চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে বদনাম হচ্ছে সরকারের

১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ পর্যন্ত ব্যাপকভাবে শুরু হয় বঙ্গবন্ধুর স্তুতি। এমন প্রচারণার মাঝে অন্যদের লুটপাট ও দুর্নীতি সমানভাবে চলতে থাকে তখন। কিন্তু যখনই বঙ্গবন্ধু এই ‘চোরের খনি’ ও ‘চাটার দলে’র ব্যাপারে অসন্তোষ প্রকাশ করে ‘দুর্নীতি দমনে’ মরিয়া হয়ে ওঠেন তখনই ব্যর্থতার দায় চাপাতে সক্রিয় হয়ে ওঠে এইসব সুফলভোগী স্তুতিবাজের দল। অস্থিতিশীল করে তুলে বাজার পরিস্থিতি। সক্রিয় হয়ে ওঠে চোরাকারবারী, দুর্নীতিবাজ ও মিত্রবেশী বন্ধুদের দল। আইনশৃংখলা ও বাজার পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষ’ তৈরি ও বঙ্গবন্ধু হত্যার ক্ষেত্র সৃষ্টি করে তুলে তারা।

বর্তমানেও এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়নে অশান্ত হয়ে উঠছে দেশ। চলছে শেখ হাসিনাকে ব্যর্থ সরকার প্রধান হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা। মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের চেয়ে মন্ত্রী এমপিরা সারাক্ষণ ব্যস্ত থাকে প্রধানমন্ত্রীর বন্দনায়। এমনটি না করে সবাই যদি নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতেন, তাহলে কি পরিস্থিতি অন্যরকম হতো না?

কেউ বলেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের যেভাবে আশ্রয় দিয়েছেন তার শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পাওয়া উচিত। আশা করা যায়, সারাবিশ্ব এ বিষয়ে একমত পোষণ করবে। নোবেল পুরস্কার পাওয়ার ক্ষেত্রে বিশ্বের একমত হওয়ার কি কোনো বিষয় রয়েছে? এমন যুক্তিহীন স্তুতিতে কি কোন লাভ হচ্ছে?

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন: গত ৪৪ বছরে সবচেয়ে সাহসী রাজনীতিকের নাম শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের গত ৪৪বছরে সবচেয়ে পরিশ্রমী নেতার নাম শেখ হাসিনা। এভাবে সকলেই শেখ হাসিনার অনবরত স্তুতি করে যাচ্ছেন।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয়দানের মধ্যদিয়ে দেশ চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। এ ক্ষেত্রে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কী দায়িত্ব পালন করছে? এভাবে স্তুতিবচন না দিয়ে মন্ত্রীরা যদি নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতো তা নিশ্চয়ই শেখ হাসিনার ইমেজ বৃদ্ধির সহায়ক হতো। এসব স্তুতিবচনে নেত্রীর কি কোন লাভ হয়? দেশে দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন ও দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতিতে বদনাম হচ্ছে সরকারের। আর তার দায় কি ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে শেখ হাসিনার উপরই বর্তাচ্ছে না? দেশে শ্রম মন্ত্রণালয় ও পাট মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও, পাটকল শ্রমিকরা কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানাচ্ছে? শ্রমিকরা শ্লোগান তুলছে, ‘মা হাসিনা ভাত দে, কাপড় দে নইলে একটু বিষ দে’। দেশের শিক্ষকরাও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতায় প্রধানমন্ত্রীর কাছে দাবি জানায়। সকলের এই প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হওয়াই কি মন্ত্রণালয়গুলোর ব্যর্থতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়?

বিজ্ঞাপন

২৫ নভেম্বর ২০১৯, বকেয়া পরিশোধ ও মজুরি কমিশন বাস্তবায়নসহ ১১ দফা দাবিতে ভুখা মিছিল করেছে নরসিংদীর ইউএমসি জুট মিলের শ্রমিকরা। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ ঐক্য পরিষদের ডাকে সারাদেশে এ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ইউএমসি জুটমিলের প্রধান ফটক থেকে মিছিল বের করে শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে পুনরায় মিল গেটে গিয়ে বক্তব্যের সময় শ্রমিকরা বলেন: পাটমন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। ব্যানার, থালা, বাটি, ও প্ল্যাকার্ড নিয়ে হাজারো পাটকল শ্রমিক এই মিছিলে অংশ নেয়। শ্রমিকদের বকেয়া মজুরি, পিএফ’র টাকা প্রদান ও বদলি শ্রমিকদের স্থায়ীকরণ, মজুরি কমিশনসহ তাদের ১১ দফা ন্যায্য দাবি না মানায় তারা সরকারের তীব্র সমালোচনা করে পাট মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেন। অচিরেই দাবি না মানলে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন শ্রমিক নেতারা। শ্রমিকদের এই আন্দোলনে কি শ্রম মন্ত্রণালয়, পাট মন্ত্রণালয় ও মজুরি কমিশনের ব্যর্থতার দিক ফুটে ওঠেনি?

একদিকে পেঁয়াজের মূল্যবৃদ্ধি আর একদিকে পেঁয়াজ বর্জনের ঘোষণা, খাদ্যমন্ত্রীর পেঁয়াজ ছাড়া ২২ জাতের রান্নার দক্ষতা, একদিকে উন্নয়ন আরেকদিকে উন্নয়ন বরাদ্দের লাগামহীন দুর্নীতি, বিদেশে টাকা পাচার, শেয়ার বাজার ও ব্যাংকে লুটপাট সব মিলিয়ে চরম বদনাম হচ্ছে সরকারের। আর মন্ত্রিপরিষদের মন্ত্রীদের অবান্তর ও হাস্যকর বক্তব্য দেশবিদেশে আলোচিত হচ্ছে। মন্ত্রীরা এসব স্তুতি না করে যদি নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করতো তবে কি এই বদনাম হত? এটা রাজনীতির জন্য ও দলের জন্য অশনি সংকেত নয় কি?

মাদকবিরোধী অভিযান ও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান কি মাদক দুর্নীতি বন্ধ করতে পেরেছে? এসব দুর্নীতির পেছনে কি রাজনীতিকরা জড়িত? তবে কি সুকৌশলে আমলাতান্ত্রিক ঔদ্ধত্যই রাজনীতিকে বিতর্কিত করে তুলছে না? আমলাতন্ত্রের অশুদ্ধতাকে কে শুদ্ধ করবে? এটি করতে না পারার ব্যর্থতার দায়ও কি রাজনীতির ওপরই আসছেনা? সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্তুতি করে আসলে কি দায় এড়াচ্ছেন না? সকল ক্ষেত্রে শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই মুখ্য এটি বলে কি তার ওপর ব্যর্থতার দায়ভার চাপানোর এক সুদূরপ্রসারী মহাপরিকল্পনা হচ্ছে না?

এসব নেতা, মন্ত্রী এমপির ব্যর্থতায় কী প্রমাণ হয়? সকল সিদ্ধান্তের মূলে দলকে পাশ কাটিয়ে শেখ হাসিনাকে উপস্থাপন করা কি ভয়ের নয়? চলছে স্তুতিবচনের প্রতিযোগিতা। এইসব স্তুতি শেখ হাসিনার জন্য কতটা হিতকর, দলের জন্য কতটা হিতকর ও দেশের জন্য কতটা হিতকর? এই প্রশ্নের সঠিক ও সুস্থ উত্তরের বোধোদয় হবে কি সকলের?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)

শেয়ার করুন: