চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বিচ্ছিন্নতা নয়, সহযোগিতাই হবে কোভিড-১৯ যুদ্ধে আমাদের সহায়ক

সমগ্র বিশ্ব আজ একটি অপরিচিত ও অদৃশ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের মুখোমুখি। এই শত্রু কোনো সীমানা মানছে না বা সম্মান করছে না কোনো বিশেষ শ্রেণিকে এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই শত্রুর বিরুদ্ধে আমাদের ব্যবস্থাগুলোর ভঙ্গুর অবস্থাও প্রকাশ পেয়েছে।

বিগত পাঁচ সপ্তাহ ধরে বিশ্বের অন্য বেশিরভাগ দেশের মতো বাংলাদেশও দ্বৈত সংকটের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। যদিও স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে- আমরা পর্যাপ্ত টেস্টিং কিট -গ্লাভস, মাস্ক, পিপিই সংগ্রহ করেছি। এমনকি আমাদের কিছু উদ্যোক্তা স্থানীয়ভাবে এগুলো উৎপাদন শুরু করেছেন। আমরা স্থানীয়ভাবে ভেন্টিলেটর তৈরির প্রক্রিয়াতেও আছি। আমাদের বেসরকারী খাত হাসপাতালে হাজারও শয্যা স্থাপন করে সরকারকে সহায়তা করছে। ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রতিরক্ষা ও আইন প্রয়োগকারী কর্মীরা সামনে থেকে কাজ করছেন। কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রথমে আমরা বিশাল অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি এবং বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে কেবল ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল এবং জেলাগুলো বন্ধ করতে চেয়েছি। তবে ১৬ এপ্রিল আরও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি, যা আমাদের অর্থনীতিতে একটি সু্পষ্ট প্রভাব ফেলেছে এবং তা দ্রুত প্রকাশ হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে আমরা খুব দ্রুতই বুঝতে সমর্থ হয়েছি যে, এই সংকট আমাদের অর্থনীতিতে চাহিদা এবং সরবরাহ; উভয় ক্ষেত্রে বিরাট ধাক্কা আসবে। এমতাবস্থায়, আমাদের রপ্তানি শিল্পগুলো টিকিয়ে রাখতে হবে এবং গার্হস্থ্য শিল্পগুলোকেও সহায়তা করতে হবে। এই বিবেচনা থেকে আমি ইতোমধ্যে সমাজের জনসংখ্যার বিভিন্ন অংশের জন্য সহায়তা ব্যবস্থা সহ অর্থনীতির বিভিন্ন সেক্টরের জন্য ১১.২৫বিলিয়ন ডলার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছি। এই প্যাকেজের প্রাথমিক ফোকাস হচ্ছে, দেশি ও রপ্তানিমুখী উৎপাদন ও পরিষেবা খাত, ছোট এবং মাঝারি আকারের উদ্যোগগুলো (এসএমই) এবং বর্ধিত সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা এবং কৃষিতে সহায়তা, যে সহায়তা প্যাকেজ আমাদের জিডিপির ৩.৩ শতাংশের সমান।

আমাদের কৃষি কর্মসংস্থানে সর্বাধিক অনানুষ্ঠানিক কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়। কোভিড পরিস্থিতির ফলে সারাদেশে কৃষি খাতে সরবরাহ শৃঙ্খলা ব্যত্যয় ঘটেছে, যা বিরূপ প্রভাব ফেলছে। এই প্রভাব মোকাবিলায় সম্প্রতি ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ৩ বিলিয়ন ডলার কেবলমাত্র কৃষির জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। আমরা ১ মিলিয়ন দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারে সরাসরি নগদ অর্থ হস্তান্তর করতে যাচ্ছি, যার ফলে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মানুষ সহায়তার আওতায় আসবে।

আজ বিশ্ব যে একটি জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে, তাতে আমাদের একটি নতুন ধরনের কৌশল ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন হবে: এমন একটি উৎসাহমূলক দৃষ্টিভঙ্গি যা সকল অংশীদারের মধ্যে বিচ্ছিন্নতার পরিবর্তে সহযোগিতার মনোভাব বাড়িয়ে তুলবে। এটি এমন একটি নীতি বা দৃষ্টিভঙ্গি যা আমরা ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশে অনুসরণ করে আসছি, যখন আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান করেছিলেন, বাংলাদেশ কারো প্রতি বিদ্বেষ পোষণ না করে, সকলের সাথে বন্ধুত্বের নীতি অনুসরণ করবে।

এই প্রসঙ্গে আমি বিশ্বাস করি যে, নিম্নলিখিত পাঁচটি পদক্ষেপ আমাদের সেই কৌশলের দিকে এগিয়ে যেতে সহায়তা করবে:

১.বৈষম্য মোকাবেলার বিষয়ে আমাদের নতুন চিন্তাভাবনা প্রয়োজন

কোভিডের কারণে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণির মধ্যে দারিদ্র্য এবং বৈষম্য দ্রুত বাড়বে। গেলো এক দশকে আমরা আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্ধেক দারিদ্র্যসীমা থেকে বের করে এনেছিলাম। তাদের অনেকে এখন আবার আগের অবস্থানে ফিরে যেতে পারে। আমাদের ৮৫ শতাংশ মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করে। আমাদের এসএমইগুলো খারাপভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এথেকে দক্ষিণ এশিয়া বা এমনকি আফ্রিকার অন্যান্য অঞ্চলে পরিস্থিতিও আলাদা নয়। সুতরাং, বিশ্বকে মানবকল্যাণ, বৈষম্য দূরীকরণ, দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা এবং কোভিড-১৯ এর আগের অর্থনৈতিক অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে নতুন করে ভাবতে হবে।

বিজ্ঞাপন

২. জি-৭, জি-২০ এবং ওইসিডি থেকে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব প্রয়োজন

আমাদের জি-৭, জি-২০ এবং ওইসিডি থেকো বলিষ্ঠ ও বৈশ্বিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। আমি অধ্যাপক সোয়াবকে (বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরোমের প্রতিষ্ঠাতা) প্রশংসা করছি। কারণ তিনি সংক্রামক রোগগুলোকে ২০২০ এর বৈশ্বিক ঝুঁকি সম্পর্কিত প্রতিবেদনে অন্যতম মুখ্য ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। যা বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য খাতে থাকা ক্ষমতাকে যথাযথভাবে তুলে ধরেছে। ফোরামের কোভিড অ্যাকশন প্ল্যাটফর্ম এবং আঞ্চলিক অ্যাকশন গ্রুপগুলো এক্ষেত্রে উদ্যোগকে একধাপ এগিয়ে নিয়েছে। সুতরাং, ফোরাম ও জাতিসংঘের উচিত সরকার এবং বিশ্ব ব্যবস্থাকে এ বিষয়ে একত্রিত করা এবং নেতৃত্ব দেওয়া।

৩. নতুন ব্যবসায়ের নিয়মগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নিতে কৌশল অবলম্বন করা প্রয়োজন

আমরা ইতোমধ্যে বিশ্বব্যাপী ব্যবসা, কাজ এবং উৎপাদনে পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করছি।  কোভিড পরবর্তী সময়ে, নতুন নীতি, স্ট্যান্ডার্ড ও পদ্ধতি দেখবো। ইতোমধ্যে আমরা দেখছি সরবরাহ চেইনে থাকা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডকে যথাযথ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিচ্ছে না। সুতরাং, আমাদের এমন কৌশল ও বাস্তবমুখী সহায়তা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যেন বাংলাদেশের মতো দেশগুলো টিকে থাকতে পারে।

৪. দায়িত্বগুলো ভাগ করে নিতে একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা প্রয়োজন

অভিবাসী শ্রমিকরা সমৃদ্ধ দেশগুলোর সমাজ এবং অর্থনীতিতে অগ্রণী ভূমিকা রাখে। কোভিড এর ফলে তারা হঠাৎ বেকারত্ব সহ খুব কঠিন পরিস্থিতি পার করছে। এটি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতিকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সুতরাং, বোঝা এবং দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার জন্য আমাদের একটি অর্থবহ বৈশ্বিক কৌশল প্রয়োজন। আপনারা অবগত আছেন যে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আমরা আমাদের দায়িত্ব থেকে পালিয়ে যাইনি।আমরা বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবিরের দায়িত্বে আছি এবং আমরা আমাদের সামগ্রিক কোভিড-১৯ কৌশলে প্রায় ১.১ মিলিয়ন রোহিঙ্গা শরণার্থীকেও অন্তর্ভুক্ত করেছি।

৫. ৪আইআর প্রযুক্তি আমাদেরকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে সহায়তা করবে

এক দশক ধরে আমাদের উদ্ভাবিত এটুআই প্রোগ্রাম বাংলাদেশের অর্থনীতির ডিজিটালাইজেশনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।এই মহামারির সময়ে আমরা কার্যকরভাবে বেশকিছু ডিজিটাল প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির ব্যবহার করেছি। যেমন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মোবাইল ফোনের মাধ্যমে সংক্রমণ চিহ্নিত করা। ভবিষ্যতের প্রস্তুতির জন্য আমরা বিভিন্ন সেক্টরে এই রকম উদ্ভাবনীমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি। বিশেষত স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি এবং সরবরাহ চেইনে। চতুর্থ শিল্প বিপ্লব প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ এবং এক যেখানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের মতো একটি সংস্থা সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।

আমরা ইতোমধ্যে জলবায় পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই করছি। এখন একটি নতুন শত্রু করোনাভাইরাস আমাদের অস্তিত্বকে চ্যালেঞ্জ করেছে। কোভিড-১৯ একটি অস্তিত্বের সংকট এবং সংকীর্ণচিত্তের মনোভাব এর বিরুদ্ধে কোনো কাজ করবে না। কোভিড মোকাবিলায় তাই আমাদের প্রত্যেক সমাজের সম্মিলিত দায়িত্ব এবং অংশীদারিত্ব প্রয়োজন হবে।