চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

প্রতীকবাদ ও নারীর অচলায়তন

Nagod
Bkash July

প্রায় ২০ বছর আগের কথা, আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সটিটিউটের  ভাস্কর্য বিভাগের ছাত্র। ‘প্রোট্রেট স্টাডি’ ক্লাসে স্যার একটা মজার সাব্জেক্ট দিলেন, তা হলো ‘বনলতা সেন’ এর প্রতিকৃতি নির্মাণ করা। ‘বনলতা সেন’- মহান কবি জীবনান্দ দাসের অমর সৃষ্টি, বনলতা সেনের রোমান্টিক উপস্থাপন বাংলা কবিতার অনন্য অর্জন। কিন্তু, বনলতা সেনের মুখশ্রী- ভাস্কর্যের মাধ্যমে উপস্থাপন কতটা দুরুহ সেই ক্লাসে আমরা টের পেয়েছিলাম। গল্পটা যে কারণে টানলাম, নারীর প্রতীকী উপস্থাপন শিল্প-কলায়, সাহিত্যে, সভ্যতায় যেভাবে এসেছে, বাস্তবের নারী সেখান থেকে বহুদূরেই রয়ে গেছে। অথবা, পুরো বিশ্ব ব্যবস্থা নারীকে প্রতীকী উপস্থাপনের মাধ্যমে বেঁধে ফেলতে চেয়েছে, নারী কেবলই সেই বাঁধন ছিড়ে বেরুবার জন্য নিরন্তর যুদ্ধ করে যাচ্ছে।

Reneta June

প্রতীকবাদকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘সিম্বলিজম’। প্রতীক শব্দটি প্রাচীন গ্রীক শব্দ ‘সিমবুলুম’ থেকে এসেছে ‘সিমবল; পনের শতকে গ্রীকরা কোনো কিছুর ‘বাহ্যিক চিহ্ন’ যা অন্য কিছুকে বোঝায় এরকম ধারণা প্রকাশের জন্য ‘সিম্বল’ শব্দটি লিপিবদ্ধ করেন। তবে ‘সিম্বল’ শব্দ থেকে ‘সিম্বলিজম’ বা প্রতীকবাদ শব্দটি এসেছে আরো অনেক পরে উনিশ শতকের শেষার্ধে ফরাসি, রাশিয়ান  শিল্প আন্দোলনে ‘সিম্বলিজম বা প্রতীকবাদ’ ধারণার ব্যবহার শুরুর মাধ্যমে। প্রতীকবাদ হল একটি বিমূর্ত ধারণা উপস্থাপন করার জন্য কোনও বস্তু বা শব্দ ব্যবহার করার অনুশীলন বা শিল্প। একটি ক্রিয়া, ব্যক্তি, স্থান, শব্দ বা বস্তুর সমস্তটিরই প্রতীকী অর্থ হতে পারে। শিল্পী কোন কিছু স্পষ্টভাবে বলার চেয়ে বরং এটিতে ইঙ্গিত করার জন্য প্রতীকবাদও ব্যবহার করতে পারেন, তাই একটি প্রতীকের একাধিক অর্থ হতে পারে।

উনিশ শতকের শেষ দিকে ফ্রান্স, রাশিয়ান ও বেলজিয়ামের শিল্পী- সাহিত্যিকদের চিন্তা ও কাজের মধ্যে প্রতীকবাদের বা সিম্বোলিজমের উত্থান ঘটে। সিম্বোলিজমের শিল্পীরা নারীকে নানানভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন, এর মধ্যে অত্যন্ত নান্দনিক,প্রেম ও  সম্ভাবনার একটি ইতিবাচক প্রতীক যেমন এসেছে  তেমনি  নারীর যৌনতা এবং কুমারীত্বের মতো দ্বান্দ্বিক বিষয়ের নেতিবাচক উপস্থাপনও  রয়েছে। এই গতানুগতিক ধারা নারীকে যৌন আকাঙ্ক্ষার বাহক হিসাবে- তার শারীরিক ক্রিয়া এবং আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।

