চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পুলিশের হাঁটু!

ভিত্তি প্রস্তরের পরতে পরতে বৈষম্য, ইটের পর ইট সাজিয়ে যে সুরম্য প্রাসাদ নির্মিত, সুরম্য প্রাসাদের দুইটি ইটের মাঝে সিমেন্ট জমে আছে বৈষম্য। এ বৈষম্য বর্ণের বৈষম্য, অধিকারের বৈষম্য, সমতার বৈষম্য। এ বৈষম্য বাঁচাতে চাওয়ার। এ বৈষম্য মানুষে মানুষে। এ বৈষম্য নিঃশ্বাস নেবার। এ বৈষম্য সমাজের।এ বৈষম্য মনের। এ বৈষম্য যেন চোখের পানি যা আকুল হয়ে ঝরছে। এই বৈষম্য পৃথিবী নামক উপগ্রহের সব দেশের বুকে পাহাড়সম হয়ে চেপে বসেছে। সমাজের সর্বস্তরে চেপে থাকা এই বৈষম্য দিনে দিনে দুর্বিষহ করে তুলছে মানুষের জীবন। বাংলাদেশের কোটালিপাড়া থেকে আমেরিকার মিনিয়াপোলিস সবখানে ক্ষমতা আর বৈষম্যের হাঁটুর প্রদর্শন। পুলিশ হাঁটু গেড়ে বসে ক্ষমতাবানদের সামনে আর ক্ষমতাহীনদের পিঠের হাঁটু নিয়ে চেপে বসে।

বাংলাদেশের পুলিশ হাঁটু দিয়ে আঘাত করে মেরে ফেলে কোটালিপাড়ার নিখিল তালুকদার নামের ৩২ বছরের এক যুবককে। খবর আসে না তেমন একটা সংবাদ মাধ্যমে। সামাজিক মাধ্যমেও ওঠেনা ঝড়। আবার মিনিয়াপোলিসের জর্জ ফ্লয়েডের জন্য সারা বিশ্বে ঝড় ওঠে। তুলকালাম কাণ্ড চলে পৃথিবীর সবথেকে ক্ষমতাসীন দেশে। করনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে হাজার হাজার লাখো মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। প্রতিবাদে প্রতিবাদে প্রকম্পিত হয় আমেরিকার আকাশ-বাতাস, সেই কম্পন ছড়িয়ে গেছে, কানাডা, অস্ট্রোলিয়া, লন্ডন, সুইডেন, প্যারিস, জার্মানিসহ পৃথিবীর নানান দেশে। বাংলাদেশের একশ্রেণীর মানুষ আন্দোলন করে প্রতিবাদে মুখর হয় সুযোগের সন্ধানে, ক্ষমতার কাছাকাছি হতে, আলোচিত বিষয় নিয়ে আন্দোলন করে নিজেকে প্রদর্শনের প্রয়াসে। জর্জ ফ্লয়েড যতটা আমাদের দেশের মানুষের কাছে আলোচিত বিষয়, দুদিন আগে পুলিশের এস আইয়ের হাঁটুর আঘাতে মৃত নিখিল তালুকদার ততটাই অবহেলার। কারণ সেই বৈষম্য।

বিজ্ঞাপন

আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষ নতুন নয়, আর এই বিদ্বেষের জেরে প্রায়শ মৃত্যু ঘটে মানুষের, যার চারভাগের তিন ভাগ্য কৃষ্ণাঙ্গ বর্ণের মানুষ। আমেরিকায় কালো মানুষের প্রতি সহিংসতা দিন দিন বেড়েই চলেছে। যে কেউ চাইলে যখন তখন যে কোন কালো মানুষের নামে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা যায়। আর পুলিশ তাকে যাচাই বাছাই ছাড়া মোটামুটি ছোটখাট বাহিনী নিয়ে গ্রেফতার করতে আসে। যা একজন সাদা আমেরিকানের জন্য প্রয়োগ হয় না তেমন। এখন নিরাপরাধ, নিরস্ত্র কালো মানুষকে পুলিশের গ্রেফতার প্রক্রিয়া তো মনে হতে পারে, সে এই জগতের ভয়ংকরতম অপরাধী। একই স্থানে একজন ভয়ংকর সাদা চামড়ার অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয় অনেকটা জামাই আদরে।

