চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ থাকার পরেও ঋণের সুদের হার না কমে উল্টো বাড়ছে

সিঙ্গেল ডিজিট থেকে ডাবল ডিজিট করেছে বিভিন্ন ব্যাংক

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ১৩ এপ্রিল গণভবনে বেসরকারি ব্যাংক মালিকদের ডেকে নিয়ে নির্দেশ দিয়ে বলেছিলেন, বিনিয়োগ বাড়াতে ব্যাংক ঋণের সুদ হার এক অংকে (সিঙ্গেল ডিজিটে) আনতেই হবে। এর প্রায় মাসখানেক আগেও দলীয় এক সভায় একই নির্দেশ দেন তিনি। সেসময় সুদ হার কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে সিআরআর কমানোসহ সরকার থেকে বেশ কয়েকটি অনৈতিক সুবিধা আদায় করে নিয়েছেন ব্যাংক মালিকেরা।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ দেয়ার পর প্রায় ২ মাস অতিবাহিত হলেও ঋণের সুদ হার কমাননি তারা। বরং গ্রাহকদের না জানিয়ে যেসব ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে ছিল, সেগুলো ডাবল ডিজিটে বাড়িয়েছে অধিকাংশ ব্যাংক। আগের নিয়মিত হারের কিস্তি হঠাৎ করে বেড়ে যাওয়াতে চরম বিপাকে পড়েছেন ঋণ গ্রহিতা ও উদ্যোক্তারা।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

গণভবনে সপরিবারে ব্যাংক মালিকেরা (ফাইল ছবি)

তাদের অভিযোগ, ব্যাংকগুলো কম সুদে ঋণ দিতে আকৃষ্ট করে পূর্বপ্রতিশ্রুতি ভেঙ্গে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণা করছে। এখনই ঋণের সুদ না কমলে বিনিয়োগ স্থবির হয়ে যাবে।

ব্যাংকগুলো বলছে, আমানতের সুদ হার বেড়ে যাওয়ায় তারা ঋণের সুদ হার বাড়িয়েছে। কারো না পোষালে তারা ঋণ ফেরত দিয়ে দিক।

অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, গ্রাহককে না জানিয়ে সুদ হার বাড়ানো অনৈতিক। অন্যদিকে সরকারকে ভুল বুঝিয়ে বেসরকারি ব্যাংকগুলো বেশ কয়েকটি সুবিধা নিয়েছে। কিন্তু সুদ হার না কমিয়ে উল্টো বাড়িয়েছে। তবে ব্যাংক মালিকদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও তাদের ফাঁদে সরকারের পা দেয়াটা দু:খজনক।

ব্যাংকগুলো পুরানো ঋণের সুদ হার বাড়িয়ে দেয়ায় বিপাকে পড়েছেন এমন বেশ কয়েকজন গ্রাহক যোগাযোগ করেন চ্যানেল আই অনলাইনের সঙ্গে।

বরিশাল পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মকর্তা খন্দকার মো. আজম, তিনি বেসরকারি ইস্টার্ণ ব্যাংকের (ইবিএল) বরিশাল শাখা থেকে ৭ লাখ টাকা সেলারি লোন (বেতনের বিপরীতে ঋণ) নিয়েছিলেন। কথা ছিল, ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ হারে সুদ দিতে হবে। সেই হিসাবে সুদসহ প্রতি কিস্তি ১৪ হাজার ৮৫৯ টাকা হারে পরিশোধ করে আসছেন তিনি। কিন্তু ২৫ মে তার হিসাব থেকে কিস্তি বাবদ ১৫ হাজার ৪৪২ টাকা কেটে নেয়া হয়। এতে তিনি হিসেব কষে দেখলেন তার ঋণের সুদ হার প্রায় ২ শতাংশ বাড়িয়ে ১২ শতাংশ করা হলো।

কিন্তু কেন সুদ হার বাড়ানো হলো সে বিষয়ে তাকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি ব্যাংক থেকে। পরে তিনি যোগাযোগ করলে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, আমানতের সুদ হার বেড়ে যাওয়ায় ঋণের সুদ হার বাড়ানো হয়েছে।

বেসরকারি আরেকজন চাকরিজীবী গত বছরের অক্টোবরে প্রথম প্রজন্মের একটি ব্যাংক থেকে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ সুদ হারে ২০ লাখ টাকা গৃহ ঋণ নিয়েছিলেন। ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী তিনি কিস্তিও পরিশোধ করছেন। কিন্তু মে মাসে চিঠি দিয়ে ব্যাংক কতৃপক্ষ জানায়, ওই ঋণের সুদ হার আরো আড়াই শতাংশ বাড়িয়ে সাড়ে ৯ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ করা হলো। ফলে তার আগের ১৮ হাজার টাকার কিস্তি এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২২ হাজার টাকা। এতে আয়ের সাথে ব্যয়ের সামাঞ্জস্য মেলাতে না পেরে বিপাকে পড়েন তিনি। পরে ওই ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখায় অভিযোগ করা হলে ব্যাংক থেকে জানানো হয়, ফিক্সড ডিপোজিটের (স্থায়ী আমানতের) সুদ হার বেশি হওয়ায় ও ব্যাংকের প্রয়োজনে ঋণের সুদ হার বাড়ানো হয়েছে।

এই দুই জন গ্রাহকের কথা হলো, আমানতের সুদ বাড়ার পর যেসব ঋণ বিতরণ করা হবে সেসব ঋণের সুদ বাড়াতে পারে। কিন্তু ঋণ নেবার পরে আমানতের সুদ হার বাড়লে তার দায় পুরানো ঋণ গ্রহিতার কাঁধে যাবে কেন?

তাদের অভিযোগ, গ্রাহককে না জানিয়ে এভাবে ঋণের সুদ বাড়ানো গ্রাহকদের সাথে প্রতারণার শামিল। এই প্রতারণার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংককে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী রেজা ইফতেখার চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, এটা ফ্লোটিং ইন্টারেস্ট রেট (প্রয়োজনে সুদ হার বাড়তে বা কমতে পারে)। আমানতের সুদ হার বেড়েছে তাই ঋণের সুদ হারও বেড়েছে। এটা সবার জন্য করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সম্প্রতি বিভিন্ন ব্যাংকে ৪ থেকে ৫ শতাংশ হারে সুদ হার বেড়েছে। কিন্তু আমরা ঋণের সুদ হার মাত্র ২ শতাংশ বাড়িয়েছি।

বিজ্ঞাপন

কিন্তু আমানতের সুদ হার বাড়ার আগে যারা ঋণ নিয়েছেন এই অতিরিক্ত সুদ হার তাদের কাঁধে যাবে কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ইবিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ঋণ গ্রহিতার না পোষালে তাকে বলেন আমাদের ঋণটা পরিশোধ করে দিতে। আমানতের সুদ হার কমলে আমরা ঋণের সুদ হার কমাবো।

গ্রাহককে না জানিয়ে ঋণের সুদ হার বাড়ানো নৈতিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ।

মাহবুবুর রহমান চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, ঋণের সুদ হার বাড়ানোর আগে অবশ্যই গ্রাহককে জানাতে হবে। যেহেতু এসব ঋণে বলা থাকে সুদ হার কমতে বা বাড়তে পারে সে হিসাবে হয়তো আমানতের সুদ হার বেড়ে যাওয়া তা সমন্বয় করা হয়েছে।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান

সরকার এত সুবিধা দেয়ার পরও কেন সুদ হার না কমে উল্টো বাড়ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো আমানত পাচ্ছে স্বল্প সময়ের জন্য। কিন্তু ঋণ দিতে হয় দীর্ঘ সময়ের জন্য। এছাড়া আমানতের সুদ হারও বেড়েছে।