এই কাজগুলো সেই সময়ে হয়েছে যখন পুরো ইউরোপ জুড়ে নারীবাদী আন্দোলনগুলি পুনরুত্থান লাভ করেছিল এবং যখন নারীরা কেবলমাত্র পুরুষের পেশা বলে বিবেচিত কাজে যোগ দিচ্ছিল। এটাকে একটা সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া হিসাবে দেখা যেতে পারে, কারণ উনিশ শতকের শেষের দিক অবধি ইউরোপীয় মূলধারার সংস্কৃতিতে  নারীদের ‘প্রতিভা’ মূল্যায়িত হয়নি। মজার বিষয় হচ্ছে যে সব নারী এই প্রথাগত ধ্যান ধারণার বিরুদ্ধে লড়াই করছিলো এবং যারা পেশাদার কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছিলো করেছিল তৎকালীন সমাজে তাদেরকে ‘পুংলিঙ্গ’ হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল। এবং ধরে নেয়া হতো সফল নারী- শিল্পী ও লেখকরা তাদের প্রতিভা প্রকাশের ক্ষেত্রে কিছুটা  নারীত্ব বিসর্জন দিয়েছেন। প্রতীকবাদ যে সবসময়ই নারীর যৌনতার নেতিবাচক উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এমন নয়। রাশিয়ার কিছু প্রতীকবিদ শিল্পী ও সাহিত্যিক  নারীর যৌনতাকে মানবতার মুক্তির সোপান হিসেবে উল্ল্যেখ করেছেন, যেখানে একজন নারীর অন্তর্দৃষ্টি, আধ্যাত্মিকতা, সংবেদনশীলতা, আত্মিক নিয়ন্ত্রণের সমস্ত বৈশিষ্ট্যই মূর্ত হয়েছে। অস্কার উইল্ড এর মত বহু প্রতীকবিদ শিল্পী ও লেখক পুরুষতন্ত্রের বুর্জোয়া নিয়মকে প্রত্যাখান করে নারীবাদী ভূমিকা নিয়েছিলেন। সেজন্য একটি বিকল্প সৃজনশীল সাংস্কৃতিক সম্ভাবনার প্রতীক হিসাবে প্রতীকবাদ তৎকালীন ইউরোপীয় সামাজিক মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ জানাতে সক্ষম হয়েছে এবং নান্দনিকতার  মাধ্যমে নারীত্বের  ধারণার ইতিবাচক প্রয়োগ ও নারীবাদের সম্ভাবনাগুলো তুলে ধরেছে।

যেহেতু প্রতীকবাদ রহস্যময় এবং আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য প্রকাশের জন্য বাহ্যিক উপাদানকে ব্যবহার করেছে, তাই এটি শিল্প সাহিত্যের অনুষঙ্গ ও ধারা হিসাবে উপস্থাপিত হয়েছে। এতো গেলো শিল্পের কথা, কিন্তু নারীর চারপাশের বিশ্বকে বোঝার জন্য ‘সিম্বলিজম’ বা ‘প্রতীকবাদ’ হতে পারে সবচেয়ে সেরা মাধ্যম। নারীকে শৃঙ্খলিত করার জন্য যেমন প্রতীক সৃষ্টি হয়েছে তেমনি নারী মুক্তির জন্যও প্রতীক রয়েছে, নারী নিজে কখনো প্রতীক হয়েছেন, নারীর পোশাকে প্রতীক ছড়িয়েছে, নারীকে অবমাননার জন্য প্রতীকের ব্যবহার হয়েছে। আমাদের চার পাশে ছড়িয়ে থাকা অজস্র প্রতীকের অচলাতয়ন ভেঙে এগিয়ে যাওয়াটাই নারী জীবনের বড় সংগ্রাম।

পৃথিবীর প্রায় সব ধর্মই নারীর পোশাকের বিশেষ নিয়ন্ত্রণ আরোপের প্রতি উৎসাহী ছিল, যার একটি কারণ হতে পারে এসব ধর্মের প্রবর্তক ও প্রচারকগণ ছিলেন পুরুষ। জাতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রচার ও সম্প্রসারণের জন্য নারীরা ঐতিহাসিকভাবে প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে; এবং ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু করা হয়েছে নারীকে। তাই নারীর পোশাকের উপর কড়াকড়ি আরোপটাও একই ধ্যানধারণার বহিঃপ্রকাশ। আপনি কেবলমাত্র নারীর পোশাক দেখেই তার ধর্মীয় ও সংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে ধারণা পেয়ে যাবেন, যা পুরুষের জন্য খানিকটা ব্যতিক্রম। কেবলমাত্র ধর্মীয় পোশাক নয়, সমাজে পুঁজিবাদের বিস্তারে নারীর পোশাক অন্যতম প্রধান প্রতীকের স্থান দখল করেছে। বর্তমান সময়ে আমরা যাকে বলছি কর্পোরেট কালচার, সেখানেও নারীর পোশাক প্রতীক হয়ে উঠেছে।

ভৌগোলিক ও মতাদর্শিক রাজনীতির বিকাশের ফলে বর্তমান বিশ্বে পোশাক নারীর মানসিকতার শক্তিশালী প্রতীক হয়ে উঠেছে! নারীর পোশাক বিতর্ক এতটাই প্রকট যে ইউরোপের মূলধারার গণমাধ্যমে পর্যন্ত এ নিয়ে বিতর্ক চলে। বাঙালি নারীর পোশাক নিয়ে লিখে শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বিতর্কের মুখে পড়েছিলেন। যার মূল কারণ হতে পারে সমাজে প্রতীকবাদী ভাবনার বিস্তার। পাশ্চাত্য সমাজের প্রগতিশীলতা, নারী মুক্তি, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, সৌন্দর্য্য ও আধুনিক চেহারা দেখানোর জন্য নারীর পোশাক যেমন প্রতীক হিসেবে এসেছে, তেমনি আরব বিশেষতঃ মুসলমান নারীদের স্বাধীনতাহীনতার প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে তাদের পোশাক। তবে আরব নেতারা এই দৃষ্টিভঙ্গিকে পাশ্চাত্য নারীবাদ বলে বর্জন করেন এবং রক্ষণশীল পোশাকেই আবদ্ধ থেকেছেন। যদিও, পোশাক ব্যতীত নারীর অন্যান্য স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আরবনীতির পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে।

