চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ঢালচরের ঘরহারা মানুষেরা কোথায় যাবে?

এই তো সেদিন! মাত্র মাস চারেক আগের কথা। টাওয়ার বাজারে ছিল জমজমাট ব্যবসা বাণিজ্য। জেবল হকের বাড়ি থেকে নদীতীর ছিল অনেক দূরে। ঐতিহাসিক মুজিব কিল্লায় ছিল অনেকগুলো বাড়িঘর। আদর্শপাড়ার মতলব মাঝির জামে মসজিদটি ঠায় দাঁড়িয়ে ছিল। এই মসজিদে টিনের চালার উপরে বাঁশের মাথায় বাঁধা মাইকে আজান হতো।

কিন্তু সেসব এখন অতীত। টাওয়ার বাজার সরিয়ে নেওয়া হয়েছে জেবল হক কোথায় বসতি গড়বেন জানেন না। মুজিব কিল্লা ফাঁকা। যেখানে ছিল মতলব মাঝির জামে মসজিদ, সেখানে এখন মেঘনার উত্তাল ঢেউ। এভাবেই খুব দ্রুত বদলাচ্ছে ঢালচর। সবার প্রশ্ন- ঢালচরের মানুষ কোথায় যাবে?

এ বছরের মে মাসের বারো তারিখে ঢালচর গিয়ে ল্যাপটপে ফটোফোল্ডার খুলি। আগেরবারের ছবির সঙ্গে এবারের ছবি মিলাই। অনেক ফারাক। সেই বাড়িঘর, সেই দোকানপাট, সেই মানুষের আড্ডা- কোথায় হারিয়ে গেল?  প্রশ্নের জবাব মেলে না। লঞ্চঘাট সেই টাওয়ার বাজারেই আছে; তবে টাওয়ার বাজার পিছিয়েছে অন্তত ২০০ হাত। বর্ষা সামনে রেখে ব্যবসায়ীরা ঝুঁকি নিতে রাজি নন। তাই তারা সরে গেছেন খানিক দূরে।

হাজীর বাজারের গা ঘেঁষে গড়ে উঠেছে আরেকটি বাজার। বড় পুকুর ও আশপাশের জমি ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে এ বাজার। জমির মালিকের নাম অনুসারে এ বাজারের নাম হয়েছে পাটোয়ারী বাজার। ভাঙন কবলিত টাওয়ার বাজারের অনেক ব্যবসায়ী এ নতুন বাজারে দোকান ভাড়া নিয়ে চলে এসেছেন। এরই মধ্যে শাহীনের চায়ের দোকান, বশির উদ্দিন ও মাকসুদ আহমেদে মুদি দোকান, সাদ্দাম হোসেন ও সালাহউদ্দিনের ইলেকট্রনিকসের দোকান, দীপক চন্দ্রের সেলুন, আবদুল মালেকের ঔষধের দোকান, আলমগীর পাটোয়ারীর ফ্লেক্সিলোডের দোকান সারিয়ে নেওয়া হয়েছে। টাওয়ার বাজারের অবশিষ্ট দোকান এবং একমাত্র মসজিদটিও বর্ষা আসার আগেই সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

নদীভাঙণের কারণে টাওয়ার বাজারটি তিনবার স্থানান্তরিত হয়েছে বলে জানালেন ব্যবসায়ীরা। কথা বলি আলম ডিলারের সঙ্গে। বয়স যার ৬০ বছর। ২৫ বছর ধরে ঢালচরে সারের ডিলার। দেখেছেন অনেক কিছু। পনেরো-কুড়ি দিন পর পর এখানে ‘গয়না নৌকা’ আসতে দেখেছেন। সেই নৌকাই ছিল এই দ্বীপের বাসিন্দাদের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা।

তখনকার চালের সংকট, লবণের সংকট দেখেছেন। বনজঙ্গল দেখেছেন। নিজেই সেই বনজঙ্গল পরিস্কার করে বসতি গড়েছেন। নিজের গড়া সেই বাড়ি ভেঙেছে ৭ বার। ৪ বার নদী ভেঙ্গেছে; ৩ বার ভেঙ্গেছে ঘূর্ণিঝড়ে। পিঠ তার দেয়ালে ঠেকে গেছে। আর বুঝি এই চরে থাকা হবে না; নিশ্বাস ফেলেন আলম ডিলার। তর্জনী উঁচিয়ে দেখান চর মোজাম্মেলে জমি কিনেছেন; স্বজনেরা সেখানেই থাকে।

