চ্যানেল আই অনলাইন
হৃদয়ে বাংলাদেশ প্রবাসেও বাংলাদেশ

ডিগবাজীর গল্প হিরণ মিত্র’র সঙ্গে দুই সন্ধ্যে

শুক্রবার বিকেলে ধ্রুব বলল, শনিবার সন্ধ্যায় যত জরুরি কাজই থাকুক সব ফালায়া আমার বাসায় আইসা পড়বা।
ধ্রুব যখন বলেছে তখন বুঝতে হবে এর মধ্যে কিছু একটা আছে। কিছু একটা যে আছে সেটা টের পেলাম ওর ঢেরায় গিয়ে।

দুই
তাঁর কথা শুনে প্রথমটায় ভারি বিস্ময় জেগেছিল মনে।
তাঁর সঙ্গে কথা বলে তৃপ্ত হলাম। সব ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে তিনি নিজের মতো করে একটা ব্যাখ্যা দেন আর বলেন, ‘জানি না তোমরা কে কিভাবে নেবে- আমার কথা সত্য হতেও পারে কিংবা তুমি দ্বিমতও করতে পারো- আবার এমনও হতে পারে আমিই ঠিক বলছি না তবে কথাটা হলো এরকম’ বলে তিনি সুন্দর করে গুছিয়ে তিনার মতন করে কথাগুলো বলেন।
আর কী আশ্চর্য!

তিনি যখন কথাটা শেষ করেন তখন কে যেন একজন আমার ভেতর আমাকে গুঁতোতে থাকে আর বলতে থাকে, হ্যাঁ, একদম ঠিক কথাই তো বলেছে মানুষটা-
আড্ডায় নানা প্রসঙ্গে, নানা বিষয়ে নানা কথা বলে গেলেন তিনি।
কিভাবে শিল্পী হলেন?

জানতে চাইলে বললেন, সে অনেক গল্প। শুধু এটুকু বলি বলে বললেন, ‘৬২ সালে কলকাতায় এলাম আর্ট স্কুলে পড়তে। ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকি। শিল্পী নয়া হয়ে আর কি হবো! পরিবারের কেউ চায় না আমি শিল্পী হই। শিল্পী হলে খাব কী!

আমি তখন বুঝতে পেরেছিলাম বাবা আমার পক্ষে খানিকটা আছেন। একদিন বাবা আমায় বললেন,
স্টালিন, শিল্পী হয়ে তুই খাবি কী?
আমি তখন বাবাকে বললাম,
সকালে ডিগবাজী খাব আর সারাদিন জল খাব।
আমার কথায় বাবা কিছু বললেন না। আমি যা বোঝার বুঝে নিলাম,ব্যাস।

বিজ্ঞাপন

তিন
নিজের শিল্পী জীবনের শুরুর দিককার কথা বললেন-
কত মানুষের নাম ধাম আর মজার মজার প্রসঙ্গ এসে গেল তাতে।
সমকালীন শিল্পীদের নিয়ে নিজস্ব ভাবনার কথা বললেন।
নিজের একান্ত শিল্পভাবনার কথা বললেন।
যাতনার কথা বললেন।
শিল্পীদের সঙ্গে যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক দ্বন্দ্ব, মান অভিমান কিংবা নিছক দায়বোধের কথাও বললেন।
বললেন, আমার কাজ নিয়ে কলকাতার অনেক নাম করা শিল্পীরাও আমাকে বক্রোক্তি করেন, আমাকে তুলোধুনো করেন- তাতে আমি গা করি না।
নাটক-সিনেমা নিয়ে ভাবনার কথা বললেন।
আরও কত রহস্যময় আঁধারের কথা বললেন।

চার
হিরণ মিত্র- সমকালীন শিল্পকলার অন্যতন প্রধান শিল্পী। তাঁকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করা যায় তাঁর ভাবনায়, চিন্তায়, কাজে, প্রকাশে, প্রছচদে, অলংকরণে, কথায়-সবকিছুতে তিনি নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছেন। আর দশজনের মতো সস্তা হাওয়ায় গা ভাসিয়ে দেন নি তিনি। স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা মাথায় স্রোতকে ভোগ করেছেন যেমন করে তেমন করে উপভোগও করেছেন।
সব কথা বলা যায় না। কিছু অপ্রিয় সত্য থাকে যাকে প্রকাশ করতে নেই। অপ্রিয় সত্য মানুষের অনেক মুখোশ খুলে দেয়। তবু আমরা সেই মুখোশ পড়ে থাকি।
সেই মুখোশ ধরে থাকি।
কিন্তু হিরণ মিত্রকে দেখলাম কি অবলীলায়, কি অনাবিল সাচ্ছন্দে একের পর এক জীবনের গভীর গোপন সত্য কথাগুলো বলে যাচ্ছেন…

পাঁচ
আমার পুরান ঢাকার টোণে কথাবার্তা শুনে হিরণ মিত্র ধ্রুবকে বললেন, ওর কথায় বিক্রমপুরের ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
আমি বললাম, কিভাবে বুঝলেন!
কলকাতায় বিক্রমপুরের অনেক মানুষ আছে।
আমাদের পুরান ঢাকার বেশিরভাগ মানুষই ওখানকার। তিনি ঢাকাইয়া ভাষার স্বাদ পেতে চাইলে উজাড় করে দিলাম। আমার কথা শুনে তিনি খুব আনন্দিত হলেন। হো-হো করে হাসলেন। তারপর বললেন, ঢাকাইয়া ভাষার এই এক অদ্ভুত গুণ- এই ভাষার অশ্লীল গালিকেও মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে মধুর সম্ভাষণ…
আমার ঢাকাইয়া কথা আর রসিকতার গল্প শুনে অনেকক্ষণ হাসলেন হিরণ মিত্র। এরপর খুশি হয়ে তিনি তাঁর কালো মলাটের খাতায় আমার একখানা প্রতিকৃতি আঁকলেন।

ছয়
হিরণ মিত্র। সদা তরুণ, টগবগে এক মানুষ। তাঁর সঙ্গে শনিবার, রবিবার পরপর দুদিন, সন্ধ্যা থেকে অনেক রাত অব্দি ভরপুর আড্ডা দিলাম, ধ্রুবর ওখানে।
মুগ্ধ, একেবারে পরিপূর্ণ মুগ্ধ হয়ে গেলাম আমি। আমরা।
শিল্পী হয়ে কি খাবেন- বাবার কাছে দেয়া সেই উত্তরের যথাযথ মূল্য তিনি দিয়েছেন।
জীবনভর ডিগবাজী খেয়েছেন হিরণ মিত্র, নানাভাবে।
ক্ষণে ক্ষণে কাজের মাধ্যম পালটেছেন।
পেশা পালটেছেন।
অফিস পালটেছেন।
প্রেসে কাজ করেছেন।
বাজারের কাজ করেছেন।
উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়িয়েছেন।
বেকার হয়ে পথে পথে ঘুরেছেন।
এখনো, এই ৭৫ বছর বয়সে এসেও ডিগবাজীটা বন্ধ হয় নি তাঁর…

ছবি কৃতজ্ঞতা / কামরুল মিথুন
আমার প্রতিকৃতি নিয়ে আমি, ধ্রুব এষ আর হিরণ মিত্র

বিজ্ঞাপন