চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ধর্মের রাজনীতি রাজনীতির ধর্ম

রাজনীতিতে অভিনয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নির্বাচনের মৌসুমে এই অভিনয়ে কে কতটা পারদর্শিতার সাক্ষর রাখতে পারেন, তার উপর নির্ভর করে ভোটাররা তাকে কতটা আস্থায় নেবে অথবা নেবে না। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহারও নতুন কিছু নয়। কিন্তু ধর্মকে কে কতটা সাফল্যের সাথে ব্যবহার করতে পারলেন, তার উপরে নির্ভর করে ধর্মীয় অনুভূতি তার পক্ষে থাকবে কি থাকবে না।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ধর্ম, ধর্মীয় পোশাক ও অভিনয়কলার চর্চা বহুদিনের। অভিনয়প্রিয় বাঙালিও এসব বেশ খায়। বিশেষ করে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় এই ধর্মীয় লেবাসের ব্যবহার বেড়ে যায়। যে কারণে দেখা যায়, ব্যক্তিজীবনে ধর্মীয় রীতি-নীতির ধারেকাছে না গেলেও বা ধর্মে বিশ্বাসী না হওয়া সত্ত্বেও ভোটের রাজনীতিতে তারা মাথায় টুপি এবং অন্যান্য ধর্মীয় পোশাকে নিজেদের আচ্ছাদিত করেন। যেহেতু বাংলাদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের দেশ, সে কারণে ধর্মীয় পোশাক বললে মাথায় টুপি এবং এ জাতীয় পোশাককেই বোঝায়। যারা সারা বছর ওয়েস্টার্ন স্যুট-বুট-টাই পরে থাকেন, তারাও মাথায় টুপি দিয়ে জনগণের কাছে ভোট চাইতে যান।

গরু জবাই করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রেখে ভারতের গুজরাট রাজ্যে যেদিন পশু সংরক্ষণ আইন সংশোধনের খবর আসে, একই সময়ে বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট চত্বরে একটি ভাস্কর্য (মূর্তি) অপসারণের দাবিতে সোচ্চার হয়ে ওঠে ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। প্রতিবেশি দুটি রাষ্ট্রের এ দুটি তৎপরতার মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পাওয়া কঠিন।

বস্তুত বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের রাজনীতিতে ধর্ম এতটাই প্রভাবক যে, যথেষ্ট প্রগতিশীল বলে পরিচিত দলও ক্ষমতায় যাওয়া বা ক্ষমতায় থাকার অস্ত্র হিসেবে বারবারই ধর্মকে ব্যবহার করে। ভোটের আগে পীরের মাজারে যাওয়া, ধর্মীয় নেতাদের আশীর্বাদ নেয়া, ধর্মভিত্তিক সংগঠনগুলোর দাবি-দাওয়া মেনে নিয়ে তাদের আস্থাভাজন থাকা বা নিষ্ক্রীয় রাখা, ধর্মবিষয়ক সম্মেলনে রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের যোগদান ইত্যাদি চলতে থাকে। যে কারণে ধর্ম আর মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত বিশ্বাস বা আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বরং সে রাষ্ট্রের রাজনীতি ও ক্ষমতার গতিপ্রকৃতিও নির্ধারণ করে।

Advertisement

ধর্ম যখন রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাবিত করে, তখন সেই রাষ্ট্রে কট্টরপন্থি গোষ্ঠীগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠবে—এটিই স্বাভাবিক। এবং তখন তাদের দাবি-দাওয়া মেনে নিতেও সরকার বাধ্য হয়। এটি অব্যাহত থাকলে ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলো একসময় কী করা যাবে এবং করা যাবে না—তাও নির্ধারণ করে দেয়া শুরু করে। তারা একটি জাতির বহু বছর ধরে লালিত সংস্কৃতি বদলে দেয়ার মতো নির্দেশনাও দিতে পারে।

