চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিদায় ফুটবল ‘ওস্তাদ’ ওয়াজেদ গাজী

ক্রীড়াঙ্গনে প্রখ্যাত ফুটবল কোচ ওয়াজেদ গাজী ‘ওস্তাদ’ হিসেবেই বেশি স্বীকৃত ছিলেন। এ নামেই সবাই তাকে চিনতেন। প্রায় তিনযুগেরও বেশি সময় ধরে ফুটবলের ‘ওস্তাদ’ হিসেবে তিনি ছিলেন অনন্য একজন। কোচ হিসেবে ফুটবলের প্রতি একাগ্রতা তাকে এই উপাধিতে ভূষিত করেছিল। আসলেই ফুটবলের সাথে এক অভূতপূর্ব প্রেমবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। আর তাই ফুটবলের বাইরে কখনই কিছুই ভাবতেন না। বিত্ত-বৈভব তাকে কাছে টানতো না। যতদিন শরীর ঠিক ছিল, ফুটবলকেই আঁকড়ে ছিলেন। জীবনের শেষ অব্দি ফুটবলের সাথেই ওয়াজেদ গাজীর ছিল আত্মার বন্ধন। আজ সকালে তিনি অনন্তলোকে চলে গেলেন। যশোর শহরের কারবালাতে মেয়ের বাসায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রখ্যাত এই কোচের শেষ ঠিকানা ছিল বড় মেয়ে শহানা ইয়াসমিন বুলুর বাসাতে। গত কয়েক বছর ধরে তিনি অসুস্থ অবস্থায় জীবনযাপন করছিলেন।

সত্তর ও আশির দশকে দেশের অনেক তারকা ফুটবলারেরই উত্থান এই নির্লোভ ওস্তাদের হাত ধরেই। ফুটবলার মঞ্জুু, নান্নু, অলোক, আশিষ, জনি, আলফাজসহ অনেক সাবেক তারকা ফুটবলারই তাকে গুরু হিসেবে পেয়েছেন। যারা এখনও শ্রদ্ধাভরে ‘ওস্তাদ গাজী ভাই’কে স্মরণ করেন। প্রায় তিন দশক ধরে ওয়াজেদ গাজী ছিলেন ফুটবল কোচিং পেশায়। সময়কে জয় করে ‘কোচিং ওস্তাদ’ হিসেবে তিনি খ্যাত হয়ে উঠেছিলেন। জীবনের সবকিছু ত্যাগ করে ফুটবলই ছিল তার ধ্যান-জ্ঞান। আর তাই যতদিন শরীর চলতো ততদিন ফুটবলের উন্নয়নেই নিবেদিত ছিলেন। অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্তও জীবনের প্রতিটি মিনিট, সেকেন্ড সময় তিনি ক্ষয় করেছেন ফুটবলের জন্যেই। ফুটবলের প্রতি ভীষণরকম অনুরক্ত থাকার কারণে বাড়িঘর আর সুখ-স্বাচ্ছন্দ ভুলে বসতি গড়ে তুলেছিলেন ঢাকার ক্লাব পাড়াতেই। ক্লাবেই থাকতেন, ঘুমুতেন, খাওয়া-দাওয়া করতেন। এভাবেই চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় পার করে দেন তিনি ঢাকা ক্লাব পাড়াতে। অবশেষে ২০১৬ সালে বেশি অসুস্থ হয়ে পড়লে ক্লাব আর ফুটবলের সাথে সব প্রেমের সম্পর্ক তার ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে চলে যেতে হয় নিজ বসতি যশোরে।

বিজ্ঞাপন

সত্তর দশকের শেষভাগ থেকে পেশাদার কোচ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ওয়াজেদ গাজী। তবে এর আগে ফুটবল খেলতেন। আলো ছড়িয়ে ছিলেন জাতীয় দলের হয়েও। ফুটবলে হাতেখড়িটা ছিল পশ্চিমবঙ্গের বারাসাতে। বাবার চাকরির সুবাদে ওখানেই থাকতেন। পঞ্চাশ দশকের শেষভাগে কলকাতা লীগে তার অভিষেক ঘটেছিল। ৬৩ সালে কলকাতা মোহামেডানে খেলেন। এরপর বিজিপ্রেস, ওয়ান্ডারার্স, ইপিআইডিসিতে খেলেন। ৭৭ সালে ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিক বিদায় নেন। খেলা থেকে অবসর নিয়ে কোচিং পেশায় আসেন। প্রথমে যশোরে স্থানীয় ক্লাবের হয়ে কোচিং শুরু করেন। ঢাকায় এসে রহমতগঞ্জ স্পোর্টিং ক্লাবের দায়িত্ব নেন। টানা ৮৩ সাল পর্যন্ত রহমতগঞ্জেই কাটান। এরপর দুবছর আরামবাগ ক্লাবের কোচ নিযুক্ত হন। ৮৬ থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংস্থার কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। শুধু দায়িত্ব পালন নয়, তার কোচিং-এ সে সময় লীগে দারুণ আলোড়ন তুলে মুক্তিযোদ্ধা ক্লাব। ১৯৮৭ সালে তিনি জাতীয় দলের কোচ হয়েছিলেন। মাঝে ফরাশগঞ্জ হয়ে ফিরে আসেন ফের আরামবাগে। টানা ২০০২ সাল পর্যন্ত আরামবাগ ক্লাবের কোচিং দায়িত্বে থাকেন। এরপর শেখ রাসেল ক্রীড়া চক্র এবং বিজেএমসি ক্লাবের কোচ হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।

