

বিবিসি বলেছে, সম্প্রতি মার্কিন নাগরিকত্ব পাওয়ার পরও, তিনি নাইজেরিয়ান হিসাবেই নিজেকে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করেন। পছন্দ করেন আফ্রিকান পোশাকই।

তিনি বিবিসিকে ২০১২ সালে বলেছিলেন, একজন কর্মজীবী মা হিসেবে স্কুল পরিচালনার জন্য তিনি একটি ত্রিফদি পোশাক গ্রহণ করেছিলেন। একটি পোশাকে তার ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৫ ডলার।

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা কঠোর পরিশ্রমী শীর্ষ এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে শক্তভাবে নাড়া দেয়া দরকার।

তাদের আলাদা কিছু করা দরকার, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার পক্ষে যথারীতি ব্যবসা করা যাবে না। তাদের এমন কাউকে প্রয়োজন যিনি সংস্কার করতে এবং নেতৃত্ব দিতে ইচ্ছুক।

নাইজেরিয়া পুনর্গঠনে এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালার অবদান:

বিশ্বব্যাংকে তার ২৫ বছরের সময়কালে, তিনি স্বল্প আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। বিশেষ করে ২০১০ সালে দরিদ্র দেশগুলোর জন্য বিশ্বব্যাংকের তহবিলের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) জন্য দাতাদের কাছ থেকে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা হয়েছিল তার নের্তৃত্বেই।

নাইজেরিয়ান হিসেবে তিনি এই বিষয়ে গর্ব বোধ করেন। কারণ বিশেষ করে দুইবার তিনি নাইজেরিয়া রাষ্ট্রপতি ওলুসেগুন ওবাসানজো এবং গুডলাক জোনাথনের অধীনে দেশটির অর্থমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালার অন্যতম বড় অর্জন ছিল একটি দলকে নেতৃত্ব দেয়া, যে দলটি তার দেশের জন্য ২০০৫ সালে ১৮ বিলিয়ন ডলারের বিশাল ঋণ অবলোপন করতে পেরেছিল। যা নাইজেরিয়াকে তার প্রথম ডেট রেটিং পেতে সহায়তা করেছিল।

১৯৮০ এর দশকের গোড়ার দিকে নাইজেরিয়া ঋণ নিয়েছিল। সেই ঋণ পরিশোধে দেরি করায় ১৯৯০ সালে জরিমানাসহ এর পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫ বিলিয়ন ডলারে।

নাইজেরিয়ার বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ বিসমার্ক রিওয়ান এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালার বিষয়ে বলেন, তার অর্থনৈতিক সংস্কার সুদূরপ্রসারী প্রভাবে নাইজেরিয়াকে সঙ্কটকালীন সময়ে বাঁচিয়েছিল।

এর মধ্যে রয়েছে, তেলের দাম বাজেটে যুক্ত করা, যখন তেলের দাম বেশি ছিল তখন দেশকে একটি বিশেষ অ্যাকাউন্টে অর্থ সাশ্রয় করতে দেয়া হয়েছিল।

রেওয়ান বিবিসিকে বলেন, এটি ২০০৮-০৯ সালে নাইজেরিয়ার অর্থনীতিকে বেঁচে থাকতে সহায়তা করেছিল।

শুধু নাইজেরিয়ার জন্যই ওকনজো-আইয়ালা বিশ্বব্যাংকের উচ্চ বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং ওয়াশিংটনে তার পরিবার ছেড়ে চলে গিয়েছেন, যেখানে তার স্বামী নিউরোসার্জন হিসাবে কাজ করেছেন। নাইজেরিয়ায় অন্যান্য মন্ত্রীদের মতো তার কোনও বড় গৃহকর্মী বা গাড়ি বহর ছিল না।

২০১৫ সালে ফিনান্সিয়াল টাইমসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে ওকনজো-আইয়ালা বলেছিলেন, যখন পারতেন তখন তিনি নিজের রান্না নিজেই করতেন।
কোনো বাজে অ্যাপ্রোচ ছিল না তার বলে জানায় প্রতিবেদন।

ওকনজো-আইয়ালার দেশ সংস্কার এবং বিশেষ করে জ্বালানী খাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অভিযান ছিল। সেসময় বিপণনকর্তা হিসাবে কিছু শক্তিশালী আমদানিকারক সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি হিসাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ দাবি করেছিলেন। তারা বলেছিল যে, তারা তেল বিক্রি করেনি। ফলে তাদের লোকসান হয়েছিল।

ওকনজো-আইয়ালার মা কামেন ওকনজো ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক। ২০১২ সালে দক্ষিণ নাইজেরিয়ার তার বাড়ি থেকে ৮২ বছর বয়সে তাকে অপহরণ করা হয়েছিল।

বিজ্ঞাপন

নাইজেরিয়ায় অহরহ অপহরণের ঘটনা ঘটে। সেখানে ভুক্তভোগী পরিবারদেরকে মুক্তিপন দিতে হয় সেসব অপহরণকারীদের।

দেশটির তৎকালীন অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন, অপহরণকারীরা প্রথমে তার পদত্যাগ এবং তারপরে মুক্তিপণের দাবি করেছিল।

তবে ওকনজো-আইয়ালা বলেছেন, তিনি কোনোটিই করবেন না।

তিনি বলেছেন, আমি সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কার্যক্রমে সবচেয়ে বড় স্বার্থান্বেষী মহল তেল বিপণনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান করেছিলাম। তাই মাকে অপহরণ করা হয়েছে।

