ছায়ানট ১৯৬৭ সাল থেকে পহেলা বৈশাখে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করে আসছে। সে হিসেবে এ বছর বর্ষবরণ উদযাপনের ৫০ বছর পূর্তি। ছায়ানট তাই আয়োজন করেছে চৈত্র মাসব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের। ২৫ মার্চ ছিল প্রথম অনুষ্ঠান, গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় দ্বিতীয়টি। এ উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডিতে ছায়ানট ভবনে শুরু হয়েছে নববর্ষ উদযাপন অভিযাত্রার স্মরণিক প্রদর্শনী।
ভবন জুড়ে ফুটিয়ে তোলা হয় ছায়ানটের পথচলা ইতিহাস। ভবনের মেঝেতে রমনা বটমূলের আদলে গাছ রেখে তার চারপাশ সাজানো হয় ফুল আর প্রদীপে। ভবনের তৃতীয় তলায় ফুটিয়ে তোলা হয় ১৯৬৭ সাল থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত। যার নাম দেওয়া হয়- সূচনা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধুর হত্যা থেকে স্বৈরতন্ত্রের পতন। এই সময়কালে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের পেপার কাটিং ও দুর্লভ সব ছবি দিয়ে সাজানো হয় চিত্রনাট্য। দর্শনার্থীরা যাতে ছবিগুলো দেখলে উত্তাল সেই সব সময়ে ফিরে যেতে পারে। ১৯৮৮ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত নাম দেওয়া হয় গণতন্ত্রের পুনর্জন্ম।

চতুর্থ তলায় ২০০১ সালের ছবিতে ভরা। রমনা বটমূলে বোমা হামলাকে মনে করিয়ে দিয়ে এ বছরের নাম রাখা হয়েছে সংস্কৃতির ওপর আঘাত। এতে সারিবদ্ধভাবে সাজানো হয় ২০০১ সালে রমনা বটমূলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মুহূর্তকে। হামলার আগে সেখানের পরিবেশ কেমন ছিল, হামলার ঠিক একটু আগে কেমন ছিল জানা যায় এসব ছবি দেখে। হামলার সময়কার ছবি ও হতাহতদের ছবিও রয়েছে। আরও আছে হামলার সময় আতঙ্কিত মানুষের দিগ্বিদিক ছোটাছুটির ছবি। পরদিন জাতীয় পত্রিকাগুলোতে ছাপা হওয়া খবর দেখে অনুমান করা যায় দেশের অবস্থা কতটা থমথমে ছিল। আরও আছে হামলার ঘটনায় করা প্রতিবাদের ছবি।
পঞ্চম তলায় ২০০২ সাল থেকে ২০১৩ সালকে নাম দেওয়া হয়েছে দেশ চেতনায় পুনর্গঠন। ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালকে বলা হয়েছে জঙ্গিবাদ শাসন ও গণতন্ত্রের উত্তরণ। সবগুলো ফ্লোরে স্থান পেয়েছে পত্রিকায় ছাপা হওয়া ও নানাজনের তোলা বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের ছবি।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টায় এসব উদ্বোধনের পাশাপাশি একই সঙ্গে মিলনায়তনে শুরু হয় নৃত্য, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, পাঠ, আবৃত্তি ও গানে সাজানো অনুষ্ঠান। সাংস্কৃতিক আয়োজনের শুরুতেই ছিল সুর-ছন্দ-মূর্ছনার সহযোগে বৃন্দ পরিবেশনা। এরপর বড়দের দল সম্মিলিত কণ্ঠে পরিবেশন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত ‘এবার তোর মরা গাঙে’। বিক্রম দাশের কণ্ঠে গীত হয় ‘যে তোমায় ছাড়ে ছাড়ুক’। সুতপা রায় গেয়ে শোনান দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ‘জীবনটা তো দেখা গেল’, শুক্লা পাল সেতু শোনান রজনীকান্ত সেনের ‘আমি অকৃতি অধম’। তারপর আবার বড়দের দলের কণ্ঠে গীত হয় কাজী নজরুল ইসলামের ‘মোরা ঝঞ্ঝার মত উদ্দাম’।
সুমনা বিশ্বাস আবৃত্তি করেন ‘চিরযাত্রী’ কবিতাটি। নৃত্য সহযোগে বৃন্দ পরিবেশনায় ছিল রবীন্দ্রনাথের মূল গান ও ভাঙা গান। এভাবেই এগিয়ে যেতে থাকে সাংস্কৃতিক পর্ব। একক কণ্ঠে নবনীতা চক্রবর্তী গেয়ে শোনান নজরুলের ‘কাবেরী নদী জলে কে গো বালিকা’, রেজাউল করিম ‘নদীর স্রোতে মালার কুসুম’, নাহিয়ান দূরদানা সূচি ‘দক্ষিণ সমীরণ সাথে’, লতিফুন জুলি অতুপ্রসাদ সেনের ‘আমি যাব না, যাব না’, নাজমুল আহসান তুহিন শোনান পরান ফকিরের ‘তুমি কোন বা দেশে’।
ছোটদের দল সমবেত কণ্ঠে গেয়ে শোনায় আব্দুল লতিফের ‘লাখো লাখো শহীদের রক্তমাখা’। রফিকুল ইসলাম আবৃত্তি করেন কাজী নজরুল ইসলামের ‘প্রবর্তকের ঘুর চাকায়’। ছোটদের দলের এ কে এম আব্দুল আজিজের রচনায় ‘কল কল ছল ছল’। গানটি সম্মিলিত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শেষ হয়।

আগামী ৭ এপ্রিল বিকেল ৫টায় শুরু হবে তৃতীয় আয়োজন। ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে স্মরণিকা ও ১৪২৪ বঙ্গাব্দের বিশেষ বর্ষপঞ্জি প্রকাশ করার পাশাপাশি ওইদিন অনুষ্ঠিত হবে সেমিনার ও সঙ্গীতানুষ্ঠান। ‘সংস্কৃতি সঙ্কট ও সম্ভাবনা’ বিশেষ বক্তব্য উপস্থাপন করবেন মফিদুল হক। আলোচনায় অংশ নেবেন আতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম। সভাপতিত্ব করবেন সনজীদা খাতুন। চতুর্থ অনুষ্ঠানটি হবে চৈত্র সংক্রান্তির দিন ১৩ এপ্রিল। সন্ধ্যা ৬টায় এ অনুষ্ঠানে ২০০১ সালের বটমূলে নববর্ষ অনুষ্ঠানে বোমা হামলায় নিহত নিরীহ দর্শক-শ্রোতাদের স্মরণ করা হবে কথা, গান ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মাধ্যমে।
ছবি : সাকিব উল ইসলাম








