চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ
Partex Group

পাতালে হাসপাতালে নতুন করে পুরনো গল্প

Nagod
Bkash July

সময় বিকাল ৩টা, ২০ মে ২০১৫। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে গেলাম একজন রোগী নিয়ে। ১০ টাকায় টিকেট কেটে ১ নম্বর রুমে দায়িত্বরত ডাক্তারের পরামর্শে গেলাম পাশের ইমার্জেন্সি অপারেশন থিয়েটারে। কাটা-ছেঁড়ার রুমে। এবার ইন্টার্নি ডাক্তারের হাতে। সেখানে মাথায় স্বার্ফ পরা তরুণী ডাক্তার খুব নম্র ব্যবহারে আমার রোগীর কাছে জানতে চাইলেন সমস্যা কি। উনাকে বলা হলো, কাজ করতে গিয়ে অসতর্কতায় পায়ের তালুতে বটি লেগেছে। একটু বেশিই কেটেছে। সেলাই লাগবে মনে হয়। উনি কাপড়ের বাঁধন খুলে দেখলেন এবং রুমের মধ্যে একটি খাটে অপেক্ষা করতে বললেন। এর মধ্যে অফিসিয়াল ফরমালিটি সারলেন। আমাকে বললেন, বাবা এই দু’টি ইনজেকশন বাইরে থেকে নিয়ে আসেন।

বাবা ডাকাতে আমি শরম পাইনি। এর আগে ১৬/১৭ বছরের একটি ছেলেকে ওষুধ বুঝিয়ে দিতেও তিনি তাকে বাবা ডেকেছেন। আমি বরং অবাক হচ্ছি ক’মাস আগে এখানে ওয়ার্ডে এক রোগী ভর্তি করে ইন্টার্নি ডাক্তারদের ক’জনের যে মেজাজ আর ব্যবহার দেখেছি সে তুলনায় এই মেয়েকে তো মনে হচ্ছে বিদেশী ডাক্তার!

এরমধ্যে আসলো একজন বুলেটবিদ্ধ লোক, কিছু আসলো মারামারি করে কাটা-ছেঁড়া। ব্যাপক হৈ চৈ ভেতরে। আমি ইনজেকশন এনে দিলাম। ডাক্তারদের উল্টো দিকে নার্সের টেবিলে বসা নীলা ড্রেসপরা ব্রাদারের হাতে দিলাম। তিনি রোগীকে অপরেশন থিয়েটারের প্রবেশের মুখে বসিয়ে সবগুলো প্রয়োগ করলেন। এবার সেলাইয়ের অপেক্ষা। তরুণী ডাক্তারটি তার পাশে বসে থাকা তরুণ এক ডাক্তারকে অনুরোধ করছেন, বুলেটের রোগীর ক্যাথিটারটা যেন উনি লাগান। এও বলেন, ছেলে না হলে আমি করতাম।

ছেলেটির প্রশ্রাব হচ্ছে না। কষ্ট পাচ্ছে। তরুণী ডাক্তারের সেবার মনোভাব দেখে আবারও ভাল লাগলো। অনেকক্ষণ পর আমাদের পালা। রোগী অপরেশন থিয়েটারের টেবিলে চলে যাচ্ছে। আমি বাইরে অপেক্ষা করছি। আবার একটু পর পর ভেতরে যাচ্ছি রোগীর অবস্থা জানতে। অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়েছে কিনা দেখতে। এর মধ্যে সেই ‘ব্রাদার’ আমাকে দেখে একটা স্লিপ দিয়ে তাড়া দিলেন এগুলো নিয়ে আসেন।

কি এগুলো? স্কচট্যাপ, সুই। আমি একটু বিরক্তই হলাম। এতোক্ষণ তাহলে অপারেশন থিয়েটারে করছে কি! এগুলো লাগলেতো অনেক আগেই বলা দরকার ছিলো ডাক্তারদের। অগত্যা আবার ইমার্জেন্সি গেইট দিয়ে হাসপাতালে ঢুকতে হাতের ডানে যে ফার্মেসিটি পড়ে তাতে গেলাম, যেখান থেকে একটু আগে ৪৮০ টাকায় দুটি ইনজেকশন নিয়েছি। তারা হিসাব করে ৫০০ টাকার উপরে বিল আসবে জানালো। এতো বড় স্কচট্যাপ দরকার নেই, ছোট সাইজ দিতে বললাম। এবার দাম আসলো ৪৪০ টাকা। দৌঁড়ে এনে ব্রাদারের হাতে দিলাম। তিনি ভেতরে নিয়ে গেলেন। আমি লম্বা টাইমের প্রস্তুতি নিয়ে আবার বাইরে এসে দাঁড়ালাম। মিনিটও গেল না, আমার রোগী এসে বললো, চলেন। আমিতো অবাক।

সেলাই শেষ? হ্যাঁ। কত আগে শেষ হয়েছে? কিছুক্ষণ আগে। ডাক্তার চলে যেতে বলার পর ব্রাদার বললো কিছুক্ষণ বসেন। কিছুক্ষণ বসার পর খামোখা লোকটা একটা কাপড় দিয়ে পা মুছে দিল। সে আপনাকেও খুঁজছিলো। আমি তার কাছে গেলাম। জানতে চাইলাম শেষে দেওয়া জিনিসগুলো আসলে কোনো কাজে লেগেছে কিনা। সে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ালো। আমাকে রোগীর স্লিপের পেছনে লেখা ওষুধগুলো কখন খাবে, কোনদিন ড্রেসিং করবে, কোনদিন সেলাই খুলতে হবে- সব জানালো।