বিজ্ঞাপন

১৭৭৬ সালে সব মানুষের সমতার অঙ্গীকার নিয়ে আমেরিকার যাত্রা শুরু হলেও, আমেরিকানদের সমাজের বাস্তবতা তাদের মাঝেও একটা স্তরবিন্যাসের সূচনা করে। এ স্তরবিন্যাসের সুবিধা পায় পুরুষ আর বঞ্চিত হয় নারী। শ্রেণীবিভেদ তৈরি হয় সাদা, কালো আর আদিবাসী আমেরিকানদের মাঝে। সাদারা উপভোগ করে স্বাধীনতার স্বাদ, আর কালোরা মানুষের মর্যাদাটুকুও পায় না। সমাজ তাদেরকে বিবেচনা করে নিচু স্তরের মানুষ হিসেবে। সেকারণে, “সব মানুষের সমান অধিকার”- এই ধারণাটি কালোদের জন্য প্রযোজ্য হয়নি। যারা আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন তাদের অনেকেই ছিলেন দাসমালিক। মানুষের সমতার এই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার পরও তারা তাদের অধীনস্থ দাসদের মুক্তিও দেননি বা সেটার জন্য তাদের নিজেদের মাঝে কোন অপরাধবোধও কাজ করেনি। কারণ, “মানুষের সমান অধিকার” এই ব্যাপারটির সাথে কালো নিগ্রোদের জীবনের কোন সম্পর্ক আছে বলেই তারা মনে করতেন না।

ভারতীয়দের মত আধুনিক আমেরিকানদের মাঝেও বর্ণবৈষম্যের এই দুষ্টচক্র অনেক কাল ধরে চলে আসছে। আমেরিকার কয়লা খনি এবং ক্ষেত-খামারে কাজ করার জন্য ইউরোপের বিজেতাগণ ষোড়শ শতাব্দী থেকে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত লাখ লাখ আফ্রিকান মানুষকে দাস হিসেবে আমেরিকায় আমদানি করে। নানারকম পরিস্থিতিগত কারণে তারা দাস আমদানির ক্ষেত্রে ইউরোপ বা পূর্ব এশিয়ার দিকে নজর না দিয়ে আফ্রিকার দিকে নজর দিয়েছিল। প্রথমত, ভৌগোলিকভাবে আফ্রিকা ছিল নিকটবর্তী, তাই ভিয়েতনাম থেকে দাস আমদানি করার চেয়ে সেনেগাল থেকে আমদানি করা ছিল ব্যয় সাশ্রয়ী।

যখন আমেরিকানরা দাস আমদানির কথা ভাবা শুরু করল তখন আফ্রিকায় দাস ব্যবসার বাজার ছিল রমরমা। আফ্রিকা থেকে দাসদের রপ্তানি করা হত মধ্যপ্রাচ্যে। অন্যদিকে ইউরোপে তখনও দাস ব্যবসা সেভাবে শুরু হয়নি। ইউরোপে নতুন করে দাস ব্যবসার বাজার তৈরি করার চেয়ে আফ্রিকার চালু বাজার থেকে দাস কেনা আমেরিকানদের জন্য অনেক বেশি সহজসাধ্য ছিল।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল- সেসময় আমেরিকানদের প্রধান উপনিবেশগুলোতে ভার্জিনিয়া, হাইতি এবং ব্রাজিলের মত ম্যালেরিয়া এবং হলুদ জ্বরের প্রাদুর্ভাব ছিল খুব বেশি। এই রোগগুলোর উৎপত্তিস্থল ছিল আফ্রিকা। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে আফ্রিকানদের মাঝে জিনগতভাবেই এসব রোগের বিরুদ্ধে একটা স্বাভাবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। ইউরোপীয়ানদের মাঝে এরকম কোন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় এসব রোগে তাদের নাকাল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল অনেক বেশি। সঙ্গত কারণেই, একজন মালিকের পক্ষে সহজেই রোগাক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কাযুক্ত ইউরোপীয় দাসের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করার চেয়ে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন আফ্রিকান দাসের পেছনে অর্থ বিনিয়োগ করা বেশি লাভজনক ছিল। আশ্চর্যজনকভাবে, একটা উল্টো ঘটনা ঘটল। জিনগত উন্নতি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার বিবেচনায়) পরিণত হল সামাজিক অবহেলায়! আফ্রিকানরা ক্রান্তীয় অঞ্চলের জলবায়ুতে টিকে থাকার ব্যাপারে ইউরোপীয়দের থেকে বেশি দক্ষ ছিল, আর এই কারণেই তারা একসময় ইউরোপীয়ান প্রভুদের দাসে পরিণত হয়। এইসব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমেরিকার সমাজে দুই স্তরের স্তরবিন্যাস প্রকট হয়ে পড়ে, একদল সাদা চামড়ার ইউরোপীয়ান শাসক শ্রেণী আর একদল অবহেলিত কালো চামড়ার আফ্রিকান।

কিন্তু কেবল অর্থনৈতিক লাভ-ক্ষতির কথা চিন্তা করে আফ্রিকার মানুষজনকে দাস বানানো হয়েছিল, এ কথা স্বীকার করে নেয়া মালিকদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতে পারে। আর, ভারতবর্ষের আর্যদের মতই কেবল অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য আমেরিকায় বসবাসরত সাদা চামড়ার ইউরোপীয়ানদেরও পুরোপুরি তৃপ্ত করতে পারেনি। সমাজের অন্যান্য জাত-গোষ্ঠীর কাছে নিজেদেরকে মর্যাদাপূর্ণ করে তোলা তথা নিজেদেরকে জ্ঞানী, ন্যায়পরায়ণ এবং নিরপেক্ষ হিসেবে অন্যের কাছে তুলে ধরাও তাদের একটা অন্যতম লক্ষ্য ছিল। তাদের এই লক্ষ্য পূরণে অন্যতম সহায়ক ভূমিকা পালন করে ধর্মীয় উপকথা এবং বিজ্ঞান দিয়ে মোড়ানো কল্পকাহিনীগুলো। সৃষ্টিতত্ত্বের ব্যাখ্যাকারীরা সাদা কালোর বৈষম্যের ব্যাখ্যা দিলেন এভাবে- আফ্রিকানদের আদি পিতা হলেন হ্যাম। এই হ্যাম নূহের পুত্র। নূহ তার পুত্র হ্যামকে এই বলে অভিশাপ দেন যে, ভবিষ্যতে তার উত্তরসুরীরা সবাই দাস হয়ে জন্ম নেবে। জীববিজ্ঞানীরা দাবি করলেন- কালোরা সাদাদের থেকে কম বুদ্ধিমান এবং মানবিকতা, মূল্যবোধ সম্পর্কে তাদের ধারণাও সাদাদের থেকে কম। চিকিৎসকরা যুক্তিহীন গল্প ফাঁদলেন- কালোরা ময়লা, আবর্জনার মাঝে বসবাস করে এবং তারাই নানারকম রোগব্যাধি ছড়ানোর জন্য দায়ী; এককথায়, কালোরা দূষণের একটি উৎস।