গত বছর একটি গবেষণার ফলাফল বলা হয়েছিল, মৌলিক সেবা, ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করে বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ শরিয়া আইন বাস্তবায়নের পক্ষে। কিন্তু এই জরিপটি নিয়ে তখন বেশি বিতর্ক শুরু হয়। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শরিয়াহ আইন একই সঙ্গে থাকতে পারে বলে গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন। তবে গবেষকেরা বলেছেন যে, বর্তমান গণতান্ত্রিক কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হতে না পেরে অনেকে বিকল্প হিসেবে শরিয়াহ আইনের কথা বলেছেন। কারণ মানুষ সুশাসন চায়।

একটা তর্ক অনেক সময়ই শোনা যায় যে, দেশে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা বাড়লেও এবং বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি হলেও এর সাথে সাথে মানুষের ধর্মাশ্রয়ের প্রবণতাও বেড়েছে কি না? প্রবীণদের অনেকের মুখেই এ কথা শোনা যায় যে, ষাট-সত্তুর দশকেও ঢাকার রাস্তায় যে পরিমাণ টুপি মাথায় দেয়া পুরুষ এবং হিজাব পরিহিত নারী দেখা যেত, সেই সংখ্যা এখন ঢের বেড়েছে। এর একটি কারণ হতে পারে এই যে, মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। সেই অনুপাতে রাস্তায় মানুষের চলাচলও বেড়েছে। কিন্তু সাথে সাথে এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, জাগতিক জীবনে মানুষের অনিশ্চয়তা বেড়ে যাওয়ায় ধর্ম তথা অদৃষ্টের উপরে তাদের নির্ভরতা বেড়েছে—অনেক সময় যারা বহিঃপ্রকাশে ঘটে এই ধর্মীয় পোশাকে। আবার যেহেতু দেশের অধিকাংশ মানুষ নিয়মিত ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ধর্মকর্মের চর্চা না করলেও ধর্মীয় বিষয়ের প্রতি একধরনের দুর্বলতা অনুভব করেন এবং সেই দুর্বলতার পেছনে পরলৌকিক ভয়ও কাজ করে, ফলে তাদেরকে ধর্মীয় বিষয়ে সহজেই বায়াসড বা প্রভাবিত করা সম্ভব। বস্তুত এই সম্ভাবনাকেই রাজনীতিবিদরা নিজেদের ভোটের মাঠে একটি বড় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

বাবরি মসজিদ

১৯৯২ সালে ভারতে বাবরি মসজিদ ভাঙার সংবাদে বাংলাদেশেও লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে এসে হিন্দুদের অসংখ্য মন্দির ভেঙেছে, তাদের ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান জ্বালিয়ে দিয়েছে। যারা বাবরি মসজিদ ভাঙার ‘প্রতিশোধ’ নিতে গিয়ে এই কাজ করলেন, তাদের কত শতাংশ লোক মসজিদে যান, রোজা রাখেন, জাকাত দেন বা ইসলামের অন্যান্য রীতি-নীতি মেনে চলেন, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। কেননা এখানে ধর্ম বা ধর্মীয় অনুভূতি যতটা না কাজ করেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বছরের পর বছর জিইয়ে রাখা বিভক্তির রাজনীতি—যার মধ্য দিয়ে এ দুই ধর্মের লোকদের মধ্যে কেবল অবিশ্বাস ও অনাস্থার দেয়াল লম্বা হতে থাকলেও রাজনীতিবিদরা এর থেকে সুবিধা নিয়েছেন বা এখনও নিচ্ছেন। ভারতে এখনও বাবরি মসজিদের জায়গায় রাম মন্দির নির্মাণের যে তৎপরতা, তাও সেই রাজনীতিরই খেলা। কেননা, কোনো ধর্মই অন্য ধর্মের উপাসনালয় ভাঙা কিংবা একজনের উপাসনালয় ভাঙলে প্রতিশোধ হিসেবে অন্যেরটা ভাঙা অনুমোদন করে না। সব ধর্মই সহনশীলতার কথা বলে। পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা বলে। কিন্তু ধর্ম এখন রাজনীতিবিদদের ভোটের অস্ত্র; যা ব্যবহারে ডানপন্থি, মধ্যপন্থি এমনকি বামপন্থীরাও পিছিয়ে নেই।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)