চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

পঞ্চাশেও অযাচিত বিতর্ক

বাংলাদেশের পঞ্চাশে আমরা এগিয়ে গেছি অনেকদূর। পাকিস্তানি শাসকদের শোষণে যাঁতাকলে পিষ্ট বাঙালির স্বাধিকার আর স্বাধীনতার ডাকের সফল বাস্তবায়ন হয়েছে সেই পঞ্চাশ বছর আগে। বঞ্চনা শেষে মুক্তির ভোরে সাময়িক বিশৃঙ্খলা, জাতির পিতাকে হত্যা থেকে শুরু অগণন মুক্তিযোদ্ধা হত্যা; তবু আমাদের অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মত বড় স্থাপনা গড়ার মত আর্থিক সামর্থ্য হয়েছে আজ বাংলাদেশের। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের শ্রেণিভুক্ত নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত আজ বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের এই স্বীকৃতি দেশের ধারাবাহিক অর্থনৈতিক উন্নয়নেরই প্রতিফলন।

অবকাঠামোগতসহ বহুবিধ উন্নয়নযজ্ঞ চলছে দেশে। তবে এখনও আমাদের বেশিরভাগের মধ্যে ইতিহাসকে অস্বীকার এবং মনগড়া ইতিহাস প্রচারের দীনতা রয়েছে। বিজয়ের পঞ্চাশ বছরেও অযাচিত বিতর্কে মাঝেমাঝে উত্তুঙ্গু হয় দেশ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি, মুক্তিযুদ্ধে শহিদদের সংখ্যা নিয়ে অযাচিত বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা, স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্ক, একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রাজনীতি করার সুযোগ, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়াকে বাধাদানের অপচেষ্টা-অপপ্রচার, দেশবিরোধীদের রাজনৈতিক পুনর্বাসন; সবকিছুই চলছে সমানতালে। স্বাধিকার-স্বাধীনতার রাজনৈতিক সংগ্রামের গণমানুষের অংশগ্রহণের সেই গৌরবকে কালিমালিপ্ত করার যে অপচেষ্টা তার সবটাই রাজনৈতিক। স্রেফ রাজনৈতিক বিরোধিতার নামে একদল লোক খোদ বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের দাঁড় করিয়ে রেখেছে। এখানে দেশের চাইতে ব্যক্তি ও রাজনৈতিক স্বার্থটাই বড় করে দেখে তারা। ফলে অনেক অন্যায় ও অযাচিত বিতর্কের মধ্য দিয়ে যেতে হয় আমাদের। পঞ্চাশ বছরেও এই ধারা বদলায়নি। নিকট ভবিষ্যতে বদলাবে বলেও মনে হয় না।

পাকিস্তানের শাসকদের বিপক্ষে দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ শেষে যে বাংলাদেশের জন্ম সেই দেশের একটা প্রজন্ম এখনও একাত্তরকে ভুল ভাবে, পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কচ্ছেদের ঘটনায় আক্ষেপ করে। তাদের অনেকের কাছে মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ত্রিশ লাখ মানুষের আত্মদান ও দুই লক্ষ মা-বোনের ওপর পরিচালিত যৌন সহিংসতার কোন মূল্য নেই। অদ্ভুত মোহে বুঁদ হয়ে এখনও বাংলাদেশের চাইতে পাকিস্তানকে শ্রেয়তরভাবে তারা। এটা যে একটা বিশেষ রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিফলন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এদের মধ্যে আছে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক যে দলটি একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে দলীয় সিদ্ধান্তে বিরোধিতা করে বাঙালি-হত্যায় পাকিস্তানের সহযোগী হয়েছিল। বিএনপির মধ্যকার একটা বিশাল জনগোষ্ঠী আছে এখানে এখনও পাকিস্তানি ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ। জিয়াউর রহমান নিজে ‘একজন মুক্তিযোদ্ধা’ হওয়া সত্ত্বেও দলটির নেতাকর্মীদের বিশাল একটা অংশ কীভাবে এতখানি পাকিস্তান প্রেমে- প্রশ্ন! যদিও জিয়াউর রহমানের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে এই সময়ের আওয়ামী লীগের কেন্দ্র থেকে প্রান্তের বিশাল একটা শ্রেণির প্রশ্ন রয়েছে, তবে এই প্রশ্ন অমীমাংসিত বলে তিনি ‘মুক্তিযোদ্ধা নন’ এমনটা বলতে পারি না। বাংলাদেশের ইতিহাস সৃষ্টিতে রাজনীতির যোগ আছে সত্য, তবে রাজনৈতিক কারণে ইতিহাস বদলের চেষ্টা সহজে মেনে নেওয়ার মত না!

ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসনে জিয়াউর রহমান অনেক মুক্তিযোদ্ধা অফিসারকে উদ্দেশ্যমূলক বিচারে হত্যা করেছেন, তবে জীবদ্দশায় তিনি নিজেকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ দাবি করেননি। তার মৃত্যুর পর দল টেকাতে বিএনপির নেতাকর্মীরা জিয়াকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে দাবি করে আসছে। তার পুত্র তারেক রহমান আরেককাঠি সরেস হয়ে জিয়াকে ‘বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি’ বলেও দাবি করে বসে আছেন। এগুলো যে স্রেফ ইতিহাস বিকৃতি সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একইভাবে জিয়াকে মুক্তিযোদ্ধা না বলাও ইতিহাসের বিকৃতির অংশ কি নয়? স্বাধীনতার ঘোষক, প্রথম রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার পর তার পক্ষে জিয়ার স্বাধীনতার পাঠ ইতিহাসের মীমাংসিত বিষয়- এগুলোকে নিয়ে তাই বিতর্ক সৃষ্টি ইতিহাসকেই বিতর্কিত করার অপচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। তবু সমানে চলছে এই বিকৃতি।

মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের কর্তৃক গণহত্যা, ত্রিশ লক্ষ শহীদ এবং দুই লক্ষ নারী-মেয়ে শিশুর ওপর যৌন সহিংসতাও স্বীকৃত বিষয়। কিন্তু এগুলো নিয়েও বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টা করে বিএনপির একটা অংশ। কয়েক বছর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, গয়েশ্বর রায়সহ আরও অনেক নেতা এনিয়েও যে সকল মন্তব্য করেছেন সেগুলো অনাকাঙ্ক্ষিত। মুক্তিযুদ্ধে শহিদের সংখ্যা ও শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে তাদের সেই সকল মন্তব্য দেশে ইতিহাস বিকৃতির পালে হাওয়া যুগিয়েছে। ওখান থেকে তারা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের সেই বক্তব্যগুলো সরকারদল আওয়ামী লীগের বিপক্ষে না গিয়ে খোদ দেশের বিপক্ষেই গেছে, ইতিহাস বিকৃতির অংশ হয়ে গেছে। তাদের অনুধাবন করা উচিত দেশ আর সরকার এক নয়। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতা করতে গিয়ে কেন তারা অযাচিতভাবে দেশ ও দেশের ইতিহাসকে লক্ষ্যবস্তু করছেন?

বিজ্ঞাপন

একাত্তরের পুরো নয় মাস কথিত ধর্মরক্ষার নামে জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যার সহযোগী ছিল। এই দলটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে বাঙালির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছিল। দেশ স্বাধীনের পরেও তারা আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চায়নি, বরং স্বাধীন দেশেও পাকিস্তানের ভাবধারায় রাজনীতি করে গেছে, করে যাচ্ছে। বিএনপির সঙ্গে রাজনৈতিক ও আদর্শিক জোট গড়ে ক্ষমতার অংশীদারও হয়েছে তারা। একাত্তরের শীর্ষ দুই যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদকে মন্ত্রিত্বও দিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। বাংলাদেশের মন্ত্রিত্ব পেয়েও তারা পাকিস্তানকে ভুলেনি। বরং পাকিস্তানি ধারা বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা করে গেছে, মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করেছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে দেশে। নিজামী-মুজাহিদসহ শীর্ষ কজন যুদ্ধাপরাধী শাস্তি কার্যকর হয়েছে। একাত্তরের মানবতাবিরোধী সেই অপরাধীদের শাস্তি গণদাবি ছিল, সেই গণদাবি পূরণে আওয়ামী লীগ কিছুটা কাজ করেছে। তবে এই বিচারপ্রক্রিয়া ও দণ্ড কার্যকর সহজ ছিল না। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্র ছিল, আছে এখনও। জামায়াতে ইসলামী নিজেই যুদ্ধাপরাধী দল, তাদের বাদে বিএনপিও এই বিচার প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করার চেষ্টা করেছে, করছে। অথচ এখানে রাজনৈতিক ঐক্যমত্যের দরকার ছিল। বিএনপিসহ তাদের সমমনা দলগুলোর উচিত ছিল সরকারের ওই উদ্যোগের সমর্থন জানানো, কিন্তু সেটা তারা করেনি।