মাহবুবুর রহমান আরো বলেন, সিআরআর কমানোর ফলে কোনো কোনো ব্যাংক হয়ত ১শ বা দেড়শ কোটি টাকা ফেরত পাবে। কিন্তু এটা খুব বেশি নয়। সরকারি আমানতের ৫০ শতাংশের সুবিধা এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে সিআরআর কমানোর খুব বেশি প্রভাব পড়ছে না। এছাড়া এডিআরের সময় সীমা বাড়ানো হলেও এখনও ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারিতে রয়েছে। এডিআর নির্দিষ্ট সীমার মধ্যেই রাখতে হয়।

তিনি বলেন, ৫৭টি ব্যাংকের মধ্যে দুই-একটি ব্যাংকের সমস্যা হলে তার প্রভাব পুরো ব্যাংকিং খাতেই পড়ে। অতএব সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি ব্যাংকের নেতিবাচক প্রভাব এই শিল্পে পড়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী সুদ হার কমানোর জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। সে অনুযায়ী আমরা চেষ্টা করছি। সরকারি আমানতটা পেলে ব্যাংকগুলোর নগদ অর্থের সমস্যা দূর হবে।

খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, সরকার থেকে ব্যাংকগুলো অনেক সুবিধা আদায় করে নিলেও তারা সুদ হার কমায়নি। ছোট আকারের ৮ থেকে ১০টি ব্যাংকে কিছুটার তারল্য সংকট দেখা দিয়েছিল। এটা তারা কলমানি মার্কেট থেকে অর্থ নিয়ে তারল্য সমস্যা সমাধান করতে পারতেন। কিন্তু এই ইস্যুকে কাজে লাগিয়ে তারা অর্থমন্ত্রী বুঝিয়েছেন যে, ব্যাংকিং খাত তারল্য সংকটে ভুগছে। আর সে অনুযায়ী অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত প্রধানমন্ত্রীকে বুঝিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীও তাদের বিষয়টি চিন্তা করে সুযোগ-সুবিধা দিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ।

‘কিন্তু তাদের ভুল বুঝিয়ে এই অনৈতিক সুবিধাগুলো নিয়েছেন ব্যাংক মালিকেরা। অর্থাৎ তারা সরকারের সাথে প্রতারণা করেছে। আর সরকারও তাদের প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়েছেন। অর্থমন্ত্রী যদি এ বিষয়গুলো না বুঝেন তা দু:খজনক।’

গত ৩০ মার্চ তারল্য সংকট মেটাতে ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বাধ্যতামূলক নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে নেয়। এর মাধ্যমে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বের করে নেন ব্যাংক মালিকেরা। একই সাথে সরকারি আমানতের ২৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়। এতে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে রাখার সুযোগ সৃষ্টি হয়।

এছাড়া রেপোর হার (সঙ্কট মেটাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ধারের হার) পৌনে ১ শতাংশ কমিয়ে পৌনে ৭ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার সুযোগ নেয়। পাশাপাশি ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সমন্বয়ের সময়সীমা প্রায় এক বছর বাড়িয়ে নেয়া হয়।

এসব সুবিধা নেয়ার বিপরীতে অর্থমন্ত্রীকে এক মাসের মধ্যেই সুদ হার কমানোর প্রতিশ্রুতিও দেন তারা। কিন্তু প্রতিশ্রুতির প্রায় ২ মাস অতিবাহিত হলেও ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামিয়ে আনা হয়নি। বরং নানা অযুহাতে ক্ষেত্র বিশেষ ঋণের সুদহার বেড়ে ১৫ থেকে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শিল্পঋণের বিপরীতে ঋণের সুদ এখন ১৪ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত। ঋণ প্রক্রিয়াকরণ ফি ও অন্যান্য ফিসহ এ হার এখন ২০ শতাংশের ওপরে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যবসায়িদের নানা প্রচেষ্টায় ঋণের সুদহার কিছুটা কমে আসে। এরপর গত বছরের শেষের দিকে আবার বাড়তে শুরু করে। মূলত তারল্য সংকটের অজুহাতে বাড়ানো হয় সুদহার।