চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিজেপির ইশতেহার নামক জুমলা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার আসন্ন নির্বাচন উপলক্ষে বিজেপি তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে। এই নির্বাচনী ইশতেহারের বিষয়টি ঘিরে বিজেপি দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নটা এতোটাই তলানিতে ঠেকেছে যে, তাদের ইশতেহার প্রকাশের দিন ভাটপাড়ার এক অটো ড্রাইভার বলে বসলেন; মমতা পাঁচ টাকায় এক বেলা খেতে দেওয়ার কথা বলছেন। আর মোদি পাঁচ টাকাতে তিন বেলা খেতে দেওয়ার কথা বলেছেন। কি বলেন দাদা? আমাদের আর খাওয়া দাওয়ার জন্য কাজকর্ম করবার দরকার নেই। চুপচাপ বসে থাকি। দাদা-দিদিরাই খাইয়ে দেবেন।

বিজেপির এই জুমলাবাজি ঘিরে সাধারণ মানুষদের প্রতিক্রিয়া কি, ওই অটোচালকের কথার ভিতর দিয়েই তা পরিস্কার হয়ে যায়। রাজ্যে ক্ষমতায় এলে বিজেপি সরকারি চাকরিতে মেয়েদের জন্য ৩৩ শতাংশ সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই ৩৩ শতাংশের হিসেব টা বিজেপি প্রয়াত বাম সাংসদ গীতা মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন যৌথ সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন থেকে চৌর্যবৃত্তি করে উপস্থাপিত করেছে। যদি সত্যিই নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন হাতরস খ্যাত বিজেপির থাকত, তা হলে পর পর দুবার একক গরিষ্ঠতা নিয়ে কেন্দ্রে সরকার গড়া বিজেপি সংসদে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের জন্য গীতা মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন যৌথ সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদন কেন আজ পর্যন্ত কার্যকর করেনি? লিঙ্গ রাজনীতির সুবিধা নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও মেয়েদের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়িয়েছেন। এই প্রসঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে একটি ইতিহাস তুলে ধরতে হয়। গীতা মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন জেপিসির সদস্যা মমতা ও ছিলেন। কিন্তু মমতা মাত্র একদিন এই জেপিসির বৈঠকে অংশগ্রহণ করেছিলেন। অটলবিহারী বাজপেয়ীর আমলে প্রায় সাড়ে ছয় বছর কেন্দ্রীয় সরকারের শরিক ছিলেন মমতা। তখন বা এখন, একটিবারের জন্যও কিন্তু তিনি সংসদে মেয়েদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণের উদ্দেশে গীতা মুখোপাধ্যায় কমিটির সুপারিশ কার্যকর করবার দাবি তোলেননি।

বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে মেয়েদের জন্য প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর এস এস স্ত্রী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না। মনুবাদী সংস্কৃতির ধারক বাহক আর এস এসের বিশ্বাস; রান্নাঘর, আঁতুরঘর আর ঠাকুরঘরের বাইরে মেয়েদের আর কোথাও জায়গা নেই। বিজেপি আর এস এসের ই রাজনৈতিক সংগঠন। আর এস এসের রাজনৈতিক শাখা বিজেপি মেয়েদের শিক্ষার জন্য অবৈতনিক ব্যবস্থা কায়েম করবে, যে বিজেপি বাংলা তথা ভারতে নারীর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম অগ্রদূত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি, তার ই নামাঙ্কিত কলেজের ভিতরে ঢুকে ধ্বংস করে, সেই বিজেপি মেয়েদের জন্য কে জি টু পি জি অবৈতনিক শিক্ষাক্রম চালু করবে- এটা প্রাচীন ঢাকার কোচোয়ানদের নিয়ে প্রচলিত প্রবাদ বাক্যকেও হার মানায়।