বিজ্ঞাপন

সময়ের সাথে সাথে সাদা কালোর বিভেদের এইসব গল্পগাথা, উপকথাগুলো পশ্চিমা সংস্কৃতির শিরা-উপশিরায় ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই আমেরিকান সংস্কৃতির মাঝে, দেখতে পাই কম বেশি সকল পশ্চিমা সংস্কৃতির মধ্যেই। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে আইন করে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং আটলান্টিক সমুদ্রে সবরকম দাস ব্যবসা বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর পরবর্তী কয়েক দশকে আমেরিকার প্রায় সকল উপমহাদেশেই দাস প্রথা একে একে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হতে থাকে। লক্ষণীয় বিষয় হল, এটিই ছিল ইতিহাসে প্রথমবারের মত এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র দাস মালিকদের নিজস্ব উদ্যোগে দাসপ্রথা বন্ধ হবার ঘটনা। কিন্তু দাসদেরকে মুক্ত করা হলেও দাসপ্রথাকে সমাজে যুক্তিসঙ্গত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার জন্য সমাজে যে গল্প, উপকথা, মতামত চালু হয়েছিল সেগুলো একরকম বহাল তবিয়তেই টিকে থাকল। সমাজে বর্ণবৈষম্যমূলক নানা আইন ও সামাজিক প্রথার মাধ্যমে ভিন্ন বর্ণের মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখা হল।

আর এই ভিন্ন বর্ণের মানুষকে আলাদা আলাদা করে রাখার ফলেই সূচনা হল বৈষম্যের অন্তহীন এক দুষ্টচক্রের। উদাহরণ হিসেবে গৃহযুদ্ধোত্তর দক্ষিণ আমেরিকার কথাই ধরা যাক। ১৮৬৫ সালে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীতে আমেরিকার সংবিধানে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। চতুর্দশ সংশোধনীতে বলা হয়, নাগরিকত্ব এবং আইনগত সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে বর্ণবৈষম্যকে কখনও বিবেচনায় আনা হবে না। কিন্তু, ততদিনে দুইশ বছর ধরে চলে আসা দাসপ্রথার কারণে বেশিরভাগ কালো চামড়ার মানুষরা হয়ে পড়েছে সাদাদের চেয়ে দরিদ্র এবং সাদাদের চেয়ে কম শিক্ষিত। সে কারণে ১৮৬৫ সালে আলাবামায় জন্ম নেওয়া একজন কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের শিক্ষার সুযোগ লাভ বা ভাল চাকরী পাবার সম্ভাবনা একজন শ্বেতাঙ্গ মানুষের চেয়ে অনেকটাই কম ছিল। ফলে ১৮৮০ সাল ও ১৮৯০ সালে জন্ম নেওয়া তার সন্তানেরা সেই একই সামাজিক বৈষম্য নিয়েই জীবন শুরু করেছে। কারণ, তাদেরও জন্ম হয়েছে একটি অশিক্ষিত, দরিদ্র পরিবারে! পুরো ব্যাপারটা অনেকটা দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রের মতই।

এই দুষ্টুচক্রের ধারাবাহিক মননের শিকার জর্জ ফ্লয়েড। করোনা ভাইরাস সংক্রমণে বিধ্বস্ত আমেরিকা। তারই মধ্যে পুলিশি নির্যাতনে কৃষ্ণাঙ্গ নাগরিক জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যুর ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে আমেরিকা। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ পরিণত হয়েছে উন্মত্ত প্রতিবাদে। আই কান্ট ব্রিদ— মৃত জর্জ ফ্লয়েডের শেষ এই কথাগুলোই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদীদের স্লোগান। আমেরিকা জুড়ে প্রতিবাদ ছড়িয়েছে অন্তত ১৪০টি শহরে। ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট ও বোতল বৃষ্টি, পুলিশের গাড়িতে আগুন, দোকানপাটে আগুন ও লুটপাট ছোট বড় শহর‌সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে।

পথচারীর হাতের ক্যামেরায় তোলা ভিডিওটি ভাইরাল হতে সময় লাগেনি। সময় লাগেনি ফুঁসে উঠতে প্রতিবাদে। মিনিয়াপলিসের সাথে সাথে প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে উঠেছে সারা আমেরিকা। জর্জ ফ্লয়েডের জন্য ন্যায় বিচারের জন্যই শুধু নয়। উত্তাল হয়েছে বৈষম্যের বিরুদ্ধে। বর্ণবাদের নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে।

