চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পুজোর ফুল

ছোটো বেলায় আমার বয়স যখন দুই, বাবার ব্যবসার সুবাদে আমাদেরকে চট্টগ্রামে থাকতে হয়েছে। সেই সময় প্রতিবেশী এক চাচী বেশ বড় একটা থালায় নানান পদের খাবার খেতে দিতেন। মায়ের কাছে সেই গল্প শুনে শুনেই আমি বড় হয়েছি। চাচী তার বাড়ির অন্য সদস্যদের সঙ্গে আমাকেও পেট ভরে খাওয়াতেন। আবার খাওয়া শেষে ঘুমও পাড়িয়ে দিতেন পরম আদরে।

চাচী যখন মন্দিরে পুজো দিতেন, আমাকেও সাথে নিতেন। সেজন্যই হয়তো মন্দিরের পুজো, ঘণ্টির টুং টাং শব্দ আমাকে আজও মোহিত করে। বড়ো বেলায় এসে তাই সন্ধ্যা হলেই সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দিরে পুজো দেখতে যেতে বেশ লাগতো আমার। আবার দুর্গা পূজা আসলে মা-বোনকে সাথে করে মন্দিরের সামনে কাঁচের চুড়ি কেনার হিড়িক পরে যেতো। আজও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি। পরে ভাইদের বিয়ের পর ভাবীদের সাথে নিয়ে একসাথে দুর্গা পূজা দেখতে যেতাম। সে কি আনন্দ!

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বাড়ির পাশেই কালী মন্দির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে কুমারী পুজার সময় বন্ধুরা মন্দিরে যেতাম পুজা দেখতে। লাল শাড়ি, লাল টিপ আর চুড়ি পরে হাজির হতাম মন্দিরে। মন্দিরের গেটে গেলেই একজন দিদি কপালে চন্দনের তিলক এঁকে দিতেন। সেখানে গিয়ে মোম কিনে একটি প্লেটে সাজিয়ে সবাই মিলে সেই মোম জ্বালাতাম। সবার মঙ্গলের জন্য মনে মনে প্রার্থনা করতাম। যখন পুরোহিত মন্ত্র পড়া শুরু করতেন খুব মনোযোগ দিয়ে তা শুনতাম। কখনো কেউ জানতে চায় নি আমি কোন ধর্মের মানুষ!

বিজ্ঞাপন

পুজোর সময় মন্দিরে গেলে কোনোদিন মনেই হতো না আমি অন্য ধর্মের মানুষ। বরং আমার মা আমাদের সবাইকে একসাথে নিয়ে মন্দিরে যেতেন। আমার মায়ের বাবার বাড়ির পাশেই সনাতন ধর্মাবলম্বী অনেক মানুষের বসবাস। তাই আমার মাও তার বাবা- মা মানে আমার নানা-নানুর কাছ থেকেই সেই ধর্মের মানুষকে শ্রদ্ধা করতে শিখেছিলেন। মায়ের জীবনের সেই ছায়া কখন যে আমার জীবনেও দাগ কেটে গেছে; তা টেরই পাইনি।

আমি মনে করি, নানা-নানু আমার মাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই আমি এমন উদার মনের একজন মা পেয়েছি। যিনি আমাদের পরিবারের সবাইকে স্রষ্টার সকল সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা করতে শিখিয়েছেন। মায়ের মনোভাবের কারণেই আমরা সকল ধর্মের মানুষকে ধর্ম দিয়ে নয়; একজন মানুষ রূপেই মূল্যায়ন করতে শিখেছি।

সব ধর্মের মানুষের পারস্পরিক ভালোবাসা এবং শ্রদ্ধায় এগিয়ে যাক বাংলাদেশ- এই প্রত্যাশাই করি।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)