চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

বাহির বলে দূরে থাকুক

লেখার শিরোনামটা জনপ্রিয় গান থেকে নিতেই হলো। এখনকার জন্য এর চেয়ে যথার্থ লাইন আর পেলাম না। সবাইকে আমরা বলছি, ঘরে থাকুন। তাহলে বাহির নিশ্চয়ই চুপিসারে বলছে, আমার থেকে সবাই দূরে থাকুক! বললেও আমরা তা মোটেই শুনতে পাচ্ছি না। বরং এই অসময়ে বাহিরকে বেশি বেশি ভালোবেসে ফেলছি।

তিন-চার দিন আগে এক দুপুরে ঘুমাচ্ছিলাম। হঠাৎ শোঁ শোঁ শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। জানলা থেকে তাকিয়ে দেখি বিভিন্ন বয়সের অন্তত ১০ জন বাসার পাশের আমগাছ ধরে ঝাঁকাচ্ছে সর্বশক্তি দিয়ে। কাঁচা আম খাবার বিলাসী সেই আয়োজন আমি আসাতেই পণ্ড হলো। সেই সাথে ওদের চোখেমুখে দেখলাম মহা বিরক্তি। ভাবছিলাম, এই দুঃসময়ে জীবনের চেয়ে আম পাড়াটাও জরুরি এদের কাছে!

এ তো কেবল একটা উদাহরণ। এ রকম হাজারটা উদাহরণ নিশ্চয়ই আপনাদের কাছেও আছে। প্রয়োজনে যারা বের হচ্ছেন, তাদের নিয়ে এক শব্দও লিখবো না। নিতান্ত দায়িত্ববোধ আর দেশপ্রেম নিয়ে লড়ে যাচ্ছেন নানান পেশার মানুষ।

আর মুদ্রার অন্য পিঠে আছে এসব কাঁচা আম কিংবা আড্ডা বিলাসী মানুষ! ভাবছিলাম, বয়স নির্বিশেষে সবার বাইরে বের হওয়ার এই অদম্য নেশাটা কেন?

এর কয়েকটা কারণ আমার চোখে ধরা পড়েছে। শুরুর কারণটা নিজেকে অতিমানব ভাবা। সবার হচ্ছে হোক, আমার এ রোগ হবে না। গরীবেরা বলছে, “ওয়া বড়লোকী রোগ”, কিশোররা বলছে, “বুড়োদের রোগ”, কারওয়ান বাজারের পাইকারী ব্যবসায়ী বলছে, ” আমাগো ধরবে না”। রোগ যে এসব কিছুই মানে না, তা এই অতিমানবদের কানে পৌঁছাতে পৌঁছাতে হয়তো অনেক দেরি হয়ে যাবে।

দ্বিতীয় কারণটা নিয়ম ভাঙ্গার প্রতি মানুষের আদি এবং অকৃত্রিম টান। আজকে যদি বলা হয়, ২৪ ঘণ্টা সবাইকে বাইরে থাকতে হবে, দেখা যাবে লোকজন বলবে, “রোদের মধ্যে কেমনে বের হবো!” কিংবা, ” আমার পেট ব্যথা, আজ বাইরে যেতে পারবো না” ইত্যাদি।

তৃতীয় কারণটা কিশোরদের। সার্বক্ষণিক বাবা-মায়ের সিসিটিভি পর্যবেক্ষণের আওতায় থেকে হাঁপিয়ে উঠছে কেউ কেউ। সবজি খাওয়ানো, মোবাইলের কল লিস্ট চেক, সন্ধ্যায় পড়তে বসানো এবং বন্ধুহীনতা অজান্তেই বাইরে ঠেলছে এদের। বাবা-মায়েদের বলবো, আপনার সন্তানকে ভালোবাসা দিয়ে বেঁধে ঘরে রাখার দায়িত্বটা আপনারই।

চতুর্থ কারণটা ব্যাখ্যাতীত। “ভালো লাগে না”, “এমনি এট্টু লকডাউন দ্যাখতে বাইর হইসি”, ” দম বন্ধ লাগে”, “করোনা কেমনে দূর করা যায়, হেইডা সবাই মিল্যা বাইর করতেসি”!! এদেরকে কিছু বলার ভাষা নেই।

পঞ্চম সমস্যা হলো, শত্রু অদৃশ্য। তাই লোকজন নিজেকে শক্তিশালী মনে করছে। করোনাভাইরাস যদি অদৃশ্য না হয়ে বিচ্ছুর মতো কিংবা ছোট সাপের মতো দৃশ্যমান কিছু হতো, তাহলেও লোকজন ভয়ে লাফিয়ে দুই পা সরে যেত। যা দেখা যায় না, তাকে ভয় পেয়ে বাসায় থাকতেও এদের হয়তো লজ্জা করে!

আপনার সুরক্ষার জন্য চিকিৎসক, প্রশাসন,পুলিশ, ব্যাংকার, নিত্যপ্রয়োজনীয় কিংবা ঔষধের দোকানদার সবাই জীবন বাজি নিয়ে বাইরে থাকছে। সেই আপনিই কেন বাইরে? অকারণে বাইরে যাওয়া ঠেকানোর চেয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ আর ষ্পর্শকাতর কাজ এখন প্রশাসন-পুলিশের হাতে আছে।

তাদের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে অসচেতন কিছু মানুষের জন্য। করোনাভাইরাস নীরবে শরীরে ঢুকে গেল পাশে পাবেন তো এইসব আড্ডাবাজ সঙ্গীদের? উত্তরটা জোর গলায় বলি: “না”।

যেখানে সন্তান করোনাভাইরাসের ভয়ে মাকে শালবনে রেখে যেতে পারে, সেখানে রোগীর আপন এই জগতে কে হবে? তাই, প্রয়োজন ছাড়া… বাহিরকে দূরে রাখুন, মন মিশিয়ে ঘরে থাকুন।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)