কোচ হিসেবে জীবনের বড় সময় তার অতিবাহিত হয় ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া, আরামবাগ, ব্রাদার্স ইউনিয়ন, মুক্তিযোদ্ধা, শেখ রাসেল ক্লাবে। শেষ দিকে বিজেএমসির উপদেষ্টা কোচ নিযুক্ত হন। ঢাকাতে মাঝারি দলগুলোর কোচিং করাতে তিনি স্বাচ্ছন্দ বোধ করতেন। এ কারণে মোহামেডান-আবাহনী নিয়ে তিনি কখনই আগ্রহ দেখাননি। বিজেএমসির উপদেষ্টা কোচ হিসেবে দায়িত্বরত অবস্থায় ২০১২ সালে অসুস্থ হয়ে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। এসময় যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়ের সহযোগিতায় চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে আবার মাঠে ফেরেন। কিন্তু ২০১৬ সালে ফের তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবার ওয়াজেদ গাজীর পরিবারের সদস্যরা তাকে যশোরে নিয়ে যান। ঠাঁই হয় তার যশোরের কারবালায় বড় মেয়ের বাসাতে।

বিজ্ঞাপন

কোচ ওয়াজেদ গাজী যশোরেই থাকতেন। ভীষণ নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করতেন। অনেকটাই নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকতেন যশোর শহরে কারবালা এলাকায় নাতির মুদী দোকান ‘নিউ মালিহা স্টোর’-এ। যশোর সরকারি মহিলা কলেজের সামনে গেলে ওখানেই তাকে পাওয়া যেত। স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়ার কারণে পুরনো কথাও আর মনে করতে পারতেন না। চলতে-ফিরতেও খুব কষ্ট হতো তার।

সারাজীবন ফুটবলের সাথে থাকার কারণে নিজ সংসারটাকেও তিনি মজবুত করতে ব্যর্থ হন। নানা ঘটনাপ্রবাহে সংসারটাও তার ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। স্ত্রী মারা যান বেশ কয়েক বছর আগে। যশোর শহরে বারান্দিপাড়াতে নিজের যে বাড়িটি ছিল দুই ছেলে মিলে সে বাড়িটাও বিক্রি করে দেয় কয়েক বছর আগে। তার দুই ছেলে হাসান গাজী এবং গাজী আক্তার হোসেন পিতার দায়িত্ব নিতে অপরাগতা দেখান। শেষে ঠাঁই হয় বড় মেয়ে শাহানার বাসাতেই।

শেষ জীবনে প্রখ্যাত এই কোচকে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে বললে ভুল হবে না। অসুস্থ জীবনের দুঃসময়ে অনেকটাই একা হয়ে পড়েছিলেন। আর্থিক অনটনের কারণে তার চিকিৎসা বারবার বিঘ্নিত হয়েছে। ওষুধ-পথ্য ঠিকমতো কিনতে পারেননি। ভালো খেতে পারেননি। পুরো জীবনটা ফুটবলের জন্যে উৎসর্গ করলেও তার দুঃখের দিনে তিনি সেভাবে কারো থেকে সহায়তা পাননি। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন, জেলা ক্রীড়া সংস্থা বা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বা তিনি যেসব ক্লাবে বছরের পর বছর কোচিং করিয়েছেন- কেউই তার পাশে সেভাবে দাঁড়ায়নি। ওয়াজেদ গাজীর নাতি তারিফ হোসেন বাবু গত বছর জানিয়েছিলেন আর্থিক সহযোগিতার জন্যে বাফুফেসহ আরামবাগ, ওয়ান্ডারার্স ক্লাবে চিঠি লিখলেও সেসময় কোনো সাড়া মেলেনি। এ বছরের এপ্রিল মাসে তার পাশে দাড়ায় বাংলাদেশ ফুটবল কোচেস ফোরাম। চিকিৎসার জন্যে তাকে ৫০ হাজার টাকা প্রদান করা হয় সংগঠনের পক্ষ থেকে। এরপর বসুন্ধরা কিংস থেকেও তাকে এক লক্ষ টাকার আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়।

বর্ষিয়ান কৃতি কোচ ওয়াজেদ গাজী পরপারে চলে গেলেও ফুটবল অঙ্গনে তার নামটি স্বর্ণাক্ষরেই লেখা থাকবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম জানবে আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে নির্লোভ অসামান্য একজন ‘ওস্তাদ’ ছিলেন। যিনি জীবনে কিছুই চাননি। শুধু নিজের শ্রম, মেধা আর ভালোবাসা দিয়ে ফুটবলার তৈরি করতে চেয়েছেন। যিনি সত্যিকার অর্থেই ছিলেন ফুটবলের ‘ওস্তাদ’।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে)

Bellow Post-Green View