চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তাহাজ্জুদ নামায: নিশীথের একান্ত আরাধনা

তাহাজ্জুদ। সৃষ্টিজুড়ে আল্লাহ প্রেমিকদের এক প্রিয় নামায। গভীর রজনীতে একান্তচিত্তে এ নামাযের কার্যক্রম। এর আছে তাৎপর্যময় আধ্যাত্মিক শক্তি, রূহানী প্রশান্তি এবং তাকওয়ার চর্চারণ্য। রব্বে কায়েনাতের ইরশাদ, “হে প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আদায় করুন রাতের কিয়দাংশে তাহাজ্জুদ। কারণ এটা আপনার জন্য অনেক উপকারী।  অতিসত্বর আপনার মহান প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্তরে সমাসীন করবেন।” [আল-কুরআন, সুরা বনী ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯।]

নিদ্রা যাওয়া ও জাগ্রত হওয়া-এ পরস্পর বিরোধী দুই অর্থে তাহাজ্জুদ শব্দটির ব্যবহার। সাধারণত কিছুক্ষণ ঘুমানোর পর যে নামায আদায় করা হয়, তাই তাহাজ্জুদের নামায।  তবে তাফসিরে মাজহারিতে আল্লামা ছানাউল্লাহ পানিপথি রাহমাতুল্লাহি তা‘আলা আলাইহি বলেন, রাতের কিছু অংশে নামায পড়ার জন্য নিদ্রা ত্যাগই হলো তাহাজ্জুদ। দিনমান ক্লান্তি শেষে সৃষ্টি যখন নীরব ঘুমে আচ্ছাদিত, ঠিক সে মুহূর্তে জেগে উঠে মহান আল্লাহর সান্নিধ্যকামী ভাগ্যবানরা। বিলাস বিছানা, আয়েস নিদ্রা এবং বিশ্রামগ্রহণ ত্যাগ করে দাঁড়িয়ে যায় মহা মহিয়ান চিরঞ্জীব আল্লাহর দরবারে।

বিজ্ঞাপন

এই তো সুযোগ! স্রষ্টা আর সৃষ্টির মাঝে একান্ত আলাপ।  রাজাধিরাজের রাজদোরে মনোবাসনা-আরজির মাহেন্দ্রক্ষণ। তাদের প্রশংসাগাঁথা ঐশীবাণী, “তাদের পার্শ্বদেশগুলো রাতে পৃথক থাকে শয্যাসমূহ থেকে।  আপন প্রতিপালককে ডাকতে থাকে ভীত ও আশাবাদী হয়ে।  আর আমার (আল্লাহর) প্রদত্ত থেকে কিছু দানসদকা করে।” [আল-কুরআন, সুরা সাজদাহ, আয়াত : ১৬।]

বিজ্ঞাপন

পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামাযের পর তাহাজ্জুদই সর্বোত্তম নামায।  ইসলামের প্রাথমিক যুগে এর বিধান ছিলো ফরয।  পরবর্তীকালে ফরয বিধান রহিত হয়ে যায়।  বর্তমানে এ নামায আমাদের জন্য সুন্নাত কিংবা নফলের ব্যাপারে ফিকহবিদদের মধ্যে মতানৈক্য আছে।  তবে অধিকাংশ ফকিহ’র মতে তাহাজ্জুদ নামাযের নফলের অন্তর্ভূক্ত।  কিন্তু রসুলে আরবি সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিয়মিত এ নামায আদায় করতেন।

এ নামাযের ফযিলত বর্ণনায় অসংখ্য হাদিস বিবৃত হয়েছে।  মুসনাদে আহমদের এক বর্ণনায় আছে, হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহুর সূত্র বর্ণিত। তিনি বলেন, “আমি আল্লাহর প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি যে, রাতে অর্ধপ্রহরে যে নামায আদায় করা হয়, সে নামায ফরয নামায ব্যতীত অন্যান্য সমূহ নামাযের চেয়ে উত্তম।” [মুসনাদে আহমদ, খ.১৭, পৃ.১৯৩, হাদিস নং-৮১৫১।]