আমি যা বুঝার বুঝে গেলাম। রোগীকে বাইরে এনে রিকশা ধরিয়ে বিদায় করে দিলাম। এবার বাকি কাজ করতে হবে। মনে পড়লো ফার্মেসির যে ছেলেটা আমাকে সুই, স্কচট্যাপ দিয়েছে, দেওয়ার সময় তার গায়ে কি যেন লিখে দিয়েছে। একটা চিহ্ন। এর মধ্যে ১০ মিনিট চলে গেছে। আবার গেলাম সেই জরুরি অপারেশন থিয়েটারে। টেবিলের কাছেই পেলাম সেই ব্রাদারকে।

ঠাণ্ডা স্বরে বললাম, আমি রোগীকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছি। তুমি বোধহয় আমাকে চেন না। চেনারও কথা না। আমি এখানে কাউকে কিছু বলছি না। যে জিনিসগুলো আমাকে দিয়ে কিনিয়েছো সেটা চুপ চাপ দিয়ে দাও। নতুবা পরিণতি ভালো হবে না। সে শুধু বললো, আমি দেখি। ভেতরে গিয়ে মিনিটের মধ্যে এনে দিল প্যাকেটটা। চুপে চুপে হাতে তুলে দিল। বাইরে এসে খুলে দেখলাম ভেতরের দুই আইটেম যথাযথ আছে। কেনা দোকানে ফেরত দিলাম। শুধু টাকার অংকটা জানতে চাইলো ফার্মেসির ছেলেটি। পুরো টাকাই ফেরত দিলো। কোনও কথা বললো না। কী ঘটেছে ওরাও জানে।

পেট্রলবোমা আন্দোলনের সময় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে একজন রোগী ভর্তি করিয়ে দেখেছিলাম কিভাবে ওয়ার্ড বয়রা সিট বিক্রি করছে রোগীদের কাছে। আমাকেও কিনতে হয়েছে, নইলে মাটিতে চাদর বিছিয়ে রোগীকে রাখতে হতো। রোগী হাসপাতাল ছাড়ার আগে আগে ওরা সুযোগ পেলে যে কোনও সিট দখলে নিয়ে নেয়। যে রোগীর কাছে বিক্রি করেছে তাকে তুলে দেয়। তবে রোগীরা আরেক রোগীকেও দিয়ে যায়, ওরা তখন ভাগ পায় না। সিট বেচাকেনার মতো ওষুধ কেনার নামে নার্স-ফার্মেসির এই চক্র সম্পর্কে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানে বলেও আমার বিশ্বাস। বিভিন্ন ক্লিনিকের দালাল চক্রও যে নার্স-ব্রাদারদের যোগসাজশে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ঘুরে বেড়ায় সেটাও কর্তৃপক্ষ জানে।

আমার মনে পড়ছে ওয়ার্ডে একদিন একজন নার্স একটা ওষুধ আনতে বললে তাকে স্লিপে লিখে দিতে বলেছিলাম। তিনি বলেছিলেন, আমাদের সমস্যা আছে। লিখতে পারবো না, আপনিই লিখেন এবং কিনে আনেন। টাকা লেনদেন না করার জন্য অনেক নোটিশ আছে দেওয়ালে। ওষুধ কেনার ব্যাপারেও আমার মনে হয় বড় বড় করে নোটিশ লিখে দেওয়া দরকার। বলা উচিত, একটি নির্দিষ্ট ফরমে এবং শুধুমাত্র ডাক্তারদের প্রেসক্রিপশন নিয়ে বাইরে থেকে ওষুধ কিনে আনবেন রোগীর স্বজনরা। এ ধরনের নোটিশ আছে কিনা জানি না। অন্তত আমার চোখে পড়েনি।

অনেক বছর পর আমি এ বছর পর পর দু’বার ডিএমসিএইচ-এ গেলাম। পেশাগতপরিচয় না দিয়ে, আমজনতা হিসেবে সেখানকার সেবা নিলাম। আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে হাসপাতাল জুড়ে চরম যে দুর্গন্ধ ছিল সেটা বর্তমান কর্তৃপক্ষ কমাতে পেরেছে। সেবার মানও বেড়েছে। নার্সরা পেশাগত দক্ষতা বিচারে ইন্টার্নি ডাক্তারদের থেকেও অনেক কিছু ভালো বুঝেন দেখলাম। তাদের চেয়ে তুলনামূলক দক্ষ ও অভিজ্ঞ। তবে ইন্টার্নি ডাক্তারদের কারও কারও ব্যবহার ভালো লাগেনি। আমাকে হতাশ করেছে। তাদেরকে একটু ভদ্র ব্যবহার করা শেখালে আর ওয়ার্ডবয়, আয়া, ব্রাদারদের বাটপারি থেকে রোগীদের রক্ষা করতে পারলে নিঃসন্দেহে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হবে বাংলাদেশের সেরা হাসপাতাল, চিকিৎসার জন্য একটি নির্ভরযোগ্য স্থান।

আনিস আলমগীর: সাংবাদিক ও শিক্ষক।

BSH
Bellow Post-Green View