চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পথ ও পথিক

আমি ভয় করি নাক যায় যাবে শির টুটি
শিক্ষক আমি শ্রেষ্ঠ সবার
দিল্লীর পতি সে তো কোন ছার
ভয় করি নাক, ধারি নাকি ধার, মনে আছে মোর বল
কবি কাজী কাদের নেওয়াজের ‘শিক্ষা গুরুর মর্যাদা’ কবিতার পটভূমি সম্পর্কে আমরা সকলেই অবগত এবং উক্ত ঘটনাটিতে শিক্ষকের প্রতি বাদশাহ ও তার ছেলের অসীম দরদ, অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও সম্মানের বহি:প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। শিক্ষকের মর্যাদা সর্বজনবিদিত এবং শিক্ষক দিবসে এ মহান পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। শিক্ষকদের বহুমুখী কর্ম সম্পাদন করতে হয়, একজন প্রকৃত শিক্ষক কখনো শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেন না। সমাজ গঠন, সমাজ পুনঃনির্মাণ, সামাজিক সুরক্ষা বজায় রাখা, সামাজিক ভাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করা সর্বোপরি সামাজিক নেতৃত্ব প্রদানে শিক্ষক সমাজ অগ্রণী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তন সাধনে সর্বদা প্রচেষ্টা চালায়। তথাপি, শিক্ষকদের নানা সমস্যা ও সঙ্কটকে মোকাবেলা করে জীবন পরিচালনা করতে হয় কিন্তু কখনো নিজের সমস্যার কথা ক্ষুণাক্ষরেও কাউকে বুঝতে দিতে কার্পণ্য করে থাকেন শিক্ষকসমাজ।

উল্লেখিত পঙক্তিটি বিশ্লেষণ করলে জানা যায়, সামাজিক অন্যায়, অসঙ্গতি, অপরাধ বিশেষ করে যে কোন ধরনের ব্যভিচারের বিরুদ্ধে শিক্ষক সমাজ প্রতিবাদ করে সমাজে শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে থাকে। বর্তমানের পরিস্থিতি বিবেচনায় ও বিশ্বায়নের আধুনিকতায় শিক্ষক সমাজ ভয়ডরহীন চিত্তে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সৎসাহস দেখাতে পারছেন কি? যদি না পারেন তাহলে শিক্ষকদের সৎসাহস হারানোর কারণ কি সে বিষয়ের নিমিত্তে শিক্ষক সমাজের উপর প্রশ্ন রেখে মহান শিক্ষক দিবসের বৈশ্বিক সফলতা কামনা করছি।

বিজ্ঞাপন

শিক্ষক হচ্ছেন সমাজের দর্পণ, শিক্ষকদের সামগ্রিকতাকে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করলেই সমাজের চরিত্রায়ন করা সম্ভব। কেননা, আমরা জেনে আসছি শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড এবং শিক্ষাকে উপজীব্য করে সমাজ কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয় সভ্য সমাজব্যবস্থায়। শিক্ষাকে যদি উন্নয়ন অগ্রগতির মূল চাবিকাঠি হিসেবে পরিগণিত করা হয় তাহলে সে সমাজে শিক্ষকদের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিশেষ মর্যাদা প্রদান করা উচিত রাষ্ট্র কর্তৃক। কিন্তু আমাদের সমাজের বর্তমান অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে আর সেখানে শিক্ষকদের সামাজিক অবস্থান কোথায় সে বিষয়ে প্রত্যেকেই অবগত রয়েছেন। মোদ্দা কথা হচ্ছে, আমরা সমাজ কিভাবে বিনির্মাণ করতে চাই সে বিষয়ে আমাদের সুস্পষ্ট নীতিমালা এবং উক্ত নীতিমালার বাস্তবায়নে আন্তরিকতা নিয়ে সরকারের কাজ করার সদিচ্ছা থাকতে হবে।

প্রকৃত অর্থে মজবুত ও টেকসই ভিত্তির উপর সমাজকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে শিক্ষাবান্ধব সমাজ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। শিক্ষাবান্ধব সমাজব্যবস্থার মানে হচ্ছে বিদ্যা, জ্ঞানে ও প্রতিভার সমন্বয়ে বিকশিত মানুষকে সমাজ ও রাষ্ট্রে উপযুক্ত মর্যাদা প্রদান করতে হবে এবং সঙ্গে সঙ্গে মানুষ গড়ার কারিগরদের সম্মান ও নিরাপত্তায় প্রকৃত জায়গায় সমাসীন করতে হবে। তাহলেই রাষ্ট্র টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় আরও অগ্রগামী ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কাঠামোয় ইতিবাচকতা প্রণয়ন করতে পারবে সহজেই।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বিভিন্ন দেশের সরকারের স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশ গমন করছে। উচ্চশিক্ষা শেষে বাংলাদেশে ফেরত আসার সংখ্যা আমাদেরকে আশাহত করছে। বেশির ভাগ শিক্ষার্থীই স্ব স্ব দেশে উচ্চশিক্ষা শেষ করে চাকরিতে যোগদান করছে এবং তাদের দেশে ফেরত আসার অনাগ্রহের সত্যানুসন্ধান করা জরুরী বলে মনে করছি। কেননা, যে সকল শিক্ষার্থীরা বিদেশের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী, পিএইচডি ডিগ্রী সম্পন্ন করছে তাদেরকে অবশ্যই দেশে ফিরিয়ে আনা উচিত এবং দেশে ফেরত এসে যেন উপযুক্ত জায়গায় যথাযথ কর্মসংস্থানের সুযোগ পায় সে বিষয়টি সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে।

