চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

তাবলিগের ‘ধর্ম’

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর একজন শিক্ষকের অনুপ্রেরণায় তিনদিনের জন্য তাবলিগে গিয়েছিলাম। একই থালায় কয়েকজনের খাওয়া, রাস্তার ডান পাশ দিয়ে লাইন ধরে হেঁটে চলা, লোকজনের জটলা দেখলে সেখানে গিয়ে ধর্মীয় অনুশাসনের ভালো দিকগুলো সম্পর্কে জানানো—এরকম কাজগুলোকে বেশ ইনোভেটিভ এবং জনসংযোগ কৌশলের একটি নতুন দিক বলে মনে হয়েছিল।

এর অনেক বছর পরে ২০০৭ সালে পত্রিকার জন্য তাবলিগ জামাতের আদ্যোপান্ত নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন করতে গিয়ে তাদের সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার সুযোগ পাই। উদ্দেশ্য ছিল, অন্যান্য ধর্মীয় গ্রুপ ও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তাদের দর্শনগত পার্থক্যটা বোঝা। সে পর্যন্ত তাবলিগ সম্পর্কে একটা মোটামুটি ইতিবাচক ধারণাই পেয়েছিলাম। অন্তত ধর্মের নামে খুনোখুনি বা রক্তারক্তির মধ্যে তাবলিগের লোকেরা নেই, বরং সমাজ ও রাষ্ট্রের সংঘাতময় ইস্যুগুলোর থেকেও তারা নিজেদের যথেষ্ট দূরে সরিয়ে রেখে এক ধরনের সুফিবাদের চর্চা করছে বলেই মনে হয়েছে। কিন্তু সেই জায়গা থেকে তাবলিগ জামাতের মতো একটি আপাত নিরীহ ধর্মীয় গোষ্ঠীর সহিংস হয়ে ওঠার বিবর্তন বা পরিবর্তন আমাদের সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতারই বাইপ্রোডাক্ট কি না, তা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে বলে মনে হয়।

গণমাধ্যমে এরইমধ্যে তাবলিগের মাওলানা জুবায়ের ও দিল্লির মাওলানা সাদের অনুসারীদের সংঘর্ষে আহতদের রক্তাক্ত ছবি প্রকাশিত হয়েছে। খবরে বলা হচ্ছে, শনিবার টঙ্গীর বাটা গেট এলাকায় ইজতেমা ময়দানের প্রবেশপথে তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বাঁধে। দফায় দফায় চলা সংঘর্ষ, ইটপাটকেল নিক্ষেপে অন্তত একজন নিহত এবং উভয় পক্ষের শতাধিক লোক আহত হন। সংঘর্ষের কারণে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানের সামনের রাস্তায় যানচলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা। বিমানবন্দর সড়কে দেখা দেয় তীব্র যানজট।

এর আগে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান দখল নিয়ে বিরোধের জের ধরে বিমানবন্দর মোড়ে তাবলীগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া হয়। শনিবার সকালে একপক্ষ ইজতেমা ময়দান অভিমুখে যাত্রা শুরু করলে বাধা দেয় অপর পক্ষ। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়া শুরু হয়। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে সচিবালয়ে তাবলিগের মুরুব্বিদের সাথে বৈঠকে বসেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। পরে তিনি সাংবাদিকদের জানান, সংঘর্ষের ঘটনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আর জাতীয় নির্বাচনের পরে বিশ্ব ইজতেমা হবে বলেও জানান তিনি। স্মরণ করা যেতে পারে, গত জানুয়ারি মাসেও তাবলিগের দু’গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে খোদ সরকার সেখানে হস্তক্ষেপ করতে বাধ্য হয়।

তাবলিগ জামাতের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপরীতধর্মী দুটি ধারণা প্রচলিত। তা সত্ত্বেও অন্তত এক বছর আগ পর্যন্ত তাদের সম্পর্কে যে বিষয়টি নিয়ে কোনো বিতর্ক ছিল না তা হলো, তারা শান্তিকামী। কখনো কোনো বিষয় নিয়ে উচ্চবাচ্য, আন্দোলন, ফতোয়া ইত্যাদি নিয়ে তাদের উচ্চকণ্ঠ ছিল না। নিজেদের গণ্ডির ভেতরে তারা নিজেদের মতো করে ধর্মকর্মের চর্চা করতেন। কিন্তু এ বছরের জানুয়ারিতে তাবলিগের শীর্ষ মুরুব্বি ভারতের মাওলানা সাদের ইজতেমায় অংশগ্রহণ ঠেকাতে একটি অংশ (কওমি মাদ্রাসাও সেখানে ছিল) রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকায় বিক্ষোভের নামে পুরো এলাকার রাস্তঘাট অচল করে দেয়। তখনও মানুষের দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে যায়। দুপক্ষের বৈঠকের পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, মাওলানা সাদ এ বছর ইজতেমায় অংশ নেবেন না এবং সুবিধাজনক সময়ে তিনি ভারতে ফিরে যাবেন।

মাওলানা সাদের বিরুদ্ধে কেন ওই বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল বা মাওলানা জুবায়েরর সঙ্গে তার মতবিরোধের নেপথ্যে কী, তা নিয়ে গণমাধ্যমে কিছু রিপোর্ট প্রকাশিত হলেও এর সত্যমিথ্যা যাচাই করা কঠিন। কারণ তাবলিগ জামাতের সব কাজকর্মই হয় বেশ গোপনীয়তার সাথে। একজন শীর্ষ মুরুব্বির সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে আমাকে যে পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছিল, সেটি এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা। কারণ তারা কোনো বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে কথা বলতে চায় না বা প্রয়োজনবোধ করে না।