টাওয়ার বাজারে এখনও রয়েছে আলম ডিলারের সারের দোকান। এক সময় নিজের আলাদা দোকান ছিল। এখন সারের দোকানটি রেখেছেন জামাল হোসেনের লন্ড্রির দোকানের সঙ্গে শেয়ারে। বর্ষায় এখানে থাকা সম্ভব হবে না; তাই নতুন গড়ে ওঠা পাটোয়ারী বাজার কিংবা পুরানো হাজী বাজারে জায়গা খুঁজছেন। টাওয়ার বাজার ভেঙে যাওয়ার কারণে চাপ বেড়েছে হাজী বাজারে। বেড়েছে দোকানপাট। ব্যবসা বাণিজ্যও জমজমাট। পড়ন্ত বেলায় এখানে বহু মানুষের আগমন ঘটে। আড্ডা চলে সেই অধিক রাত পর্যন্ত। আবার হাজী বাজারে যাদের ব্যবসায় মন্দা চলছিল; তারা ব্যবসা গুটিয়ে অন্য পেশায় ফিরেছেন। এই বাজারে নিজের ঘরে ছিল আবদুস সালাম খানের দোকান এবং দোতলায় খান বোডিং। মালিক ব্যবসা গুটিয়ে ফেলেছেন। আজিজ মিয়ার কাছে পুরো ঘর ভাড়া দিয়েছেন। মাত্র চার মাসে ঢালচরে এমন অনেক পরিবর্তন চোখে পড়ে।

উত্তর ঢালচরে পড়ন্ত বেলায় বয়সের ভারে ন্যূয়ে পড়া জেবল হক মাতব্বরের সঙ্গে দেখা। বয়স ৭৫ পেরিয়েছে। প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে আছেন। এরপর কোথায় যাবেন জানেন না। নিজের বাড়ি ছিল, কৃষি জমি ছিল, বড় নারিকেল-সুপারির বাগান ছিল। নিজের জমি থেকে ৪০ শতাংশ জমি দিয়েছিলেন উত্তর ঢালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য। পা পর্যন্ত সাদা পাঞ্চাবী, মাথায় টুপি পড়া এই মানুষটা কথা বলতে গিয়ে চোখের পানি ফেলে দিলেন। নিজের ঘর বসবাস উপযোগী নেই। রাত কাটান স্কুলের পাকা ভবনের এক কোনে। কিন্তু স্কুলটিও মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ভাঙনের অতি নিকটে চলে এসেছে। জেবল হক এক হাতে চোখের পানি মোছেন, আরেক হাতে সারি সারি নারিকেল গাছ, সুপারি গাছ, আম গাছ, জামরুল গাছ দেখান, বাগান দেখান, জমি দেখান, বাড়ি দেখান। এগুলো থাকবে না- এটা যেন তিনি মানতেই পারছেন না।

Advertisement

স্কুলের দোতলা পাকা ভবন দু’টিও ভেঙে ফেলতে হবে; যে স্কুল প্রতিষ্ঠায় জেবল হক জমি দিয়েছেন; বিনিময়ে কিছুই নেন নি। শুধু চেয়েছেন দ্বীপের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া হোক। সেই স্কুলের কথা ভেবেও জেবল হকের মন কাঁদে। এই স্কুলের একজন শিক্ষকের সঙ্গে আলাপ করে জানতে পারি, শিক্ষার্থীর সংখ্যা এখানে অস্বাভাবিক হারে কমছে। বছরের শুরুতে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও এখন আছে মাত্র জনা পঞ্চাশেক। উপস্থিতি আরও কম। শিক্ষার্থী নূপুর, ঝুমুর, জাহিদ, সুমা, সাদিয়া, সান্ত্বনা, মিনজু, হাফসা, খাদিজা, রাহাত, মারিয়া, আহাদ, কুলসুম ও মরিয়মদের হাতেই গোনা যায়। স্কুল থেকে নদীর দূরত্ব মাত্র দেড়শ’ ফুট।

মাত্র চার মাস আগে শীতের কুয়াশা ঘেরা দুপুরে এসেছিলাম উত্তর ঢালচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে। বিদ্যালয়ের সামনের খোলা মাঠে তখন কয়েকজন নারী সিদ্ধ ধান শুকাচ্ছিলেন। সামনে শীতে হয়তো এখানে আর কেউ ধান শুকাবে না; বিদ্যালয়ের নিচের খোলা জায়গায় শুকনো লাকড়ি রাখবে না। এই মাঠে হয়তো বা বইবে মেঘনার উত্তাল ঢেউ।

