চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পিকে হালদারের মা-সহ ২৫ ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

পিকে হালদারের বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ‘আত্মসাতের’ ঘটনায় তার মা লীলাবতী হালদারসহ ২৫ ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন হাইকোর্ট।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেডের পাঁচ আমানতকারীর করা আবেদনের শুনানি নিয়ে মঙ্গলবার বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এই নিষেধাজ্ঞা দেন।

বিজ্ঞাপন

ওই পাঁচ আমানতকারী হলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামালের মেয়ে ড. নাশিদ কামাল, গৃহিণী সামিয়া বিনতে মাহবুব, মো. তরিকুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক মো. শওকতুর রহমান ও সাবেক রাষ্ট্রদূত রাজিউল হাসান।

এরআগে এই আমানতকারীরা হাইকোর্টে জানান, তারা গণমাধ্যমের খবরে জানতে পারেন পিকে হালদার পিপলস লিজিংয়ের টাকা আত্মসাৎ করেছে। এবং তার অনেক সহযোগী রয়েছেন।

যে ২৫ ব্যক্তির দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা
হাইকোর্ট পিকে হালদারের মা লীলাবতী হালদারসহ যে ২৫ ব্যক্তির দেশত্যাগে আজ নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন তা হলেন: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী, হারুনুর রশিদ (ফাস ফাইনান্স), পি কে হালদারের বন্ধু উজ্জ্বল কুমার নন্দী, সামি হুদা, পি কে হালদারের চাচাতো ভাই অমিতাভ অধিকারী, অবন্তিকা বড়াল, শামীমা (আইএলএফএসএল), রুনাই (আইএলএফএসএল), সাবেক সচিব ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের চেয়ারম্যান এন আই খান, সুকুমার মৃধা (ইনকাম ট্রাক্স আইনজীবী), অনিন্দিতা মৃধা, তপন দে, স্বপন কুমার মিস্ত্রি, অভিজিৎ চৌধুরী, রাজিব সোম, ব্যাংক এশিয়ার সাবেক পরিচালক ইরফান উদ্দিন আহমেদ, অঙ্গন মোহন রায়, নঙ্গ চৌ মং, নিজামুল আহসান, মানিক লাল সমাদ্দার, সোহেল সামস, মাহবুব মুসা, এ কিও সিদ্দিকী, মোয়াজ্জেম হোসেন ও পি কে হালদারের মা লিলাবতী হালদার।

ধারাবাহিক লোকসানে থাকা শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং ২০১৪ সালের পর থেকে আমানতকারীদের কোনো লভ্যাংশ দিতে পারেনি। এরপর ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে দেশের পুঁজিবাজারে কোম্পানিটির শেয়ার লেনদেন বন্ধ। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা বোর্ড ভেঙে নতুন বোর্ড গঠন করে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। কিন্তু এতেও প্রতিষ্ঠানটির সার্বিক অবস্থার উন্নতি না হলে গত বছরের জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটি অবসায়নের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।

এমন দৈন্যদশায় পড়া এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে পিকে হালদারের নামে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়, পিকে হালদার জালিয়াতির মাধ্যমে দেশের কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। যার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো দেউলিয়া হতে বসেছে এবং গ্রাহকের আমানতের টাকা ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। এসবের মাঝেই পিকে হালদার গোপনে দেশ ছাড়ে।

বিজ্ঞাপন

এক পর্যায়ে পিকের বিষয়ে স্বপ্রণোদিত হয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট। সেই সাথে পিকে হালদারকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও তার গ্রেপ্তারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে তা জানতে চান উচ্চ আদালত। অন্যদিকে পিকে হালদারের বিষয়ে স্বপ্রণোদিত রুল জারি হয়েছে জেনে হাইকোর্টের কাছে নিজেদের সীমাহীন কষ্টের কথা বলতে দুদক আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ করেন পিপলস লিজিংয়ের আমানতকারীরা।

তারই ধারাবাহিকতায় গত রোববার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আইনজীবী খুরশীদ আলম খান বিচারপতি মো.নজরুল ইসলাম তালুকদার ও বিচারপতি আহমেদ সোহেলের ভার্চুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চকে বলেন, পিপলস লিজিং এর কয়েকজন আমানতকারী কিছু বলতে চান। একপর্যায়ে অনুমতি নিয়ে ভার্চুয়াল মাধ্যমে যুক্ত হয়ে হাইকোর্টে নিজেদের দুর্দশার কথা বলেন চার আমানতকারী।

সেসময় সামিয়া বিনতে মাহবুব নামের এক আমানতকারী অশ্রুসিক্ত নয়নে হাইকোর্টকে বলেন, ‘মাই লর্ড, আজ আমি একজন ক্যান্সারের রোগী। আমার এখন আর চাকরি নেই। করোনা আসার পর থেকে আমার স্বামীরও চাকরি নেই। আমি আর আমার স্বামী মিলে আমাদের জীবনের কষ্টার্জিত টাকা পিপলস লিজিং এ আমানত রেখেছিলাম। এখন আমারা আমাদের টাকা পাচ্ছি না! এতটা অসহায় হয়ে গেছি যে, এবার বাচ্চাদের স্কুলে ভর্তি করাতে পারিনি। গত ১ বছর বাচ্চাদের একটু মাছ মাংস খাওয়াতে পারিনি। আমারা আর্থিক-মানুষিক কষ্টে মারা যাচ্ছি। আমারা এখন কার কাছে যাব? মাই লর্ড, আপনাদের কাছে আকুল আবেদন আমাদের বাঁচান।’

এদিন সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তাফা কামালের মেয়ে ড. নাশিদ কামাল হাইকোর্টকে বলেন, ‘মাই লর্ড, আমার বাবা এবং আমিসহ পরিবারের ৫ জন পিপলস লিজিং এ টাকা আমানত রেখেছি। আমরা সরল বিশ্বাসে আমাদের টাকাটা রেখেছিলাম। আমারা গণমাধ্যমে জেনেছি পিকে হালদার এখান থেকে টাকা নিয়ে গিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রিত আর্থিক প্রতিষ্ঠান পিপলস লিজিং। তাই এখানকার আমানতকারী হিসেবে আমি আমারা আমাদের টাকাটা ফেরত চাই।’

এরপর বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মো: শওকতউর রহমান হাইকোর্টকে বলেন, ‘মাই লর্ড, দেশটা কি স্বাধীন করেছিলাম এভাবে নিজে প্রতারিত হওয়ার জন্য? আমি আমার আমানতের টাকাটা ফেরত চাই।’

হাইকোর্ট আমানতকারীদের এসব কথা শুনে আদালত পিকে হালদারের বিষয়ক শুনানিতে এদের পক্ষভুক্ত করে নেন। সেই সাথে এফিডেভিট আকারে আমানতকারীদের এই বক্তব্য আদালতে দাখিল করতে বলা হয় এবং পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ৫ জানুয়ারি দিন ধার্য করেন।

সে ধারাবাহিতায় আজ বিষয়টি শুনানির জন্য আসে। এইদিন ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ আমানতকারী হলফনামা দিয়ে আদালতকে বলেছেন যে, পি কে হালদারের সাথে এদের যোগাযোগ আছে। অর্থপাচারের সাথে এই ২৫ জন জড়িত।’

আজ আদালতে দুদকের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিন উদ্দিন মানিক। তার সাথে ছিলেন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল মাহজাবিন রাব্বানী দীপা ও আন্না খানম কলি।