Advertisement

তাবলিগ জামাতের কাজকর্ম নিয়ে কিছু প্রশ্ন থাকলেও, বিশেষ করে পরিবার-পরিজন ও কাজকর্ম ফেলে দিনের পর দিন বাইরে থাকার সমালোচনা সত্ত্বেও এই ধর্মীয় গোষ্ঠীর আয়োজনে টঙ্গীর তুরাগ তীরে অর্ধ শতাব্দী ধরে যে বিশাল গণজমায়েত (বিশ্ব ইজতেমা) হয় এবং যেটি হজের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম সম্মিলন, সেখানের আখেরি মোনাজাতে অংশ নেয়ার দৃশ্য অভূতপূর্ব। লক্ষ লক্ষ মানুষ সারা দেশ থেকে ছুটে আসেন। দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা এই মোনাজাতে অংশ নেন। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও নিজেদের বাসভবনে বসে এই মোনাজাতে অংশ নেন এবং সেটি টেলিভিশনগুলো সরাসরি সম্প্রচার করে। সব মিলিয়ে বিশ্ব ইজতেমার যে একটা সামাজিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বও রয়েছে, সে ব্যাপারে বোধ করি কেউ দ্বিমত পোষণ করবেন না।

বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় ধর্ম বরাবরই একটা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। সংবিধানের শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং ইসলামকে রাষ্ট্রধর্মের সাংবিধানিক স্বীকৃতি আবার মূলনীতিতে ধর্মনিরপেক্ষতা বহাল রাখা নিয়ে সমালোচনা যতই থাকুক, ধর্ম যে আমাদের প্রতিদিনকার জীবন চর্চায় বিবিধরূপে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে, সে বিষয়ে বিতর্ক কম। সে কারণেই যখন আমরা দেখি যে, তাবলিগ জামাতের মতো একটি অরাজনৈতিক ও শান্তিকামী ধর্মীয় গোষ্ঠীর লোকেরাও রাস্তা অচল করে সহিংস হয়ে ওঠে, তখন কিছু প্রশ্ন মানুষের মনে উঁকি দেয়।

১. মাওলানা সাদ তাবলিগের অনেক বড় মুরুব্বি। অনেক বছর ধরেই তিনি বিশ্ব ইজতেমায় বয়ান করেছেন। কিন্তু হঠাৎ করে একটি পক্ষ কেন তার বিরুদ্ধে চলে গেলো? তাবলিগ জামাতের চেইন অব কমান্ড অত্যন্ত শক্তিশালী। এমনকি তারা যখন রাস্তায় লাইন ধরে হাঁটে, সেখানে সেনাবাহিনীর মতো শৃঙ্খলা এবং যিনি সামনে থাকেন (তাদের ভাষায় রাহবার) তার পদাঙ্কানুসরণ সেই চেইন অব কমান্ডেরই প্রতিফলন। তা সত্ত্বেও একজন শীর্ষ মুরুব্বির বিরুদ্ধে কেন একটি বড় গ্রুপ দাঁড়িয়ে গেলো? এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক ইন্ধন কি আছে? নাকি তাবলিগের যে সুফিবাদী দর্শন, সেখানে চিড় ধরেছে?

২. ইসলামের বিভিন্ন ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে মতবিরোধ ঐতিহাসিক কাল থেকেই চলে আসছে। সেই পার্থক্যের মূলে বস্তুত দর্শন। তাবলিগ জামাতের সাম্প্রতিক এই বিরোধের পেছনে কি দর্শন নাকি অন্য কোনো কারণও দায়ী? বিশেষ করে অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠী বিশেষ করে যারা বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত হয়েছে, তাদের সঙ্গে কি তাবলিগের কোনো কারণে বিরোধ তৈরি হয়েছে? তাবলিগের ব্যাপারে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এমনকি ধর্মভিত্তিক অরাজনৈতিক বড় সংগঠনের ধারণাও খুব ইতিবাচক নয় বলে অনেক সময় মনে হয়েছে। ফলে এ প্রশ্ন ওঠাও অস্বাভাবিক নয় যে, সাম্প্রতিক বিরোধের পেছনে কি ওই সব দল ও সংগঠনের কোনো ইন্ধন রয়েছে? অর্থাৎ তাবলিগের ভেতরেও কি ‘পলিটিক্স’ ঢুকে পড়েছে?

৩. ধর্ম মানুষের শান্তির জন্য। মানুষ যাতে বিপথে না যায়, একটা নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে থাকে, সেজন্যই তো ধর্মের ‘আবিষ্কার’। কিন্তু যখন এই ধর্ম নিয়েই নানান ফেরকা তৈরি হয়, মারামারি কাটাকাটি হয়, সেটি শান্তিকামী মানুষের মনে ধর্মের খারাপ দিকটি উন্মোচিত করে। তাবলিগ জামাতের সাম্প্রতিক এই সংকটের পেছনে মাওলানা সাদের যে কিছু কট্টর বয়ান ও নসিহতকে দায়ী করা হলেও তার মধ্য দিয়ে বস্তুত ইসলামকে একটি পশ্চাতপদ ধর্ম হিসেবে প্রমাণের কি কোনো প্রচেষ্টা রয়েছে?

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)