উত্তর ঢালচরে নদী কিনারে জেবল হকের বাড়ির পাশেই চা-দোকানদার ইউনুস ফরাজীর ঘর, তার পাশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক মফিজুল ইসলামের ঘর। মফিজুল ইসলামের স্ত্রী জুলেখা বিবি ভেঙে নেওয়ার বাড়ির পড়ে থাকা মালামাল কুড়িয়ে নিচ্ছিলেন। ইউনুস ফরাজীর ঘরটি এখনও কয়েকবার ভেঙে এখন ঝুপড়ির রূপ নিয়েছে। ঘরের দরজায় দুপুরের রান্নার জন্য তরকারি তার স্ত্রী ফাহিমা বেগম। অপরিচিত লোক এবং ক্যামেরা দেখতেই ঘোমটা টেনে ঝুপড়ির ভেতরে ঢুকলেন। ঘোমটায় মুখ লুকিয়ে তিনি জানালেন, কয়েকবার বাড়ি বদল করে তারা এখন নি:স্ব। এরপর কোথায় যাবেন, জানেন না।

ইউনুস ফরাজীর ঘরের পাশে আরেকটি ঘরের ভিটি। ছড়ানো ছিটানো মালামাল দেখে মনে হয়, দু’এক দিন আগেই হয়তো ঘরটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মাটির উনুনে রান্নার কালি লেগে আছে। এই উনুনে আর রান্না হবে না; এখান থেকে আর উড়বে না। শুন্য ভিটায় মুরগি-কবুতরের খাবার রাখার হাঁড়িটি ভেঙে পড়ে আছে। ভাঙা মুরগির খোপ, ফুটো হয়ে যাওয়া পানির ড্রাম, পাতার বেড়ার অংশবিশেষ ছড়ানো ছিটানো ভিটায়। কিছু উচ্ছিষ্ট খাবার নিয়ে টানাটানি করছে একদল লাল পিঁপড়া। ঘর থেকে যা নেওয়ার সবই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বাসিন্দারা আর কখনো এই ঘরে উঠবেন না।

ভোলার চরফ্যাসনের আওতাধীন দ্বীপ ইউনিয়ন ঢালচরে যেতে হয় কচ্ছপিয়া ঘাট থেকে। কুকরি মুকরির চরপাতিলার গা ঘেঁষে ছোট লঞ্চটি যখন ঢালচরের উদ্দেশ্যে ভয়াল মেঘনা পাড়ি দিত; তার কিছু পরেই যাত্রীদের চোখে স্পষ্ট হয়ে উঠতো আদর্শপাড়ার মতলব মাঝির জামে মসজিদটি। পাকা মেঝে, চকচকে টিনের ছাউনি। তার ওপরে বাঁশের আগায় মাইক। এটা দেখে ঢালচরের একটা নিশানা পাওয়া যেত। কিন্তু মাত্র চার মাসের ব্যবধানে মসজিদটি নিশ্চিহ্ন। দ্বীপের মসজিদগুলো সাধারণত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়া হলেও এটি আর কোথাও নেওয়ার সুযোগ হয়নি। মসজিদের সামনে ছিল নারকেল গাছের সারি, পুকুর। মসজিদের আঙিনার কবরস্থানে ঘুমিয়ে ছিলেন প্রয়াত বহু মানুষ। কিন্তু সেখানে এখন মেঘনার ¯্রােতধারা বইছে।

এবার ঢালচর গিয়ে জিলাপি বিক্রেতা খোকন মিয়াকে খুঁজছিলাম। আবদুস সালাম হাওলাদার বাজারের খোলা মাঠে পুরো শীত জুড়ে চলে তার জিলাপি ব্যবসা। অন্য মৌসুমে এ ব্যবসা চলে না। ৮ নম্বর ওয়ার্ডের শরীফ পাড়ার খোকন মিয়া ব্যবসা বদলের সঙ্গে বদল হয় বাড়ির অবস্থান। এখন তাকে ফিরতে হবে অন্য ব্যবসায়। বর্ষায় যাবেন নদীতে। শুধু খোকন নয়, এখানকার মানুষের জীবিকা এভাবে বদল হয় বার বার।

ঢালচরের অন্ধকার পথে আলো ফেলতে সড়ক বাতি বরাদ্দ হয়েছে মাত্র চারটি। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ কর্মসূচির আওতায় এসেছে ঢালচর। সড়ক বাড়ির সংখ্যা আগামীতে হয়তো আরও বাড়বে। তবে সে দাবি ঢালচরবাসীর কাছে প্রধান নয়। তারা চান মাথা গোঁজার ঠাঁই। উত্তরে ভাঙনের বিপরীতে দক্ষিণ-পশ্চিমে জেগে উঠেছে অন্তত দুই হাজার একর খাসজমি। এই জমি বন্দোবস্ত হলে এখানকার জমিহারা মানুষেরা আবার জমি ফিরে পাবে।

(এ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব। চ্যানেল আই অনলাইন এবং চ্যানেল আই-এর সম্পাদকীয় নীতির সঙ্গে প্রকাশিত মতামত সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।)