এক কঠিন পরিস্থিতিতে তার মা ওকনজো পাঁচ দিনের মধ্যে মুক্তি পেয়েছিলেন, তবে তার মেয়ের বিষয়ে অপহরণকারীদের কাছ থেকে বাজে কথা শুনতে হয়েছিল তাকে।

এনগোজি ওকনজো-আইওয়ালর সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত:

এনগোজি ওকনজো-আইয়ালা ১৯৫৪ সালে নাইজেরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৩ থেকে ৭৬ সাল পর্যন্ত হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেন। ১৯৭৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের এমআইটি থেকে পিএইচডি লাভ করেন। এরপর বিশ্বব্যাংকে ২৫ বছর চাকরি করেন। পরে তিনি ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্যস্থাপনা পরিচালক (২য়) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৩-০৬ এবং ২০১১-১৫ এই দুই মেয়াদে তিনি নাইজেরিয়ার প্রথম নারী অর্থমন্ত্রী হন। পরে ২০০৬ সালে দেশটির প্রথম নারী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

টুইটার, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস এবং ইমিউনাইজেশন- এই তিন প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা বোর্ডেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সর্বশেষ তিনি বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মহাপরিচালক পদে নিযুক্ত হন।

দারিদ্র্য সম্পর্কে বাল্যকালের জ্ঞান থেকেই তার এই লড়াইয়ের শুরু। তার বাবা-মা বিদেশে পড়াশুনা করার কারণে নয় বছর বয়স পর্যন্ত তিনি তার নানীর কাছেই ছিলেন।

তিনি ২০১২ সালে বিবিসিকে বলেছিলেন, আমি বাবা-মাকে দেখেছি। কিন্তু তাদের জানা বা বুঝার আগেই তারা প্রায় এক দশক ধরে চলে গিয়েছিল বিদেশে। গ্রামের মেয়ে হিসেবে আমি সব কাজ করতাম। পানি নিয়ে আসতাম। নানীর সাথে সব কাজ করে খামারে যেতাম। এ কারণে আমি দেখেছি দারিদ্র্য বলতে কী বোঝায়।

১৯৬৭-১৯৭০ সালের বায়াফ্রার যুদ্ধের সময় তিনি তরুণী ছিলেন। তার বাবা একজন প্রখ্যাত অধ্যাপক ও বিয়াফ্রান বাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার ছিলেন। তাদের দ্বন্দ্বের সময় তারা সব সঞ্চয় হারিয়েছিলেন তখন।

তিনি বলেন, আমি কষ্ট সইতে পারি। যেকোনো সময় ঠান্ডা ফ্লোরেও আমি ঘুমাতে পারি। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, এমনকি পালকের বিছানায়ও আমি ঘুমাতে পারি।

এই সংকল্প ও স্বাধীনতা তাকে নাইজেরিয়ার অন্যান্য সংস্কার গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়তা করেছিল। রাস্তাঘাট নির্মাণ এবং গ্রামীণ স্কুল এবং ক্লিনিকগুলো পরিচালনার তিনি স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মাসিক অর্থ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তিনি এমন একটি ব্যবস্থাও চালু করেছিলেন, যা হাজার হাজার ভুয়া কর্মী এবং পেনশনধারীদের সরকারি বেতন থেকে সরিয়ে দিতে সহায়তা করেছিল। এতে সরকারের অনেক অর্থ সঞ্চয় হয়।

কিন্তু যখন নাইজেরিয়ার সরকার ২০১২ সালে জ্বালানির ভর্তুকি অপসারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তখন পরিস্থিতি ভাল হয়নি।

এনগোজি ওকনজো-আইয়েলা বলেন, ওই ভর্তুকিটি অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করেছিল। কারণ এতে বছরে ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হচ্ছিল। যা দুর্নীতিকে উৎসাহ দিয়েছিল।

তবে, দেশব্যাপী বিক্ষোভের পরে সরকার পিছিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তখন এই ভর্তুকিটি সরানো হয়েছিল।

টুইটারের পরিচালনা পরিষদ ও গ্যাভি ভ্যাকসিন জোটের সভাপতির দায়িত্ব পালন ছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোভিড-১৯ যুদ্ধের জন্য বিশেষ দূত হিসাবে কাজ করা এই নারী অর্থনীতিবিদ রসিকতা করে বলেন, মহিলারা কম দুর্নীতিগ্রস্থ হয় বলে মনে হয়।

২০০৬ সালে তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্টকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেন, মহিলারা বেশি সৎ আর সোজাসাপ্টা। কাজের প্রতি বেশি মনোযোগী হয়ে থাকে এবং এতে কম অহংকারী হয়। তবে আমি জানি না, এটি কোনও মেয়েলি প্রবৃত্তি কিনা। তবে অর্থনীতি পরিচালনা করা কখনও কখনও পরিবার পরিচালনার মতই মনে হয়।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় তার এজেন্ডায় নারীও রয়েছেন বলে জানান তিনি। তার চাকরির আবেদনে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যেখানে মহিলাদের মালিকানাধীন উদ্যোগকে আনুষ্ঠানিক খাতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বৃহত্তর প্রচেষ্টা করা উচিত, সেখানে নারীদের বৃহত্তর অংশগ্রহণের সুবিধার্থে চ্যালেঞ্জের প্রতিও প্রতিক্রিয়াশীল হওয়া উচিত।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার এফা-চুকওয়ুমা বলেন, আমরা তাকে চাকরি দেয়ার পর তার উপর আস্থা রাখছি যে উন্নয়নশীল দেশগুলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে উপকৃত হওয়ার বিষয়টি তিনি নিশ্চিত করতে পারবেন।

বিজ্ঞাপন