বিজ্ঞাপন

জ্ঞানভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক সমাজব্যবস্থা গঠন করতে হবে টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে এবং তার জন্য মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে যথোপযুক্ত ভূমিকা পালন করতে হবে। উচ্চশিক্ষা শেষে দেশে ফেরত আসলেও কর্মসংস্থান ও যথার্থ মূল্যায়নের অভাবে তারাও অন্যদের ন্যায় স্থায়ীভাবে বিদেশ পাড়ি দেয়। বিষয়গুলো যথেষ্ট ভাবনার এবং আমাদের দেশের মেধাবীদের দেশে এনে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে।

একজন প্রকৃত শিক্ষকের গুণাবলী বলে শেষ করা যাবে না। শিক্ষক একাধারে পাঠদান করান, হাতে কলমে গবেষণা শেখান, বিভিন্ন বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেন, অনুপ্রেরণা প্রদান করেন, বিপদে আপদে আশার প্রদীপ হয়ে শক্তি ও সাহস সঞ্চার করে থাকেন। এখানেও প্রশ্ন আসতে পারে, আমরা প্রকৃত শিক্ষক তৈরি করার মনোবাসনা পোষণ করি কি আদৌ; যদি ইচ্ছে থাকতো তাহলে সমাজে শিক্ষকদের বিশেষ মর্যাদা ও নিরাপত্তা প্রদান করা হতো রাষ্ট্র কর্তৃক। তবে যাই হোক, আমরা প্রত্যাশা করি রাষ্ট্র প্রকৃত শিক্ষক তৈরির সকল ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক জ্ঞান ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করবে এবং সেটিই হবে কল্যাণকর রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক।

একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক মাত্রই পূজনীয়, অনুকরণীয় ও অনুসরণীয়। প্রকৃত অর্থে একজন শিক্ষার্থীকে সঠিকভাবে আবিষ্কারের জন্য শিক্ষকদের ভূমিকা অতুলনীয় ও অবিস্মরণীয়। শিক্ষার্থীর মানবিক বিকাশ, সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ, সামাজিক দায়িত্ববোধে অগ্রগামী হওয়া, সামাজিক মূল্যবোধ জাগ্রতকরণ ও সামাজিক অন্যান্য ইতিবাচক বিষয়ে স্ফুরণের বিষয়ে শিক্ষকের অগ্রগামী ও দায়িত্বশীল ভূমিকা একজন শিক্ষার্থীর জীবনে আশীর্বাদ হিসেবে পরিগণিত হয়ে থাকে। বিশেষভাবে বললে বলা যায়, শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠার ক্ষেত্রে অভিভাবকদের তুলনায় কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষকের ভূমিকা অগ্রগণ্য ও তুলনাহীন। কাজেই শিক্ষক দিবসে এ মহান পেশার সাথে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করছি।

শিরোনামের বিষয়টি যদি খানিকটা বিশ্লেষণ করা যায় তাহলে বলা যায়, সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থাটাকে যদি আমরা পথ হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে থাকি তাহলে সে পথের পথিক হচ্ছেন মহান শিক্ষকগণ। মহান শিক্ষকের দেখানো পথেই শিক্ষার্থীরা হেঁটে জীবনের সফলতার পথে ক্রমবর্ধমান হারে অগ্রসর হয়। শিক্ষাজীবনের প্রত্যেকটি সোপানই শিক্ষার্থীর জন্য পরীক্ষার ও শিক্ষণীয়, কাজেই ধাপে ধাপে প্রত্যেকটি বিষয়কে বোঝা ও আত্মস্থ করতে হয় শিক্ষার্থীদের। আর সেক্ষেত্রে মহান শিক্ষকদের দিকনির্দেশনা ও প্রচেষ্টা শিক্ষার্থীর জন্য নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের নিকট থেকে তত্ত্বীয়, ব্যবহারিক, যাপিত জীবনের নানা বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে শিখে জীবন গড়ার জন্য নিজেদের উপযুক্ত সৈনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। শিক্ষকদের শ্রেণীকক্ষের বাইরেও শিক্ষার্থীদের মানবিক বিকাশের জন্য নানামুখী উদ্যোগ, পদক্ষেপ, কাউন্সেলিং, অভিভাবকদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাসহ প্রতিশ্রুতিশীল উদ্যোগ গ্রহণকরত অমানসিক পরিশ্রম ও সাধনা করতে হয়। মহান শিক্ষকদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি এবং সরকারের নিকট আবেদন থাকবে শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি, সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠাসহ জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণে অগ্রণী ভূমিকা রাখার বিষয়ে আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল হয়ে কাজ করার। তাহলেই আমরা একটি জ্ঞানভিত্তিক, উন্নত, ও আধুনিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবো।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)