আমরা যদি অতীত ও বর্তমানের সমাজের দিকে মনোনিবেশ করি তাহলে প্রতীকতায় ভরা একটি বিশ্ব আমাদের সামনে আসবে, যা বিভিন্ন উপায়ে সমাজে নারীর অংশগ্রহণকে প্রতিনিধিত্ব করে। তবে সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, নির্ভীক, কিংবা ধার্মিক- এ সমস্ত প্রতীকী উপস্থাপনা একজন নারীকে কতটা প্রতিনিধিত্ব করে সে কথা আমাদের ভাবতে হবে। আমরা এমন সমাজে বাস করি যেখানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ‘তুমি সুন্দর-শাশ্বত’ বিশেষণ প্রয়োগের মাধ্যমে নারীর কণ্ঠ রোধের রাজনীতি বিদ্যমান আছে। নারীবাদী আন্দোলনগুলো বিভিন্ন প্রতীক ব্যবহারের মাধ্যমে বার বার নারীকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে। নারীবাদী আন্দোলনের প্রথম ধাপে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থায় ‘নারী শক্তি’কে প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছে।  অতি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছে ‘হ্যাস ট্যাগ মি টু’ মুভমেন্ট। সিম্বোলিজম যে ছবি বা চিহ্ন দ্বারা প্রকাশ করা হয় তা নয়। সমাজে অনেক শব্দ আছে যেগুলো নারী মুক্তির পথে অন্তরায়। যেমন ধরুন, একজন নারীর মাসিক বা ঋতুকালীন সময় বোঝাবার জন্য ‘অসুস্থ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু আসলেই কি তাই? একজন প্রজননক্ষম নারীর নিয়মিত মাসিক না হওয়াটাই বরং অসুস্থতা। নারীদের মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় আমাদের সমাজ সংকীর্ণ ও কুসংস্কার মুক্ত হতে পারেনি, মাসিক নিয়ে সব বয়সী নারীদের মানসিক নিপীড়নে ভুগতে হয়। ‘আমার মাসিক বা পিরিয়ড চলেছে’ জনসমুক্ষে এই কথা বলবার মতো সাহসী নারীই কেবল এই দেয়াল ডিঙাতে পারে। এরকম আরো অনেক শব্দ আমাদের সমাজে প্রচলতি যেমন অপয়া, অভাগিনী, অলক্ষ্মী, অলক্ষণা, বন্ধ্যা বা বাঁঝা মেয়ে ইত্যাদি। নারীর অচলাতয়ন ভাঙতে হলে, নারীকেই প্রথম এধরণের শব্দ প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে হবে এবং পুরুষকে বিরত করতে হবে।

প্রতীকবাদ এর মাধ্যমে সমাজের লিঙ্গ বৈষম্য এবং নারীর অভিজ্ঞতার উপস্থাপন গভীরভাবে অনুরণিত হয়। আমাদের সমাজের মেয়েদের ছোটবেলা থেকে চারপাশের কঠিন শর্তাবলীর মধ্যে বেড়ে উঠতে হয়, এর মূল কারণ লিঙ্গ-সমতাহীন বিশ্বে নারী নিজেই শোষিতের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। নারীর সামাজিক ও পারিবারিক শিক্ষায় শিশু কাল থেকে একজন নারীকে উপস্থাপন করা হচ্ছে পুরুষের সহকারী হিসেবে, বড় হয়ে খুব কম মেয়েই এই দেয়াল ভেঙে বেরিয়ে আসতে পারে। নেতৃত্বের ভূমিকাতে আমরা নারীদের যত বেশি দেখবো, তত বেশি নারী তার নিজের স্বাধীনতার প্রতীক হয়ে উঠবে। এটি কেবল বিনোদন জগতের ক্ষেত্রেই নয়, ব্যবসায়, বিজ্ঞাপন, প্রযুক্তি শিল্প এবং এমনকী যুদ্ধ ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

বিশ্বজুড়ে রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান সবজায়গায় নারীর উজ্জ্বল উপস্থিতি গত তিন দশকে যথেষ্ট বেড়েছে। তবুও সবস্তরের নারীদের জন্য ন্যায্যতার ভিত্তিতে সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব এখনো সফল হতে পারেনি। এর জন্য একদিকে পুরুষের পশ্চাদপদতা ও গোড়ামী যেমন রয়েছে, অপরদিকে নারীর আর্থসামাজিক নিরাপত্তার বিষয়টি  সামনে এসেছে। কিন্তু, যে পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থা ২০০০ বছরের বেশী সময়ে নারীর সার্বিক মুক্তি দিতে পারেনি, সে সমাজ আর কতদিনে সেটা পারবে? সিম্বোলিজম বা প্রতীকবাদ আমাদেরকে সে প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবে না, কিন্তু নারী ও তাকে ঘিরে থাকা অচলায়তন বুঝতে ও এর উত্তর খুঁজতে সাহায্য করবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

BSH
Bellow Post-Green View