কারখানা বন্ধ ও একজন শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করাকে কেন্দ্র করে রামপুরা এলাকার তৈরি পোশাক কারখানা ‘আশিয়ানা’র শ্রমিক ও এ খাতের মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক ভাংচুর ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের ৩০ থেকে ৩৫ জন আহত হয়। চুর্ণবিচুর্ণ করা হয় বিজিএমইএ ভবনের নিচ তলার কাচ ও ফুল গাছের টব। বুধবার দুপুরে এই ঘটনা ঘটে।
এ বিষয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ করেছে বিজিএমইএ কর্তৃপক্ষ ও পোশাক শ্রমিকরা।
বিজিএমইএ বলছে, সম্পূর্ণ পরিকল্পিতভাবে শ্রমিকরা বিজিএমইএ ভবনে তান্ডব চালিয়েছে। ব্যাপক ভাংচুর করেছে। কর্মচারীদের পিটিয়ে মারাত্মক আহত করেছে। দুই জন কর্মচারীকে পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সংগঠনটি বলছে, এটি বিজিএমইএর ইতিহাসে একটি ন্যাক্কারজনক ঘটনা। এর উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আর শ্রমিকদের দাবি, বিজিএমইএর কর্মচারিরা শক্তি প্রদর্শন করে নিরীহ শ্রমিকদের উপর হামলা চালিয়েছে। শ্রমিকদের চাকরিচ্যুত ও তাদের বকেয়া বেতন না দেয়ার পরিকল্পনা করেই এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

জানা গেছে, গত মে মাসে রাজধানীর রামপুরা এলাকার ‘আশিয়ানা গার্মেন্ট’ কারখানায় শ্রমিকদের একটি ইউনিয়ন গঠন করা হয়। পরে মালিক পক্ষ তা বাতিল করে দেয়। এর জের ধরেই মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়।
কয়েকদিন ধরেই ওই ইউনিয়নের সাথে যুক্ত থাকা শ্রমিকদের কারখানায় ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। গত ২৮ ডিসেম্বরে ইউনিয়নের সংগঠক মামুন নামের একজন আয়রন ম্যানকে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলা হয় কারখানার উর্ধ্বতন কর্মকর্তার আদেশ পালন না করায় তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হলো। এই ঘটনা জানাজানির পর ক্ষুদ্ধ হয়ে উঠে শ্রমিকরা। তখন শ্রমিকরা প্রতিবাদ করে বলেছিল, শ্রমিক আইন অনুযায়ী তদন্ত করে দোষ পাওয়া গেলে কোনো শ্রমিককে বরখাস্ত করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কোনো তদন্ত ছাড়াই তাকে বরখাস্ত করা হলো কেনো।

এরপর গত দুইদিন আগে কারখানা বন্ধ সংক্রান্ত আইনের ১৩ এর ক ধারা মোতাবেক উৎপাদন কার্যক্রম চালানো যাচ্ছে না বলে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারখানা বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তখন শ্রমিকরা প্রতিবাদ করে। এর পর দুইদিন আগে ঘটনাস্থলে গিয়ে কলকারখানা অধিদপ্তর, বিজিএমইএ, শ্রমমন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা শ্রমিকদের আশ্বস্ত করে বলেছেন, আজ বুধবার বিজিএমইএতে এ বিষয়ে সমাধান দেয়া হবে। সে অনুযায়ী বেলা ১১টার দিকে প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ শ্রমিক বিজিএমইএর সামনে অবস্থান নেয়। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের রামপুরা এলাকার সাধারন সম্পাদক মঞ্জুর মঈনের নের্তৃত্বে শ্রমিকরা সেখানে যায়।
ভবনের সামনে জড়ো হয়ে সকাল থেকেই শ্রমিকরা স্লোগান দিতে থাকে। দুপুরের দিকে সংগঠনটির কর্মচারীরা সেখানে কোনো মিটিং নাই বলে জানায় শ্রমিকদের। এরপরই দুই পক্ষের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এক পর্যায়ে সংঘর্ষে রূপ নেয়। হামলায় জড়িয়ে পড়ে উভয় পক্ষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনের নিচ তলার দুইটি কক্ষের গ্লাস, মূল ফটক ও ওপরে উঠার সিঁড়ি রুমের গ্লাস, বেশ কয়েকটি ফুলের টব, ভবনের উত্তর পাশে উপরের কয়েকটি গ্লাস ভাংচুর করা হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের রামপুরা এলাকার সাধারন সম্পাদক মঞ্জুর মঈন চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, বিজিএমইএর অতিরিক্ত সচিব মনসুর খালেদের নেতৃত্বে এক দল লোক এসে শ্রমিকদের বলেন- এখানে কোনো মিটিং হবে না। কিসের মিটিং, কে দিয়েছে মিটিংয়ের সময়? এর পরই শ্রমিকরা বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। এখান থেকেই ঘটনার সূত্রপাত হয়। এতে বহু শ্রমিক আহত হয়। এখন পর্যন্ত ৩৫ জনক ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করা হয়।

ঘটনার সত্যতা জানতে কয়েকবার ফোন করে মনসুর খালেদকে পাওয়া যায়নি।
সংঘর্ষের বিষয়ে একজন তৈরি পোশাক উদ্যোক্তা চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন, শ্রমিকরা হাতে রড, ও রডের পাইপ, লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করেছে। মাত্র ১০/১৫ মিনিটের হামলায় সব লন্ডভন্ড করে দেয়। কোনো একটা অদৃশ্য শক্তির ইন্ধনেই এই হামলা চালায় তারা।
তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধসের ঘটনায়ও এত বড় হামলা হয়নি বিজিএমইএতে। আজ যা ঘটলো তা অকল্পনীয়। এতে সংগঠনের অনেক ক্ষতি হয়ে গেলো। এই অতর্কিত হামলার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে বিজিএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ নাছির চ্যানেল আই অনলাইনক বলেন, ‘শ্রমিকদের একমাত্র ভরসার জায়গা বিজিএমইএ। সাধারনত শ্রমিকরা বকেয়া পাওনাসহ বিভিন্ন দাবিতে এখানেই আসে। মালিক পক্ষের সাথে সমঝোতা করে শ্রমিকদের সমস্যা সমাধান করে দেয় বিজিএমইএ।’
তিনি বলেন, ‘বিজিএমইএ সব সময় শ্রমিকদের পক্ষে কথা বলে। কিন্তু আজ যে ঘটনা ঘটালো শ্রমিকরা তা পোশাক খাতে বড় ধরনের কলঙ্ক। দুইজন কর্মচারীকে অন্যায়ভাবে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করা হয়েছে। তাদের পঙ্গু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।’
পোশাক খাতের এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘শ্রমিকদের অযৌক্তিক এই তাণ্ডবে শুধু ভবনের নয়, পুরো পোশাক খাতের বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে গেলো। এর একমাত্র উপায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া। আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছি।’








