চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

নিজেদের শহর!

মালদ্বীপ ভ্রমণ: পর্ব-২

বেশ লম্বা সময় পর লিখছি। গত কদিনে কয়েক ডজন বললেও ভুল হবে, কয়েক’শ রকমের অভিজ্ঞতা জমা হয়েছে। কোনটা ছেড়ে কোনটা লিখবো সেটা নিয়ে ভাবছি। প্রচণ্ড ব্যস্ত সময় কাটছে। আজকে বরং মালদ্বীপ কেমন সেটা নিয়েই বলি।

যেকোনো জায়গায় গেলে সেখানে সবকিছুর অন্তত বেসিকটা জানতে হলেও প্রথমদিন লেগে যায়। এই বিষয়টা জানি এবং মানি। তারপরও প্রথমদিনে অস্থিরতা কাজ করে। এবারও আমার কিংবা আমাদের সবার বেলাতে তেমনই হয়েছে। একটা উদাহরণ দেই।

মালদ্বীপে যেদিন প্রথম আসলাম, সেদিন সন্ধ্যায় ফুটবল ফেডারেশন থেকে আমাদের একটা করে সিম কার্ড দেয়া হল। ভ্রমণ ক্লান্তিতে আমরা ঘুমে ঢলে পড়ে যাচ্ছি। কিন্তু রাত একটা পর্যন্ত এক লোকের জন্য সবাই জেগে বসেছিলাম। উনি কখন দোকান বন্ধ করে আসবেন আর আমাদের ফোনে টাকা রিচার্জ করে দেবেন। কারণ আমরা তখনো কিছু চিনি না। কোথায় রিচার্জের দোকান। ইন্টারনেটের প্যাকেজ কোনটা ভালো। কল করার জন্য কোন প্যাকেজ ভালো। কি করতে কী করবো। ঠকে যাবো না তো?

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর উনি আসলেন এবং বললেন আমাদের সিমটা ট্যুরিস্ট সিম। খরচ বেশি। যেহেতু আমাদের ইন্টারনেট বেশি জরুরি, তাই লোকাল সিম নিতে হল। উনিও বেশকিছু অপশন দিলেন। আমরা আপাতত কিছুটা নিশ্চিন্ত। পরে কী হবে সেটা তখন ভাবার অবস্থা ছিল না কারও।

এরপর থেকে আসলে যা হয়েছে সেটা বর্ণনা করতে গেলে পাঠকদের সাথে আমার একটা ট্যুরে যেতে হবে। দিন-রাত এক করে মালদ্বীপ ভ্রমণের কাহিনী শোনাতে হবে। কিন্তু আপাতত কিছুটা জানাতে পারি।

গত দশদিনে আমি মালদ্বীপিয়ান হয়ে গেছি। কোনো সন্দেহ নেই। রোদে পোড়া চেহারা। বিশেষ করে কপাল। সাথে মাস্ক পরাতে কী যে একটা অবস্থা। আমরা যারা এখানে একসাথে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ কাভার করতে এসেছি, তারা সবাই ভাবছি বাংলাদেশ এয়ারপোর্ট থেকে আমাদের আফ্রিকার কোনো দেশে পাঠিয়ে দেয়া হবে! ছবির সাথে চেহারার মিল না থাকার জন্য!

রাজধানী মালে। ছোট জায়গা। মাত্র ১৬৮০ একর। কিন্তু সবই আছে এখানে। জনগণের প্রয়োজনে যা যা দরকার, খুব হিসাব কষে সেসব জিনিস দিয়ে মালে শহরকে সাজিয়েছে মালদ্বীপ সরকার। সবার প্রথমে যে বিষয়টা চোখে পড়বে সেটি হচ্ছে এমন কেউ নেই যে বাইক চালায় না। কিন্তু আমি যে খুব বেশি বাইকের দোকান দেখেছি সেটা না।

সেদিন কোথায় যেন যাচ্ছিলাম। তখন একটা কি দুইটা বাইকের দোকান চোখে পড়েছিল। দাম দেখলাম। ৪৭ হাজার রুপি থেকে শুরু। মালদ্বীপের এক রুপির সমান বাংলাদেশের ৫ কিংবা ৬ টাকা। সে হিসেবে আমার কাছে দাম বেশিই মনে হয়েছে।

সেটা নিয়ে গতকাল একজন ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে আলাপ হচ্ছিল। আমি একটু চমকেই উঠেছিলাম। এই দশদিন যে বাইকগুলো দেখেছি সেগুলো সব ব্যক্তি মালিকানাধীন না। সরকার ইজারাও দেয়। প্রাপ্ত বয়স্ক হলে প্রত্যেক পরিবারে সবাই বাইক চালায়। কখনো কখনো মনে হয় মানুষের চেয়ে বাইক বেশি! স্কুটি আর ভেসপাই বেশি।

বিজ্ঞাপন

আমাদের দেশে পালসার, জিক্সারের মতো বাইক হঠাৎ দুই একটা চোখে পড়ে। কিন্তু কেউ স্পিড ৪০-এর উপরে তোলেন না। কারণ সেই সুযোগ নেই। রাস্তা ছোট। পিচ দিয়ে রাস্তা বানানো হয়নি এখানে। ব্যবহার করা হয়েছে ‘পেভার ব্লক মোজাইক ইট’।

আমাদের দেশে যেগুলো ফুটপাত নির্মাণে ব্যবহার করা হয়, অনেকটা সেরকম। একমাত্র পিচঢালা পথ হচ্ছে এয়ারপোর্ট থেকে যে সেতু দিয়ে শহরে ঢুকতে হয়।

আরও চমকে দেই আপনাদের। বাইকারদের মধ্যে ৯০ শতাংশের বেশি নারী। এখানে বিদেশী ছাড়া অর্থাৎ, ভারতীয় নাগরিক কিংবা ইউরোপ আমেরিকা থেকে আসা নাগরিক এবং পর্যটকদের ছাড়া যারা মুসলিম নারী আছেন, তারা সবাই হিজাব পরেন। সাথে জিন্স, শার্ট, ফতুয়া, কুর্তি, টি-শার্ট পরেন মেয়েরা। যারা খুব পর্দা করেন, তারাও বাইক চালানোয় দারুণ পারদর্শী।

মালদ্বীপিয়ানরা স্বাধীনতায় খুব বিশ্বাস করে। পরিবার থেকেও কোনো বাধা নেই। বেশ রাত অবধি সবাই রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেন। বিষয়টা এমন ‘আমার দরকার তাই বের হয়েছি’ কিংবা ‘আমি স্বাধীন দেশের মানুষ’ কিংবা ‘আমি ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী’।

এটিকে কেউ অন্য দৃষ্টিতে দেখে না। আমি নিজেই দেখেছি সমুদ্রপাড়ে গিয়ে রাত অবধি মানুষ বসে আছে। কিন্তু ট্যুরিস্ট প্রধান দেশ হলেও রাত ১২টার পর প্রায় সব দোকানপাট বন্ধ হয়েছে। পুলিশ টহল দেয়। কিছু খাবারের দোকান খোলা থাকে। জায়গা চেনা থাকলে খাওয়া-দাওয়া নিয়ে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা না।

এখানে মানি এক্সচেঞ্জ খুব কম। অবশ্য অনেক রেস্টুরেন্ট, রিচার্জ আবার সাধারণ দোকানও আছে, সেখানে ওরাই ডলার ভাঙিয়ে দেয়। ব্যাংক রেটের চেয়ে মানি এক্সচেঞ্জ রেট ভালো।

মালদ্বীপ মসজিদের দেশ। শুধু মালে না। যত ছোট দ্বীপই হোক না কেনো, সেখানে মসজিদ আছে। মালেতে অসংখ্য মসজিদ। তাই নামাজের সময় ট্যাক্সি কিংবা অন্য যানবাহন রাস্তায় কম থাকে।

মালেকে আমি অন্তত অতিথিপরায়ণ বলবো না। কারণ আমাদের কারোই সেরকম সুখকর কোনো অভিজ্ঞতা হয়নি। আসার পর বেশ হয়রানিতেও পড়তে হয়েছে। সে গল্প অন্যদিন বলবো।

মালদ্বীপের স্থানীয়দের নিয়ে এক কথায় বলতে গেলে, জায়গাটা খুব ছোট তো তাই পুরোটাই ওদের কাছে ঘরবাড়ি। প্রকৃত অর্থেই তাই। এই কয়দিনে আমাদের কাছেও মালে ‘ঘরবাড়ি’।

বিজ্ঞাপন