একাত্তরে যারা বাঙালির মুক্তির সংগ্রামের বিরুদ্ধে ছিল সেই গোষ্ঠীভুক্তদের পরবর্তী প্রজন্ম তাদের উত্তরাধিকার বহন করে চলেছে। তাদের বেশিরভাগই রাজনৈতিকভাবে সংগঠিত নিঃসন্দেহে। তারা এতখানি ছড়িয়ে পড়েছে যে তারা যেকোনো বিষয়ে বাংলাদেশ-পাকিস্তানের তুলনায় পাকিস্তানকে এগিয়ে রাখে, আক্ষেপ করে একাত্তরের সম্পর্কচ্ছেদের জন্যে। যেকোনো সময়, এমনকি ডিসেম্বরেও ঢাকায় কোন ক্রিকেট ম্যাচ হলে পাকিস্তানের পতাকা উড়ায়, জার্সি পরে গ্যালারিতে বসে, পাকিস্তানের জয়ে উল্লাস করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অথবা প্রকাশ্যে। এই দুঃসাহসের শেকড় কোথায়? স্রেফ ধর্মে? না, ধর্মে নয়, কারণ বাংলাদেশ ও পাকিস্তান দু-রাষ্ট্রেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগুরু। তাহলে? নিশ্চিতভাবেই তা আদর্শিক, এবং একাত্তরের পরাজয় থেকেই উদ্ভূত।

বাংলাদেশে যখন এত এত পাকিস্তানি ভাবধারার মানুষ তখন খোদ পাকিস্তানিরা তাদের দেশ নিয়ে হতাশায় পুড়ছে। টেলিভিশনের টকশো আমন্ত্রিত অতিথিদের মুখ দিয়েও উচ্চারিত হচ্ছে- ‘খোদা কি ওয়াস্তে হামে বাংলাদেশ বানা দো’। দেশটির প্রধানমন্ত্রী তাদেরকে যখন সুইডেনের মত উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন কিংবা দিবাস্বপ্ন যাই দেখাচ্ছেন তাদের বুদ্ধিজীবীদের দাবি সুইডেন পরে, আগে বাংলাদেশের মত অবস্থায় যেতে। এজন্যে তারা পাঁচ বছর নয়, দশ বছরও অপেক্ষা করতে রাজি। পাকিস্তানিদের এই হাহাকার আমাদের অগ্রগতির স্মারক নিঃসন্দেহে।

বাংলাদেশের পঞ্চাশ হয়েছে। আমাদের গৌরব আমাদের দেশ, আমাদের অর্জন আমাদের দীর্ঘ মুক্তির সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ। নানা ক্ষেত্রে আমাদের যে অগ্রগতি এটা আমাদের গৌরবের পরিচয় বহন করে। রাজনৈতিক সরকারগুলো আমাদের উন্নয়ন নিয়ে ভাববে, ভাবছে; আমাদের উচিত হবে সেই উন্নয়নের সহযাত্রী হওয়া। নিজেদের বদলানো। পঞ্চাশ বছর পরও যে বিষয়গুলো নিয়ে আমরা অযাচিত বিতর্কে, আমাদের উচিত হবে সেগুলো পরিহার করে ইতিহাসের গৌরবের অংশীদার হওয়া। না হলে দেশ এগুবে ঠিক, কিন্তু আমাদের ঠাই হবে অন্ধ প্রকোষ্ঠে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

বিজ্ঞাপন