কয়েকবারের প্রচেস্টায় পুরো ভিডিও দেখলাম। দেখলাম একজন কালো চামড়ার মানুষের একবার নিঃশ্বাস নেবার আকুতি আর একজন বিকারহীন সাদা মানুষ, যে হাঁটু দিয়ে রাস্তায় চেপে ধরে রেখেছে হাতকড়া পরা একজন মানুষকে। সাদা চামড়ার পুলিশের চোখেমুখ শান্ত, বেশ ফুরফুরে, পকেটে হাত রেখে জয়েন মজার কিছু দেখছে। বেশ পরিতৃপ্ত চেহারা, নিষ্ঠুর পরিতৃপ্তি খেলা করছিল পুলিশ অফিসারের মুখে। ওর হাঁটুর নিচে ছটফট করে একফোঁটা বাতাসের জন্য আকুতি করতে করতে প্রাণ হারালো তাতে বিন্দু মাত্র বিকার ছিল না। সভ্য দেশে এ কোন অসভ্যতা!!

আট মিনিট ছেচল্লিশ সেকেন্ড। আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে এই সময়টুকু চিরকালের জন্য খোদিত হয়ে গেল। জর্জ ফ্লয়েড বারবার বলতেছিলেন যে তিনি শ্বাস নিতে পারছেন না, আই কান্ট ব্রিদ, যন্ত্রণা কাতর হয়ে মাকে ডাকছিল। নিরস্ত্র জর্জের বিরুদ্ধে অভিযোগ এসেছিলো সে নকল ডলার দিয়েছে দোকানিকে। প্রত্যক্ষদর্শী ও ভিডিও সাক্ষী, জর্জ পালানোর চেষ্টা করেনি, প্রতিবাদ করেনি, এমন কিছুই সে করেনি যাতে তার বিরুদ্ধে এমন কোন পদক্ষেপ নেয়া যায়। হাঁটু দিয়ে ঘাড় চেপে শ্বাসরোধ করে নৃশংস হত্যা প্রমাণ করে, এটা আসলে সম্ভাব্য অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনরক্ষকের পদক্ষেপ নয়, কালো মানুষের বিরুদ্ধে সাদা মানুষের বিদ্বেষ ও ঘৃণার চরম বহিঃপ্রকাশ। বর্ণ বিদ্বেষ বিভিন্নরূপে পৃথিবীর সব দেশে বিরাজমান। করোনার মহামারীর প্রতিষোধক ও টিকা বের হবে হয়ত অচিরে কিন্তু হাজার বছর ধরে চলতে থাকা এই মহামারীর কি কোন প্রতিষোধক বের হবে কোনদিন?

আমাদের সাবকন্টিনেন্টে বর্ণ বৈষম্য নিয়ে ভাষণ দিয়ে বাহবা কুড়িয়ে ছেলের জন্য বউ নির্বাচনে ফর্সা মেয়ে পছন্দ করা হয়, যোগ্যতার বিচারে গায়ের রং প্রাধান্য পায়, মেয়েদের গায়ের কালো রং নিয়ে উচ্ছ্বাসিত সাহিত্য রচণাকারীরা সবাই উজ্জ্বল বর্ণের মেয়েদেরই জীবনসঙ্গী নির্বাচন করেছেন।

কালো নিয়ে সাহিত্যকরা যতই সাহিত্যরচনা করুক, শিল্পী গান গান, কবি কবিতা লিখুক, কালো সে কালোই। কালো চোখ আর কালো চুলের বাইরের, কালো রঙের মানুষ বড় অবহেলার অচ্ছুৎ, অপাঙ্কতেয় বৈষম্যের শিকার পুলিশের হাঁটুর মত।

এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)