বিজ্ঞাপন

ফযিলতপূর্ণ এ নামাযের জন্য জাগ্রত হওয়ার আছে আরো অসংখ্য গুরুত্ব। একাগ্রচিত্তে নামায আদায়ের পাশাপাশি একান্ত ফরিয়াদের আছে মহা সুযোগ। সাহাবিয়ে রসূল হযরত আবু উমাম রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, হুযুর আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে জানতে চাওয়া হলো, কোন দু‘আ আল্লাহর রাজদ্বারে বেশী কবুল হয়? উত্তরে তিনি ইরশাদ করেন, “রাতের শেষপ্রহর এবং ফরয নামায পরবর্তী দু‘আ।” [সুনানু তিরমিযি, হাদিস নং-৩৪২১।]

নিশীথনিবিড় পরম মমতায় আদায় করা তাহাজ্জুদ স্বয়ং হযরত দাউদ আলাইহিস সালামও আদায় করতেন মর্মে মুসনাদে আহমদে এক বর্ণনা পাওয়া যায়।  সাহাবি হযরত উসামা ইবন আবুল আস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণিত।  তিনি বলেন, আমি প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, তিনি ইরশাদ করেন, “আল্লাহর প্রেরিত নবি হযরত দাউদ আলাইহিস সালাম রাতের একটি অংশে নিজের পরিবার-পরিজনকে জাগাতেন এবং বলতেন, হে দাউদ সন্তানরা! উঠো, নামায পড়ো।  কারণ এটা এমন সময়, যখন কোনো যাদুকর এবং জোরপূর্বক ক্ষতিপূরণ আদায়কারী ব্যতীত অন্য সহকারে দু‘আ কবুল হয়।” [মুসনাদে আহমদ, খ.৯, পৃ.৩৬৭, জাতিস নং-৪৩৩১।]

তাহাজ্জুদ নামাযের রাকা‘আত নিয়ে হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনা এসেছে।  তবে কমপক্ষে দু রাকা‘আত।  অত্যাধিক বার রাকা‘আত।  অন্যদিকে আট রাকা‘আতের ব্যপারেও অসংখ্য হাদিসের সাক্ষ্য আছে।  আমাদের সাধ্যমত দু রাকা‘আত থেকে বার রাকা‘আত পর্যন্ত আদায় করার প্রচেষ্টা করা সমীচীন।  এ নামায আদায় শেষে সুফিয়ায়ে ইযাম বিভিন্ন দু‘আর কথা উল্লেখ করেছেন।  মনের গহিনে থাকা সমস্ত আকুতি মহান রাব্বুল আলামিনের দরবারে পেশ করার বাধাহীন সময়। কোলাহলমুক্ত নীরব পরিবেশে একান্তাত্মায় মহামহিয়ানের দয়া-অনুকম্পায় একাকার হতে বাধা থাকে না।  থাকে না দুনিয়ার অন্য কোনো চিন্তাচেতনা।

একে অপরকে এ নামাযের প্রতি উৎসাহ এবং ঘুম থেকে জাগিয়ে দেয়া আল্লাহ রাব্বুল ইযযাতের নিকট অত্যন্ত পছন্দ।  পরস্পরকে জাগ্রত করে নিশীথের এ আরাধনায় অংশগ্রহণকারী স্বামী-স্ত্রীর জন্য মনভরে দু‘আ করেছেন স্বয়ং কামলিওয়ালা প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম।  প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আবু হুরাইরা রাদ্বিয়াল্লাহু তা‘আলা আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-নবী আকরাম সাল্লাল্লাহু তা‘আলা আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, “করুণাময় আল্লাহ ঐ ব্যক্তির উপর রহমত বর্ষণ করেন, যে রাতের বেলায় নিজে জাগ্রত হয় এবং নিজের স্ত্রীকেও জাগ্রত করে নামায আদায় করে।  স্ত্রী যদি না উঠে তাহলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে জাগিয়ে দেয়।

এভাবে সে বিদুষী রমণীর উপর আল্লাহর করুণা বর্ষিত হয়, যে রাত-নিশীথে নিজে জাগ্রত হয়ে নামায আদায় করে এবং তার স্বামীকেও জাগিয়ে নামায পড়ায়। যদি সে না উঠে, তাহলে তার মুখে পানি ছিটিয়ে জাগ্রত করে।” [সুনানু আবু দাউদ, হাদিস নং-১১১৩।]