বামফ্রন্ট সরকার ১৯৭৭ সালে ক্ষমতাসীন হয়েই নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করে। অল্প দিনের ভিতরেই বামফ্রন্ট সরকার কোনো রকম লিঙ্গ বৈষম্য না রেখে মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক স্তরে শিক্ষাকে অবৈতনিক করেছিলেন। পরবর্তীকালে ধাপে ধাপে মেয়েদের জন্য, তপশিলি জাতি-উপজাতি, সংখ্যালঘু, অন্যান্য অনগ্রসর জাতির ( ওবিসি) নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য প্রযুক্তিগত শিক্ষাতে আর্থিক ভার লাঘব করে, সেই ভার সরকারের মাধ্যমে বহন করার প্রথা চালু করেছিলেন। তাই বিজেপি আজ তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই যে প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর স্তর পর্যন্ত মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষার কথা বলছে, সেটিও আজ থেকে অনেককাল আগেই বামফ্রন্ট সরকারের দ্বারা সফলভাবে রূপায়িত একটি কর্মসূচি। এক্ষেত্রেও বিজেপি বামফ্রন্টের অনেককাল আগের কর্মসূচিই টুকেছে।

সমস্ত মহিলাদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য পরিষেবা দেওয়ার কথা বিজেপি তাদের ইশতেহারে জানিয়েছে। ওপিডিসহ যাবতীয় স্বাস্থ্য সংক্রান্ত পরিষেবা তারা মহিলাদের আলাদা করে দেওয়ার কথা বলেছেন।বিজেপির এই প্রতিশ্রুতি দেখে মনে পড়ে যাচ্ছে প্রচলিত একটি বাংলা প্রবাদ; ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই। গোটা দেশের অর্থনীতিকে বিজেপি কেন্দ্রে এককভাবে ক্ষমতায় আসার কমবেশি সাত বছরের ভিতরে একদম শেষ করে দিয়েছে। রান্নার গ্যাস প্রায় হাজার টাকা সিলিন্ডার। পেট্রোল একশো টাকা ছুঁইছুঁই। এই ভয়ঙ্কর অবস্থার ভিতরে কোভিড-১৯ জনিত লকডাউনের সময়ে আমরা দেখেছি কি ভয়াবহ অবস্থার ভিতরে আমাদের দেশের মানুষ আছেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের কি অবর্ননীয় অবস্থার ভিতরে দিন কাটাতে হয়েছে, আমরা দেখেছি। এই অবস্থায় স্বাস্থ্য পরিষেবাতে এতোটুকু সুযোগ না কেন্দ্রের সরকার দিয়েছে, না দিয়েছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়ে এই কোভিড-১৯ জনিত লকডাউনের কালে কেন্দ্র আর রাজ্য পরস্পর তরজাতে ব্যস্ত থাকলেও সাধারণ মানুষের পরিষেবার জন্য এতোটুকু পদক্ষেপ ওই দুটি সরকার তো নেয়-ই-নি, সেই সরকার পরিচালনা করে যে দুটি রাজ্য সরকার, বিজেপি এবং তৃণমূল কংগ্রেস, কেউ ই একফোঁটা যত্নবান হয়নি। তাই এই পরিপ্রেক্ষিতে বিজেপি তাদের ইশতেহারে যখন মেয়েদের জন্য আলাদাভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবার কথা বলে তখন আমাদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নার্সিং হাসপাতালের সেই গালগপ্পের কথাই বেশি করে মনে পড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সমস্ত মহিলাদের বিনা ভাড়ায় রাজ্যে সব রকমের পরিবহন ব্যবস্থায় যাতায়াতের সুযোগ করে দেবে বলে বিজেপি অঙ্গীকার করেছে তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে। বিজেপি একদিকে লাগামহীন ভাবে পেট্রোল, ডিজেলের দাম বাড়াচ্ছে, সংসদকে এড়িয়ে রেলের ভাড়া বাড়াচ্ছে, স্টেশন টিকিটের দাম দ্বিগুণ, তিনগুণ করছে, মেট্রোর ভাড়া বাড়াবার নানারকম চক্রান্ত করছে। সেই বিজেপি রাজ্যে ক্ষমতায় এসে সমস্ত রকম পরিবহনে মেয়েদের জন্য বিশেষভাবে ভাড়া মওকুফ করে দেবে, একথা কি আদৌ বিশ্বাসযোগ্য? রাজ্য সরকারের কি রেলের ভাড়া মওকুফ করবার কোনো রকম আইনি অধিকার আছে? কোনো একটি বিশেষ রাজ্যের জন্য কি ভারতের রেল দপ্তর, একটি বিশেষ লিঙ্গের মানুষদের ভাড়া মওকুফ করতে পারে? সেই ধরণের কোনো সাংবিধানিক সংস্থান কি ভারত সরকারকে দেশের সংবিধান দিয়েছে? একটি রাজ্যে মেয়েদের জন্য যদি রেল ভাড়া মওকুফ করা হয়, তারপর সেই দাবি তো দেশের প্রতিটি রাজ্য থেকেই উঠবে। তখন কি করবে বিজেপি? কেন্দ্রীয় সরকার ই বা কি করবে?

যে রাজ্যগুলিতে বিজেপি ক্ষমতায় আছে, যেমন; ত্রিপুরা, কর্ণাটক, আসাম ইত্যাদি, এইসব রাজ্যগুলিতে পরিবহন ব্যবস্থাতে কি সেখানকার বিজেপি সরকার মেয়েদের জন্য বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক সুবিধা আজ পর্যন্ত চালু করতে পেরেছে? সরকারি রেলকে বেসরকারি হাতে তুলে দেওয়ার সব রকমের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত কেন্দ্রের বিজেপি সরকার। রেলের জন্য যে ধরণের ভর্তুকি সরকারি কোষাগার থেকে এতোকাল দেওয়া হচ্ছিল, নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর, তা কার্যত উধাও। তাই বিজেপির নির্বাচনী ইশতেহারে এই রাজ্যের মহিলাদের জন্য বিশেষ সুবিধার যে প্রতিশ্রুতি তা একদম ভাঁওতা।

‘মিশন আত্মনির্ভর মহিলা’ কর্মসূচির কথা বিজেপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে। এই প্রকল্পে তারা ক্ষমতায় এলে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি ও তারা দিয়েছে। আত্মনির্ভরতার স্লোগান বিজেপি নেতা তথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি কোভিড-১৯ জনিত পরিস্থিতি থেকেই জোর গলায় বলে চলেছেন। প্রায় এক বছর ধরে খোদ প্রধানমন্ত্রীর গলাতে এই আত্মনির্ভরতার কথা শুনে গোটা দেশবাসী এখন ক্লান্ত। সকলের ভিতরেই, এমনকি যারা আর এস এস, বিজেপির উগ্র সমর্থক, তাদের ভিতরেও এই প্রশ্ন জোরদারভাবে উঠতে শুরু করেছে যে, গত এক বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে বিরামহীনভাবে আত্মনির্ভরতার কথা বলে চলেছেন, সেই আত্মনির্ভরতার কতোটুকু আমরা এই সময়ে অর্জন করতে পেরেছি? যেটুকু স্বয়ংসম্পূর্ণতা স্বাধীনতার পর থেকে দীর্ঘ লড়াইয়ের ভিতর দিয়ে ভারতের আমজনতা, বিশেষ করে নারী সমাজ অর্জন করতে পেরেছিল, নরেন্দ্র মোদির বিগত প্রায় সাত বছরের শাসনকালে সেই আত্মমর্যাদা আজ ধুলোয় মিশে গেছে। আমাদের দেশের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক হিসেবে আমরা ভারতবাসীরা এখন আর কোনো ভূমিকা নিতেই সক্ষম নই। ভারতের অর্থনীতি আজ আর এস এস, তাদের রাজনৈতিক সংগঠন বিজেপির দৌলতে আজ মার্কিন দাসানুদাস বিদেশি বহুজাগতিকদের দ্বারা সম্পূর্ণভাবে পরিচালিত হচ্ছে। তাই পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা ভোটের মুখে নিজেদের নির্বাচনী ইশতেহারে যে আত্মনির্ভরতার কথা বিজেপি শুনিয়েছে, সেই কথা বিগত এক বছর ধরে বার বার রাজ্যবাসী খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মুখে শুনেছে। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়েই গোটা দেশবাসীর মতোই পশ্চিমবঙ্গের মানুষ ও বুঝেছে এই ‘আত্মনির্ভরতা’ শব্দের বিজেপিকৃত প্রকৃত অর্থ হলো, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো। তাই ভোট ইশতেহারে বিজেপি যতোই মেয়েদের জন্য আত্মনির্ভরতার ঢাকঢোল পিটুক না কেন, সাধারণ মানুষের কাছে হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী শিবিরের এই ভোট জুমলা ঘিরে ধারণা এবং অবস্থান খুবই পরিস্কার।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন